উত্তম কুমার আচার্য্য : ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির নিদর্শনসমূহের সুসংবদ্ধ সংগ্রহশালাই হলো জাদুঘর। জাদুঘরগুলো পৃথিবী ও মানব সভ্যতার পূর্বাপর পথরেখা আঁকতে প্রভূত সহায়তা করে। এ জন্য পৃথিবীর প্রায় সব দেশে জাদুঘর স্থাপিত হয়েছে।
১৯৭৭ সালের ২৮ মে মস্কোতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক জাদুঘর পরিষদের ১২তম সাধারণ সভার ৫ নং প্রস্তাব অনুমোদনের মাধ্যমে ১৮ মে তারিখে আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এই সিদ্ধান্ত অনুসরণে প্রথম আন্তর্জতিক জাদুঘর দিবস পালিত হয় ১৯৭৮ সালে। প্রথমবার পালিত এই দিবসের মূল প্রতিপাদ্য ছিলো, জাদুঘর জনগণের মাঝে সংস্কৃতি চর্চায়, এর সমৃদ্ধি সাধনে, পারস্পরিক মত বিনিময়ে সহযোগিতা প্রদানে এবং শান্তি স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ও সক্রিয় অবদান রাখবে। ১৯৭৮ সাল থেকে এরকম বিভিন্ন প্রতিপাদ্য বিষয়ের আলোকে জাদুঘর পেশাজীবীগণ যথাযথ মর্যাদায় এই দিবস পালন করেন এবং জাদুঘরের প্রতি দর্শক ও জনগণের সম্পৃক্ততা বাড়াতে সচেষ্ট হন।
১৯৮০ সালের পরবর্তী সময়ে বিশ্বায়নতত্ত্বের বিকাশ, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, তথ্য প্রযুক্তি ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী যোগাযোগ বৃদ্ধি ইত্যাদি কারণে মানবসভ্যতা একটি আধুনিক যুগে পদার্পণ করেছে। তার আগে জাদুঘরের কর্মকাণ্ড মূলত বস্তু নিদর্শনভিত্তিক পরিচালিত হতো। নিদর্শন সংগ্রহ ও উপস্থাপনাই প্রদর্শনী পরিকল্পনার প্রধান উদ্দেশ্য হিসেবে বিবেচিত হতো। গবেষণা কর্মকাণ্ডও ছিলো নিদর্শন ভিত্তিক। দর্শক, পারিপার্শ্বিক সমাজ, জাতি, জনগোষ্ঠী ইত্যাদি বিষয়গুল জাদুঘরের কর্মকাণ্ডের মধ্যে তেমনভাবে সম্পৃক্ত ছিল না। জাদুঘর শিক্ষা ব্যবস্থায় নানা সীমাবদ্ধতার কারণে প্রদর্শনী ছিল নিষ্ক্রিয়, প্রাণহীন। সমাজ ও জাতিগঠনে, উন্নয়ন সহযোগিতায়, বিকল্প শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় এবং সংস্কৃতিচর্চায় জাদুঘরের অবদান তখন ছিল নগণ্য। পরবর্তীতে বিশ্বায়নতত্ত্বের সূত্রপাত, উন্নয়নের সঙ্গে সংস্কৃতির একাত্মতা, প্রযুক্তির অগ্রগতি, যোগাযোগ ব্যবস্থায় অভূতপূর্ব পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন, গবেষণা ইত্যাদি নানা ধরনের উপাদানের প্রভাবে বিশ্বে জাদুঘর বিদ্যা জাদুঘর কর্মকাণ্ডের গতানুগতিক ধারা থেকে সরে আসতে শুরু করে। এসময় নিদর্শনভিত্তিক জাদুঘর ধারণার পরিবর্তে জনগোষ্ঠীভিত্তিক জাদুঘর ধারণার সূত্রপাত হয়। ব্যাপক ব্যাপ্তি ঘটে নিদর্শন ধারণার। নিদর্শনের পাশাপাশি অবস্থান নেয় কল্পনা প্রবণতার ধারণা। জাদুঘর ব্যবস্থাপনায় যুক্তিবাদী প্রক্রিয়া শুরু হয়। অর্থাৎ জাদুঘর ও জাদুঘরবিদ্যা পরিবর্তিত হয়ে দেখা দেয় একটি আন্দোলন হিসেবে।
আজ জাদুঘর চিন্তা কেবল ঐতিহাসিকের একক বিষয় নয়। সমাজবিদ, জাতিতাত্ত্বিক, সংস্কৃতিতাত্ত্বিক, শিক্ষাবিদ, শিক্ষা মনোবিজ্ঞানী, নৃতাত্ত্বিক, শিল্পকলাবিদ, ঐতিহাসিক, পরিবেশবিদ – প্রত্যেকেই জাদুঘর বিষয়ের তাত্ত্বিক, চিন্তক ও পরিকল্পক। আজ জাদুঘর হচ্ছে এমন একটি ব্যবস্থাপনা যা কোনো জনগোষ্ঠীকে অর্থনৈতিক, সামাজিক, শিক্ষা সংস্কৃতির পরিবর্তন, উন্নয়ন অনুধাবন ও নিয়ন্ত্রণ করতে শেখায়। বিশ্ব পরিবেশে জাদুঘরের দায়িত্ব ও কর্তব্য অনেক বেশি বেড়েছে। জাদুঘর এখন আর কেবলমাত্র বস্তুগত জ্ঞান সরবরাহ কিংবা নিষ্ক্রিয় প্রদর্শনীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সামাজিক মূল্যবোধ সংরক্ষণ ও টেকসই উন্নয়নের সহায়ক শক্তিরূপে সংস্কৃতির বহুমুখীকরণে, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে বিশ্বের জাদুঘরসমূহ। জাদুঘর যেমন দিচ্ছে অতীত ও বর্তমান সম্পর্কে ধারণা তেমনি দিচ্ছে ভবিষ্যতের ইঙ্গিত।
জাদুঘরের এই ব্যাপক ভূমিকার বিষয়টি মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার লক্ষ্যেই প্রতিবছর পালিত হয় আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস। বিকল্প শিক্ষায়, ব্যবসায়ে, টেকসই সমাজ গঠনে, উন্নয়নে, দেশীয় সংস্কৃতি সংরক্ষণ ও উন্নয়নে এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণে জাদুঘরের যে অপরিসীম দায়িত্ব, আজকের যুগে প্রতিটি মানুষই তা অনুধাবন করতে পারেন। এই অনুধাবনকে আরো সজাগ ও সক্রিয় করতে জাদুঘর দিবস পালনে ব্যাপক মানুষের সংশ্লিষ্টতা প্রয়োজন।বাংলাদেশ একটি উন্নয়নকামী দেশ। নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ছোট-বড় নানা ধরনের নানা বিষয়ের অনেক জাদুঘর প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় অবস্থিত উল্লেখযোগ্য জাদুঘর ও সংগ্রহশালার একটি জেলা-ভিত্তিক তালিকা নিচে দেওয়া হলো। সব জেলায় সরকারি জাদুঘর নেই; তাই যেসব জেলায় পরিচিত বা উল্লেখযোগ্য জাদুঘর আছে, সেগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যেমন : ঢাকায় রয়েছে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, আহসান মঞ্জিল জাদুঘর; নারায়ণগঞ্জে সোনারগাঁ লোক ও কারুশিল্প জাদুঘর; কুমিল্লায় ময়নামতী জাদুঘর; মুন্সীগঞ্জে বিক্রমপুর জাদুঘর; ফরিদপুরে ফরিদপুর জাদুঘর, জসীম উদ্দীন সংগ্রহশালা; মাদারীপুরে মাদারীপুর মিউজিয়াম; চট্টগ্রামে জাতিতাত্ত্বিক জাদুঘর, জিয়া স্মৃতি জাদুঘর, বাংলাদেশ মেরিটাইম মিউজিয়াম, রেলওয়ে জাদুঘর; কক্সবাজারে ফিশারিজ মিউজিয়াম; রাঙ্গামাটিতে উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট জাদুঘর; সিলেটে ওসমানী জাদুঘর, শ্রীমঙ্গল চা জাদুঘর; ময়মনসিংহে জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালা, ময়মনসিংহ জাদুঘর; জামালপুরে জামালপুর এস্টেট জাদুঘর; রাজশাহীতে বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর, বাঘা জাদুঘর; নওগাঁয় পাহাড়পুর প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর; নাটোরে উত্তরা গণভবন সংগ্রহশালা; রংপুরে রংপুর জাদুঘর; দিনাজপুরে দিনাজপুর জাদুঘর; লালমনিরহাটে লালমনিরহাট জেলা জাদুঘর; পঞ্চগড়ে পাথর জাদুঘর; খুলনায় খুলনা বিভাগীয় জাদুঘর; বাগেরহাটে বাগেরহাট জাদুঘর; কুষ্টিয়ায় কুষ্টিয়া পৌর জাদুঘর, কাঙাল হরিনাথ স্মৃতি জাদুঘর; মেহেরপুরে আমঝুপি নীলকুঠি জাদুঘর; ঝিনাইদহে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান স্মৃতি জাদুঘর প্রভৃতি।এছাড়া আরও কিছু ছোট আঞ্চলিক সংগ্রহশালা, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক জাদুঘর ও ব্যক্তিগত জাদুঘর বিভিন্ন জেলায় রয়েছে। বাংলাদেশের এসব জাদুঘরের অধিকাংশই নিষ্ক্রিয় প্রদর্শনী ও গতানুগতিক ধারার মধ্যে সীমাবদ্ধ। জাদুঘর ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে দর্শকদের চাহিদা অনুধাবন করতে হবে। তদনুযায়ী দেশের ইতিহাস – ঐতিহ্য – সংস্কৃতিকে তুলে ধরার মাধ্যমে একটি দেশাত্মবোধসম্পন্ন জাতি গড়ার লক্ষ্যে গুরুত্বের সাথে আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস পালন করতে হবে।
লেখক : শিক্ষাচিন্তক, কবি, প্রাবন্ধিক ও সাব-এডিটর- দৈনিক পূর্বকাল।


