মঙ্গলবার, জানুয়ারি ২৭, ২০২৬
spot_img

ভালো মানুষের সংখ্যা বাড়ানোই প্রধান কাজ

ড. মুহম্মদ মাসুম চৌধুরী : সমগ্র পৃথিবী দ্রুত উন্নতি হচ্ছে, হবে, হতেই থাকবে কিন্তু মানুষের নৈতিক উন্নতির পতন না। ভেজারের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। মাছ ভেজাল, মাংস ভেজাল, সবজি ভেজাল, ওষুধ ভেজাল, পরিবেশ ভেজাল, এমন কী কী ফরমালিনও ভেজাল হয়ে পড়ছে। ‘ফরমালিন’ নামক ক্যামিক্যালটির ভালো একটা দাম থাকার কারণে খাদ্যে এটি ব্যবহার না করে লাশ না পচার ক্যামিক্যাল ব্যবহার করা হচ্ছে। যে শিক্ষক নৈতিকতা শিক্ষা দিবে তাদের নিকট নৈতিকতা কমে যাচ্ছে। ধর্মগুরুরা অনৈতিক কাজে লিপ্ত হয়ে পড়ছে। সমাজকে ভেজাল মুক্ত করতে ভেজাল মুক্ত মানুষের সংখ্যা বাড়াতে হবে। ভেজাল মানুষের সংখ্যা কমিয়ে, ভালো মানুষের সংখ্যা বাড়াতে না পারলে ভেজাল পণ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেও ভেজাল মুক্ত সমাজ কায়েম করা যাবে না।
মানুষ যদি পরিশুদ্ধ না হয় আমরা সমাজে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবো না। দুর্নীতি দমন কমিশন করলাম, সে কমিশন যদি দুর্নীতি করে, তার দুর্নীতি দমন করতে অরেকটি কমিশন গঠন করতে হবে। সে দুর্নীতি দমন কমিশনও দুর্নীতি করবে। দুর্নীতি দমনের কমিশনের সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে দুর্নীতিও বাড়বে। সমস্যা সমাধান হবে না।
রাজার ঘরে এক ব্যক্তি প্রতিদিন চার কেজি দুধ বিক্রি করতো। রাজাকে এক উজির পরামর্শ দিয়ে বললো, জাহাপনা! দুধ বিক্রেতা দুধে পানি মিশ্রণ করে। রাজা উজিরকে বললো, যাও তুমি আগামীকাল হতে দুধে পানি মিশ্রণ করে কিনা পরীক্ষা করে দেখবে। উজির পরীক্ষা করতে গিয়ে দেখল দুধ খাটি আছে। তারপর দুধ বিক্রেতাকে বললো, তুমি যদি দুধের একটা অংশ আমাকে না দাও তাহলে আমি রাজার নিকট রিপোর্ট করবো তোমার দুধ ভেজাল। দুধ বিক্রেতা বললো, আমি আপনাকে দুধের একটা অংশ দিলে আমি তো লাভ করতে পারবো না। উজির বললো, আমাকে যে পরিমাণ দুধ দিবে সে পরিমাণ দুধে পানি দিলেই হয়। দুধ বিক্রেতা তাই করলেন। রাজা দুধ পান করে বুঝতে পারলেন, পানির পরিমাণ দুধে আরো বেড়ে গেছে। পরীক্ষা করে দুধ ভেজাল মুক্ত করতে রাজা একে একে চার জন এক সাথে দায়িত্ব দিল। ভেজালমুক্ত দুধ খেতে রাজা যত বেশী সংখ্যক মানুষ নিয়োগ করলো ততই দুধে পানির পরিমাণ বৃদ্ধি পেতে থাকলো। একদিন রাজা দুধ খেতে বসে দেখলেন দুধের সাথে আছে মাছের পোনা। দুধ বিক্রেতাকে ডেকে তার কারণ জানতে চান রাজা। দুধ বিক্রেতা বললো, জাহাপনা, দুধে মাছের পোনা নয় আর কিছুদিন পর কাদা আসবে। আপনি যতই দুধ ভেজাল মুক্ত করতে চাচ্ছেন ততই ভেজালের পরিমাণ বৃদ্ধিপাচ্ছে, কারণ আপনার নিয়োগকৃত মানুষগুলো ভেজাল। যে দেশের নিউ মার্কেট মোড়ে হাজার মানুষের সামনে ট্রাফিক সার্জেন্ট ঘুষ গ্রহণ করে, সে দেশে চার দেওয়ালের ভিতর ঘুষ, দুর্নীতি পাপাচার বন্ধ করা সহজ নয়। ৯৫% সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারি দুর্নীতি করে। কেউ বড় কেউ ছোট ধরনের দুর্নীতিতে লিপ্ত। কিন্তু হাজারে কয়জন দুর্নীতিবাজের বিচার হয়? ব্যাপক নীতিহীন মানুষের আইন দ্বারা দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। তাই আজ বড় বেশি প্রয়োজন হলো ভালো মানুষের সংখ্যা বাড়ানো। প্রয়োজন নীতি নৈতিক শিক্ষা। আমরা হালাল খাদ্য খুজিঁ কিন্তু হালাল রুজি খুঁজি না। কিছুদিন পূর্বে চীনের এক ব্যবসায়ী বলেছেন, মুসলমান দেশগুলোর ব্যবসায়ীরা আজ ডিজিটাল দুনিয়ায় তেমন কোন পণ‍্য উৎপানে ভূমিকা রাখে না, বিজ্ঞান প্রযুক্তির আবিষ্কার করে না, যান্ত্রিক যুগের যন্ত্রের ব্যবসা তাদের হাতে নেই। তারা আমাদের দেশে এসে পৃথিবীর সেরা সেরা কোম্পানির পণ্যের লেবেল লাগিয়ে দুই নম্বর মালের অর্ডার দিয়ে যায়। তাদের পুরো ব্যবসাটাই হারাম অথচ তারা চীনের রেস্টুরেন্টে বসে হালাল খাদ্য খোঁজে। এই হলো আজকের মুসলমানদের অবস্থা।
আমাদের এককালে অভাব দিল কিন্তু এতবেশী অভাববোধ ছিল না। আধুনিক জগতে আমাদের এত বেশি অভাব নেই কিন্তু প্রচণ্ড অভাববোধ দেখা দিয়েছে। প্রচণ্ড অভাববোধ মানুষকে অসুখি করে। সবর শোকর সন্তুষ্টি নেই আজ আমাদের মনে। আত্মসন্তুষ্টি না থাকলে মানুষ কখনো সুখি হতে পারে না। লোভির লোভ শেষ কোথায়! পৃথিবীটা লেখে দিলেও লোভির লোভ শেষ হবে না। অঢেল সম্পদ যদি মানুষকে সুখি করতো তাহলে পৃথিবীর স্বর্গরাজ্য সুইজারল্যান্ড, উন্নত রাষ্ট্র জাপানের মানুষ আত্মহত্যা বেশি করতো না। শারিরীক সুখের জন্য বিদ্যুৎ, এসি, গাড়ী, প্লেইন, অট্টালিকা, আরামদায়ক বিছানাসহ কত কিছু আবিষ্কার করলাম, শারিরীক চিকিৎসার জন্য কতশত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করলাম তার নেই কোন ইয়ত্তা। কিন্তু আমরা তো মানসিক ভাবে সুখি হতে পারছি না। এত কিছু আবিষ্কারের পর মানুষ যদি সুখি হতো তাহলে বিশ্বব্যাপী ঘুমের ওষুধ সেবন বৃদ্ধি পেত না। আত্মহত্যার প্রবণতা দিন দিন বৃদ্ধি পেত না। টাকা দিয়ে বিছানা কেনা যায় কিন্তু ঘুম কেনা যাব না। আজ উম্মাদ হয়ে সবাই টাকার পিছনে দৌড়ছি, এ সব অঢেল সম্পদ কী কাজে আসবে! জীবনাবসানের সাথে সাথে রুহ আজরাইলের, সম্পদ ওয়ারিশের, মাংস পোকা মাকড়ের, হাড় মাটির, শুধুই নেক আমল আপনার সঙ্গী হবে। টাকা কবরে চলে না। সাথে নেওয়াও যায় না। ইংরেজিতে একটি কথা আছে, ‘দি লাস্ট জ্যাকেট হেজ নো পকেট, শেষ কাপড়ের (কাফনের কাপড়) কোন পকেট থাকে না।
আলেকজেন্ডার দ্যা গ্রেড মৃত্যুর পূর্বে তার পরিষদকে বলে যান তিনটি কাজ যেন তারা মৃত্যুর পর করে, প্রথম কাজ হলো,তাঁর টাকা পয়সা, সোনা, রূপা, ডায়মন্ডসহ তার জমানো সম্পদগুলো কফিন নেওয়ার পথে যেন ছড়িয় দেয়। তার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, এসব সম্পদ আমার কোন কাজে আসলো না। কবরেও নেওয়া গেল না। দ্বিতীয়টি হলো, তাঁর লাশটি যেন ডাক্তারদের কাঁধে তুলে দেয়, তাঁর কারণ বললেন, ডাক্তাররা দাবি করে তারা মানুষ বাঁচায়। তারা আমার মত বীর ক্ষমতাশালী, সম্পদশালী ব্যক্তিকে শত চেষ্টায় বাঁচাতে পারলো না। তৃতীয়ত কাজটি হলো, কবরে আমার কফিন নিয়ে যাওয়ার সময় আমার একটি খালি হাত কফিনের বাইরে প্রসারিত রাখবে। কারণ বিশ্ববাসী দেখুক বিশ্ববিজেতা বীর আলেকজেন্ডার খালি হাতে ফেরত যাচ্ছে। এসব ঘটনা আমরা স্মরণ করি কিন্তু অনুসরণ করি না। অনুসরণের জন্য এ সব ঘটনা হতে আমাদের শিক্ষা গ্রহণ করা উচিৎ। আমাদের মনে রাখা উচিৎ মহান আল্লাহ পাক কালাম পবিত্র কোরআনের সবচেয়ে বড় আয়াতটি (প্রায় দেড় পৃষ্ঠা) সম্পদ বিষয়ক।
সম্পদ মানুষের দরকার, কিন্তু কতটুকু? যতটুকু না থাকলে মানুষের নিকট হাত পাততে হবে, যতটুক না থাকলে মর্যাদা ও চরিত্র রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে ততটুকু সম্পদের প্রয়োজন আছে। এভাবে সম্পদের পিছনে মেরাথন দৌড়ের অর্থ খুঁজে পাইনি।
লিও টলস্টয়ের একটি গল্প মনে পড়ে গেল। এক রাজা এক লোভি প্রজাকে ডেকে বললো, কাল সকালে সূর্য উদিত হওয়ার সাথে সাথে দৌড়তে থাকবে। রাজা দরবার হতে দৌড়ানো শুরু করবে এবং সূর্য্যস্তের আগেই রাজ দরবারে ফিরে আসবে। যতটুকু জায়গা দৌড়ে আসবে ততটুকু ভূসম্পত্তির মালিক হবে তুমি। লোকটি অধিক সম্পত্তির জন্য সকাল হতে এত বেশি দৌড়ল, ক্লান্ত হয়ে রাজ দরবারে এসে স্ট্রোক করে মারা গেল। লোকটিকে সাড়ে তিন হাত মাটিতে সমাহিত করা হলো। তার সম্পদের প্রয়োজন ছিল শেষ ঠিকানা, শেষ ঘরের জন্য সাড়ে তিন হাত। এত বেশি সম্পদের জন্য দৌড়ানোর অর্থ ছিল না। আল্লাহ আমাদের এসব কথা আত্মস্থ করার তৌফিক দান করুক।লেখক: কলাম লেখক, রাজনীতিক

সর্বশেষ

পাঠ্যপুস্তক

রতন চন্দ্র পাল, অতিথি লেখক: মানব সভ্যতার শ্রেষ্ঠ প্রকাশ...

ইজারাদারদের দাবি, সাতকানিয়া দেওয়ানহাট বাজার পরিচালনায় সুশাসন নিশ্চিতকরণের

অনলাইন ডেস্ক: সাতকানিয়ার দেওয়ানহাট বাজার পরিচালনায় সুশাসন নিশ্চিতকরণের দাবী...

যুক্তরাষ্ট্র আ.লীগের কৃষি বিষয়ক সম্পাদক নিযুক্ত সঞ্জয় কুমার সাহা

পূর্বকাল ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের কৃষি বিষয়ক সম্পাদক...

আ.লীগের কেন্দ্রীয় তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক উপকমিটির সদস্য হলেন বিধান রক্ষিত

নিজস্ব প্রতিবেদক: আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক...

সাতকানিয়ার কেরানীহাটে আশ্-শেফা স্কুল এন্ড কলেজে নাতে রাসুল (সাঃ) প্রতিযোগিতা সম্পন্ন

এস এম আনোয়ার হোসেন, দক্ষিণ চট্টগ্রাম: পবিত্র রবিউল আউয়াল...
spot_img