নিজস্ব প্রতিবেদক: চট্টগ্রাম মহানগরের দীর্ঘদিনের যানজট, ট্রাফিক বিশৃঙ্খলা ও সড়কে আইন অমান্যের প্রবণতা কমাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) স্মার্ট ট্রাফিক সিস্টেম চালুর উদ্যোগ নিয়েছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক)। নগরীর ৫৬টি গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারসেকশন ও ব্যস্ত ট্রাফিক জোনকে এ প্রযুক্তির আওতায় এনে সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা পরিচালনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সোমবার (১৫ জুন) চসিকের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত এক সভায় একটি কনসালটেন্সি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা চট্টগ্রাম নগরীর জন্য প্রস্তুতকৃত দুটি প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়ন প্রকল্পের প্রস্তাবনা উপস্থাপনা শেষে সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন এ তথ্য জানান।
সভায় মেয়র বলেন, চট্টগ্রামকে ‘ক্লিন, গ্রিন, হেলদি, সেফ অ্যান্ড স্মার্ট সিটি’ হিসেবে গড়ে তুলতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার অপরিহার্য। আমাদের প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হচ্ছে এআই-ভিত্তিক স্মার্ট ট্রাফিক সিস্টেম। চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের যানজট, ট্রাফিক বিশৃঙ্খলা এবং সড়কে আইন অমান্যের প্রবণতা কমাতে এই প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
২১৭ কোটি ৩৩ লাখ টাকা এ প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, প্রকল্পের আওতায় নগরের গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও ট্রাফিক করিডোরগুলোতে স্মার্ট সিগন্যাল, ট্রাফিক ফ্লো মনিটরিং ক্যামেরা, আইন লঙ্ঘন শনাক্তকারী ক্যামেরা, নম্বরপ্লেট শনাক্তকরণ ব্যবস্থা, রেড সিগন্যাল ডিটেক্টর এবং কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মাধ্যমে যানবাহন চলাচল পর্যবেক্ষণ করা হবে। এই সিস্টেম সম্পূর্ণ এআই-ভিত্তিক। কোনো যানবাহন ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করলে সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করা যাবে। যানবাহনের নম্বরপ্লেট, চলাচলের ধরন এবং ট্রাফিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে। এর ফলে যানজট কমবে, সড়কে শৃঙ্খলা ফিরবে এবং নগরবাসীর দুর্ভোগ হ্রাস পাবে।
তিনি আরও বলেন, নগরের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ত ট্রাফিক করিডোর এই প্রকল্পের আওতায় আনা হয়েছে। ফলে পুরো শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
সভায় মেয়র নগর নিরাপত্তা জোরদারে দ্বিতীয় একটি প্রকল্পের কথাও তুলে ধরেন। প্রায় ৪৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৩০ কিলোমিটার সড়কে সৌরবিদ্যুৎ চালিত অত্যাধুনিক এলইডি সড়কবাতি, ইলেকট্রনিক ডিসপ্লে বোর্ড এবং সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে বলে তিনি জানান।
মেয়র বলেন, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় সংঘটিত অপরাধ, সন্ত্রাসী কার্যকলাপ, দুর্ঘটনা কিংবা অন্য কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে সড়কবাতির সঙ্গে সংযুক্ত সিসিটিভি নেটওয়ার্ক নগর নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করবে। প্রযুক্তিনির্ভর এ অবকাঠামোর মাধ্যমে জলাবদ্ধতা, ড্রেনেজ প্রতিবন্ধকতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং অন্যান্য নাগরিক সমস্যার বিষয়ে আগাম সতর্কবার্তা পাওয়ার সুযোগও সৃষ্টি হবে। ফলে নগর ব্যবস্থাপনায় দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়া সহজ হবে।
সৌরবিদ্যুৎ চালিত স্মার্ট সড়কবাতি স্থাপনের ফলে বিদ্যুৎ ব্যয় ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে আসতে পারে বলেও উল্লেখ করেন মেয়র। তিনি বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং পরিবেশবান্ধব নগর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতেও এ প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। প্রকল্প দুটির বিষয়ে পুলিশ প্রশাসন, বিআরটিএ এবং সংশ্লিষ্ট সব সেবা সংস্থার মতামত নেওয়া হবে। তাদের সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত করে চূড়ান্ত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রস্তুত করা হবে।
সভায় উপস্থিত কর্মকর্তারা বলেন, এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে কিছু পুরকৌশলগত কাজ সম্পন্ন করতে হবে। বিশেষ করে লেন মার্কিং, ট্রাফিক আইল্যান্ড সংস্কার, নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগ এবং স্থাপিত ক্যামেরা ও যন্ত্রপাতির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। তারা পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সেবা সংস্থার পরামর্শ নিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা উল্লেখ করেন।
সভায় চসিকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সচিব মো. আশরাফুল আমিন, প্রধান প্রকৌশলী আনিসুর রহমান, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পুর) ফরহাদুল আলম, আবু সাদাত তৈয়ব এবং কনসালটেন্সি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।


