ড. মুহম্মদ মাসুম চৌধুরী: বিশ্ব বিখ্যাত ম্যাগাজিন ‘টাইম’ কিছুদিন পূর্বে প্রচ্ছদ প্রতিবেদনের সূচনাতে লেখেছেন,একুশ শতকের সম্পদ হাচ্ছে ‘জ্ঞান’। তেল গ্যাসের খনি নয়, গাড়ী-বিমানের ফ্যাক্টরী নয়, যুদ্ধান্ত্রের কারখানা বা সোনা, রূপা, ডায়মন্ডের খনি নয়, একুশ শতকের সম্পদ হলো ‘জ্ঞান’।
বাংলাদেশে বর্তমান ছাত্র-ছাত্রীদের সংখ্যা প্রায় তিন কোটি। তাদেরকে একুশ শতকের সম্পদ ‘জ্ঞান’ অপর্ণ করতে পারলে বাংলাদেশ হবে পৃথিবীর সবচেয়ে সম্পদশালী একটি দেশ। আমাদের চোখের সামনে শিক্ষা দ্বারা মালয়েশিয়া উন্নত হয়েছে, জেলেদের গ্রাম সিঙ্গাপুর উন্নত হয়েছে। শিক্ষায় জাতিকে উন্নত করতে সিঙ্গাপুরের শিক্ষামন্ত্রীকে দেওয়া হয়েছে উপপ্রধানমন্ত্রীর মর্যাদা। জার্মান, জাপান, ভিয়েতনাম ধ্বংসের পর শিক্ষার কারণে অর্থনৈতিকভাবে দাঁড়িয়ে গেছে। তাদের অনুসরণ করে আমরা এগিয়ে যেতে পারি।
মহানবী হযরত মোহাম্মদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জ্ঞান অর্জনে সূদুর চীনে যেতে নির্দেশ দিয়েছেন। চীনে কথা বলার রহস্য হলো তখন চীনের সাথে আরবের কোন জলপথ, স্থলপথ, গিরীপথ ছিল না। মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল হিমালয় পর্বতের মত শত শত বরফের পাহাড়। নবীজী বলতে চেয়েছেন হিমালয়ের মত পর্বত পেরিয়ে হলেও জ্ঞান যদি চীন দেশের মত অমুসলিম রাষ্ট্রে থাকে তোমরা তা
আত্মস্থ কর।অর্থনৈতিক রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিপ্লব সাধনে শিক্ষা একটি বড় ভূমিকা রাখে। কথায় বলে, ‘শিক্ষা আনে চেতনা, চেতনা আনে বিপ্লব, বিপ্লব আনে মুক্তি’।
শিক্ষা ও জ্ঞানের জোরে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি মুসলিম বিশ্বকে পদানত করে রেখেছে। জ্ঞানের শক্তি অর্জন না করে সাম্রাজ্যবাদীর সমালোচনা করা নিজের দুর্বলতা ডেকে রাখার নামান্তর। ঘোড়ায় করে ঢাল তলোয়ার দিয়ে যুদ্ধ করা সুন্নাত মনে করলে হবে না, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির জ্ঞান অর্জন করে অপশক্তিকে প্রতিহত করতে হবে, না হলে মুসলমানরা টিকে থাকতে পারবে না। তিনবার সুরা এখলাস পাঠ করলে একটি খতমে কোরানের সওয়াব পাওয়ায়, শিক্ষাকে এমন বিষয় মনে করলে চলবে না। অল্প পাঠ করে বসে থাকবেন তা চলবে না, জ্ঞান বিজ্ঞানের গবেষণার জগতে প্রবেশ করতে হবে।তার জন্য কঠোর শ্রম দিতে হবে।
আগামী দিনের জন্য আজকের প্রধান কাজ হলো আমাদের সন্তানদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করা। জন্মদাতা হওয়া সহজ, কিন্তু পিতা হওয়া কঠিন। সন্তান উৎপাদনে কোন কৃতিত্ব নেই; সত্যিকারের পিতা হতে হলে সন্তানকে মানুষের মত মানুষ করতে হবে। পশু পাখিরাও জন্ম দেয় কিন্তু তারা পিতা মাতা হতে পারে না। শিক্ষা ছাড়া মানুষ পশুর মত। কথাসাহিত্যিক আবদুল্লাহ আবু সাঈদ বলেছেন, ‘গাধার আবার বয়স কী? গাধা সে দশ বছরেও গাধা, আশি বছরেও গাধা। যার জীবনে সময় গড়ায় কিন্তু বয়স বাড়ে না।’ প্রখ্যাত প্রাবন্ধিক প্রমথ চৌধুরীর ভাষায়, ‘যে জাতির জ্ঞানের ভাণ্ডার শূন্য সে জাতির ধনের ভাঁড়ে ভবানী।’ শিশুদের আদর্শবান হিসাব গড়ে তুলতে পারলেই আদর্শ সমাজ নির্মাণ করা যাবে। যদি কারো চরিত্র নষ্ট হয় তখন এক ব্যক্তির চরিত্র নষ্ট হয় না বরং এ ক্ষতির প্রভাব পরিবার সমাজ রাষ্ট্রের অকল্যাণ ডেকে আনে। মানুষকে আল্লাহ পাক বলেছেন, ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ বা সৃষ্টির সেরাজীব। মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের প্রধান কারণ তার আত্মসচেতনতা, যা অন্য জীবের নেই। আত্মসচেতনতার মূল আধার মানুষের মন। আর মনের বিকাশ সাধন হয় জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে।
মহানবী হযরত মোহাম্মদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘যে জ্ঞান অন্বেষণ করে, সে আল্লাহকে অন্বেষণ করে।’ তিনি আরো ইরশাদ করেছেন, ‘মুর্খতা অপেক্ষা বড় দারিদ্র আর নেই।
একটা জাতি দরিদ্র কেন থাকে তা অনুসন্ধান করে জানতে পেরেছে, শিক্ষা, চিকিৎসায়, সংস্কৃতিতে দরিদ্র হলে একটি জাতি দরিদ্র হয়।
সরকার আইন করে প্রাথমিক শিক্ষাকে করেছে বাধ্যতামূলক। অথচ ১৪৫০ বছর পূর্বে আরবের মাটিতে উম্মি নবী (দ.) নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের জন্য শিক্ষা গ্রহণকে করেছে ফরজ।
প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জ্ঞান অর্জনের গুরুত্ব বুঝতে গিয়ে বলেছেন, রোগীর সেবার জন্য এক মাইল দূরে যাও, দুই ব্যক্তির বিবাদ মীমাংসা কথার জন্য দুই মাইল দূরে যাও, তোমার বিশ্বাসী ভাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ করতে তিন মাইল দূরে যাও এবং জ্ঞানের একটি কথা শেখার জন্য ছয় মাইল দূরে যাও।’
তুমি কোন বিখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়া শোনা করছো সেটা বড় কথা নয়, তুমি মানুষ হিসেবে কত বড় হলে সেটা আসল কথা। বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়লে বড় মানুষ হবে এমন কোন গ্রামার নেই। পৃথিবীর অধিকাংশ বিখ্যাত মানুষ বিখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করেননি।
চন্দ্রের আলো, সূর্য্যের আলো, প্রদীপের আলো আমাদের বাইরের জগতকে আলোকিত করে, জ্ঞান ভিতরের জগতকে আলোকিত করে। এটাই আসল এবং বড় জগৎ। এই জগৎকে আলোকিত করতে না পারলে বাইরের জগতের আলো কোন কাজে আসে না।
মানুষ এক ব্যতিক্রমধর্মী প্রাণী, মানুষই একমাত্র প্রাণী যে খাদ্য রান্না করে খায়। মানুষেরই লজ্জাশরম আছে, তাই মানুষ কাপড় চোপড় পরিধান করে। এই পোশাকে ফ্যাশন সৃষ্টি করে। নিত্য নতুন ডিজাইন সৃষ্টি হচ্ছে। আজকে যেটা ‘ফ্যাশন’ কাল সেটা ‘আউটডেটেড।’ মানুষের সাথে অন্য প্রাণীর একটা বিরাট পার্থক্য হলো মস্তিষ্ক ও হৃদয়ের গুণাবলীর। এ দু’টি মানুষের বড় সম্পদ। হৃদয়ের গুণাবলী হলো মানবতাবোধ, ভালোবাসা, মমত্ববোধ, স্বাধীনতাবোধ, সেবার মনোভাব, জ্ঞানপিপাসা, ন্যায়ের প্রতি আস্থা ও অন্যায়ের প্রতি ঘৃণা এবং সর্বোপরি বিবেক। জ্ঞান এ হৃদয়ের এসব গুণাবলী ধারণ করে বলে মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। মানুষের সকল ভালো গুণাবলীর সমন্বয়কে এক কথায় মনুষ্যত্ব বলা হয়।
কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘মনুষ্যত্বের শিক্ষাটাই চরম শিক্ষা, আর সমস্তই তার অধীন’ শিক্ষা মানে মনুষ্যত্বে শিক্ষা, সে শিক্ষারই জয় হোক।
লেখক: কলাম লেখক, রাজনীতিক


