জোবায়দুর রশীদ : বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য আজ আর প্রান্তিক কোনো বিষয় নয়; এটি একটি জাতীয় উন্নয়ন, জনস্বাস্থ্য এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের প্রশ্ন। বিষণ্নতা, উদ্বেগ, আত্মহত্যা, মাদকাসক্তি, পারিবারিক সহিংসতা, শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ, কর্মক্ষেত্রের স্ট্রেস এবং জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগজনিত ট্রমা—সব মিলিয়ে দেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি।কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কে প্রদান করবে?
সম্প্রতি বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল আইন, ২০১৮-এর বাস্তবায়ন এবং সংশ্লিষ্ট নির্দেশনা নিয়ে পেশাজীবী মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকের উদ্বেগ, যদি মনোসামাজিক স্বাস্থ্যসেবা ও সাইকোথেরাপি কার্যক্রমের আইনগত পরিসর এমনভাবে নির্ধারিত হয় যে বাস্তবে কেবল ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টরাই এই সেবা দিতে পারবেন, তাহলে দেশের বিদ্যমান মানবসম্পদের একটি বড় অংশ কার্যত সেবা প্রদানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে।

বাংলাদেশের জনসংখ্যা বর্তমানে প্রায় ১৮ থেকে ১৯ কোটি। অথচ ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টের সংখ্যা এই বিশাল জনগোষ্ঠীর তুলনায় অত্যন্ত সীমিত। যদি কয়েকশ পেশাজীবীর ওপর পুরো দেশের মানসিক স্বাস্থ্যসেবার দায়িত্ব বর্তায়, তাহলে বাস্তবে জনগণের জন্য সেবা কতটা সহজলভ্য হবে—সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রশ্ন।
অন্যদিকে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবছর সাইকোলজি বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করে অসংখ্য শিক্ষার্থী বের হচ্ছেন। পাশাপাশি নাট্যকলা, এক্সপ্রেসিভ আর্টস, কাউন্সেলিং, ট্রমা কেয়ার এবং মনোসামাজিক সহায়তা বিষয়ে প্রশিক্ষিত জনবলও তৈরি হচ্ছে। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক এনজিও বহু বছর ধরে কমিউনিটি পর্যায়ে মনোসামাজিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। দুর্যোগ, শরণার্থী সংকট, নারী ও শিশু সুরক্ষা, মাদক পুনর্বাসন এবং কমিউনিটি স্বাস্থ্য কর্মসূচিতে এসব কর্মীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন।
এখন প্রশ্ন হলো—এই দক্ষ ও প্রশিক্ষিত মানবসম্পদের স্থান কোথায়?
বিশ্বের অধিকাংশ উন্নত দেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা একটি বহুমাত্রিক ব্যবস্থা। সেখানে ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টদের পাশাপাশি কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট, সাইকোথেরাপিস্ট, ড্রামা থেরাপিস্ট, আর্ট থেরাপিস্ট, লাইসেন্সধারী কাউন্সেলর, সাইকিয়াট্রিক সোশ্যাল ওয়ার্কার এবং কমিউনিটি মেন্টাল হেলথ প্র্যাকটিশনাররা কাজ করেন। প্রত্যেকের জন্য নির্দিষ্ট যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ, নৈতিক মানদণ্ড এবং নিবন্ধন কাঠামো থাকে। ফলে জনগণ সহজে সেবা পায় এবং মানও বজায় থাকে।
বাংলাদেশেও হয়তো এখন সময় এসেছে ‘একটি পেশা বনাম অন্য পেশা’ বিতর্কের বাইরে গিয়ে একটি সমন্বিত জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য কর্মশক্তি (National Mental Health Workforce) গঠনের কথা ভাবার।
সরকার চাইলে বিভিন্ন স্তরের লাইসেন্সিং ব্যবস্থা চালু করতে পারে। যেমন—ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট, কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট, সাইকোথেরাপিস্ট, এক্সপ্রেসিভ আর্টস থেরাপিস্ট, কমিউনিটি মেন্টাল হেলথ ওয়ার্কার এবং সাইকোসোশ্যাল সাপোর্ট প্র্যাকটিশনারদের জন্য পৃথক নিবন্ধন ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। এতে একদিকে সেবার মান নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে দেশের বাস্তব চাহিদাও পূরণ হবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মানবসম্পদ উন্নয়ন। শুধুমাত্র আইন প্রণয়ন করলেই দক্ষ পেশাজীবী তৈরি হয় না। প্রয়োজন প্রশিক্ষণ, সুপারভিশন, ইন্টার্নশিপ, গবেষণা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকোলজি বিভাগগুলোতে আরও বেশি প্রায়োগিক ও ক্লিনিক্যাল উপাদান যুক্ত করা যেতে পারে। পাশাপাশি ৩ থেকে ৬ মাস মেয়াদি সার্টিফিকেট কোর্সের মাধ্যমে প্রাথমিক মনোসামাজিক সহায়তা প্রদানকারী কর্মী তৈরি করা যেতে পারে, যারা কমিউনিটি পর্যায়ে কাজ করবেন এবং প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞদের কাছে রেফার করবেন।
এই বিষয়টি নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে আরও উন্মুক্ত আলোচনা প্রয়োজন। পেশাজীবী সংগঠন, বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজকে একসঙ্গে বসে একটি বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে। বিভাগীয় ও জাতীয় পর্যায়ে সেমিনার, গোলটেবিল বৈঠক, গবেষণা প্রতিবেদন এবং নীতিপত্রের মাধ্যমে বিষয়টি সামনে আনা যেতে পারে।
মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কোনো একক পেশার একচ্ছত্র ক্ষেত্র নয়; এটি জনগণের অধিকার। তাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত—মান বজায় রেখে কীভাবে সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষকে নিরাপদ, বৈজ্ঞানিক এবং সহজলভ্য সেবা দেওয়া যায়।
১৮ থেকে ১৯ কোটি মানুষের দেশে যদি মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কেবল অল্পসংখ্যক পেশাজীবীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে সেবার চাহিদা ও প্রাপ্যতার মধ্যে একটি গভীর বৈষম্য তৈরি হবে। সেই বৈষম্য দূর করতে প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক নীতি, অন্তর্ভুক্তিমূলক আইন এবং দক্ষ মানবসম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার।
বাংলাদেশের মানসিক স্বাস্থ্য খাত আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। এখনই সময় এমন একটি কাঠামো গড়ে তোলার, যেখানে মান, নিরাপত্তা এবং সেবার বিস্তার—এই তিনটি বিষয় সমান গুরুত্ব পাবে। কারণ মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কেবল একটি পেশাগত বিষয় নয়; এটি জাতীয় উন্নয়ন, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং মানবিক মর্যাদার প্রশ্ন।


