নিজস্ব প্রতিবেদক: বিপ্লবী তারকেশ্বর দস্তিদার স্মৃতি পরিষদের উদ্যোগে বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে আজ শুক্রবার বিকেল ৪টায় চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সামনে এক পথসভা অনুষ্ঠিত হয়। পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার সিঞ্চন ভৌমিকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাজনীতিবিদ মিটুল দাশগুপ্ত এবং প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য রাখেন শ্রমিক নেতা নুরুল হুদা চৌধুরী।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট সাংগঠনিক ব্যক্তিত্ব মাস্টার অজিত শীল, মোহাম্মদ জানে আলম, অশোক চক্রবর্তী, কমল বড়ুয়া, সজল দাশ এবং নয়ন ধর।
বক্তারা বলেন, প্রকৃতি মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও পরিবেশ দূষণের ভয়াবহ প্রভাব আজ শুধু কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা জাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি সমগ্র পৃথিবীর অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানবজাতি, বন্যপ্রাণী, পাখি এবং সামুদ্রিক প্রাণী—সবাই আজ এক গভীর সংকটের মুখোমুখি। তাই নতুন প্রজন্মকে পরিবেশ ও প্রাণ-প্রকৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত করা সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি।
বক্তারা আরও বলেন, দেশে এখনো নির্বিচারে পাখি শিকার ও হত্যা করা হচ্ছে এবং পাখিকে বাজারের পণ্যে পরিণত করা হয়েছে। পরিবেশবিধ্বংসী এসব কর্মকাণ্ড রোধে রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান তারা।
তারা বলেন, বৃক্ষরোপণ নিঃসন্দেহে একটি মহৎ কাজ। তবে শুধু নতুন চারা রোপণ করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না; বিদ্যমান বৃক্ষ সংরক্ষণ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে বৃক্ষরোপণ আর অন্যদিকে নির্বিচারে বৃক্ষনিধন—এই দুই কার্যক্রম কখনো একসঙ্গে চলতে পারে না। একটি পূর্ণবয়স্ক গাছ কেটে ফেলার ক্ষতি বহু বছরেও পূরণ করা সম্ভব নয়।
বক্তারা উল্লেখ করেন, পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে একটি দেশের মোট আয়তনের কমপক্ষে ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা প্রয়োজন। অথচ সরকারি হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে বনভূমির পরিমাণ প্রায় ১৬ শতাংশ এবং বিভিন্ন বেসরকারি গবেষণায় এ হার ৯ শতাংশেরও কম বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তারা বলেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রাস্তার পাশের গাছ ব্যক্তিগত মালিকানার দাবি করে নির্বিচারে কেটে ফেলা হচ্ছে। অথচ রাস্তার ধারের গাছ মাটির ক্ষয়রোধ করে, দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমায়, পাখির আবাসস্থল তৈরি করে, শব্দ ও তাপদূষণ হ্রাস করে এবং মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেন সরবরাহ করে। তাই এসব গাছ সংরক্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।
বক্তারা বাংলাদেশের সংবিধানের ১৮(ক) অনুচ্ছেদের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, রাষ্ট্র বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন, প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য, জলাভূমি, বন ও বন্যপ্রাণীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সাংবিধানিক দায়িত্ব বহন করে। কিন্তু বাস্তবে এ অঙ্গীকার বাস্তবায়নে এখনও অনেক ঘাটতি রয়ে গেছে।
তারা আরও বলেন, মানুষের জীবনের জন্য অক্সিজেন অপরিহার্য, আর সেই অক্সিজেনের প্রধান উৎস হলো বৃক্ষ, লতাগুল্ম ও জলজ উদ্ভিদ। বিজ্ঞান যত উন্নতই হোক না কেন, প্রকৃতির মতো অবিরাম ও সহজ উপায়ে অক্সিজেন উৎপাদনের বিকল্প এখনো সৃষ্টি করতে পারেনি।
নগর পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও পরিবেশবান্ধব দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে বক্তারা বলেন, ভবনের নকশা অনুমোদনের সময় পানি, বিদ্যুৎ, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ও পার্কিংয়ের পাশাপাশি সবুজায়ন ও বৃক্ষরোপণের বিষয়টিও বাধ্যতামূলক করা উচিত। ভবনে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যার অনুপাতে বৃক্ষরোপণের জন্য নির্দিষ্ট স্থান সংরক্ষণ এবং উপযুক্ত প্রজাতির গাছ রোপণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
পথসভা থেকে বক্তারা বলেন, বর্তমানে দেশের বিপুল পরিমাণ বনভূমি অবৈধ দখলদারদের কবলে রয়েছে। বনভূমি দখল, জলাশয় ভরাট, পাখি নিধন এবং নির্বিচারে বৃক্ষ কর্তনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। পরিবেশ সংরক্ষণকে উন্নয়নের প্রতিবন্ধক নয়, বরং টেকসই উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
সভা থেকে পরিবেশ রক্ষায় সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, বিদ্যমান বৃক্ষ সংরক্ষণ, বনভূমি উদ্ধার এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানানো হয়।


