অনলাইন ডেস্ক: শহর থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরত্বে আনোয়ারার বটতলী ইউনিয়নের রুস্তমহাট এলাকায় হযরত শাহ্ মোহছেন আউলিয়ার (রা.) মাজার শরীফ। সুদূর আরব থেকে সমুদ্রপথে ইসলাম প্রচারে ৬শ বছর আগে মামা বদর আউলিয়ার (রহ.) সঙ্গে আনোয়ারায় এসেছিলেন তিনি।শনিবার (২০ জুন) বার্ষিক ওরশ ঘিরে মাজার প্রাঙ্গণে সমবেত হচ্ছেন ভক্তরা। বার্ষিক ওরশ উদযাপন কমিটি ও মাজার পরিচালনা কমিটির যুগ্ম মোতোয়াল্লী এস এম জহিরুল ইসলাম ও এস এম ফজলুল করিম জানান, ওরশ উপলক্ষে খতমে কোরআন, মিলাদ ও দোয়া মাহফিল, ধর্মীয় আলোচনা, আখেরি মোনাজাত ও তাবারুক বিতরণ করা হবে।
আনোয়ারা ছাড়াও দক্ষিণ চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত ভক্তদের জন্য থাকা-খাওয়া, বিশ্রাম ও নিরাপত্তাসহ প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।প্রতি বছর ৬ আষাঢ় হযরত শাহ মোহছেন আউলিয়া (রহ.) এর ওরশ অনুষ্ঠিত হয়।এ উপলক্ষে বটতলীসহ আশপাশের গ্রামগুলো উৎসবের আমেজে মুখরিত থাকে। ওরশ ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও যানজট নিয়ন্ত্রণে আনোয়ারা থানা প্রশাসনও প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে।
আনোয়ারা থানার ওসি মো. জুনায়েত চৌধুরী জানিয়েছেন, ওরশ উপলক্ষে মাজার এলাকা এবং আশপাশে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। মাজার পরিচালনা কমিটি সূত্রে জানা যায়, মাহাবুবে রব্বানী গাউছে ছমদানি হযরত শাহসূফি ছৈয়দ বাবা মোহছেন আউলিয়া (রহ.) ১৪৬৬ সনের ১২ রবিউল আউয়াল জন্মগ্রহণ করেন। শত বৎসর পূর্বে মামা হযরত বদর আউলিয়া (রহ.) সহ তিনি প্রথম দিল্লিতে পদার্পণ করেন। এরপর আনোয়ারার দক্ষিণ গহিরা গ্রামের পশ্চিমে সমুদ্র উপকূল কড়ির হাট নামক স্থানে আসেন। কড়ির হাটে মামা-ভাগিনা সাময়িক অবস্থান করেছিলেন, তাদের আস্তানাও গড়ে তোলেন সেখানে।
প্রথম আগমনস্থলের নাম ‘বার আউলিয়া আস্তানা’ হিসেবে পরিচিতি পায়। স্থানটি সাগরে তলিয়ে গেলে এলাকার লোকজন নিকটবর্তী সমুদ্রের তীরে ‘বার আউলিয়া আস্তানা’ পুনঃনির্মাণ করে আজও স্মৃতি ধরে রেখেছেন। কড়ির হাট থেকে হযরত শাহ্ মোহছেন আউলিয়া (রহ.) ও হযরত শাহ্ বদর আউলিয়া (রহ.) কর্ণফুলীর উত্তর পাড়ে চলে আসেন। হযরত শাহ্ বদর আউলিয়া (রহ.) চেরাগী পাহাড় এলাকায় চাটি জ্বালিয়ে অবস্থান গ্রহণ করেন। হযরত শাহ্ বদর আউলিয়া (রহ.) নগরীতে স্থায়ীভাবে আস্তানা গাড়লেও হযরত শাহ্ মোহছেন আউলিয়া (রহ.) পুনরায় আনোয়ারায় চলে যান।জনশ্রুতি আছে, ৮২৫-৮৭০ হিজরির কোনো এক সময়ে ইসলাম ধর্ম প্রচারের জন্য হযরত শাহ্ মোহছেন আউলিয়া (রহ.) চট্টগ্রামে আসেন। দীর্ঘদিন ধরে এবাদত রেয়াজতে মগ্ন থেকে ৯৮৫ হিজরী, ৬ আষাঢ় ১৫৬৫ সনে তিনি জান্নাতবাসী হন।
ডা. গোলাম সাকলায়েন এর লেখা ‘বাংলাদেশ সুফী সাধক’ গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়, হযরত শাহ্ মোহছেন আউলিয়ার (রহ.) কোনও পুত্রসন্তান নেই। বাংলাদেশে আগমনের পূর্বে তাঁর একমাত্র কন্যা নুরজাহানের সাথে ভ্রাতুষ্পুত্র শাহ্ সেকান্দরের বিয়ে দিয়েছিলেন। পরে তাদেরকে ভারতে রেখে পানিপথে চট্টগ্রামে এসেছিলেন। কন্যা নুরজাহান ও জামাতা সেকান্দর পরে মোহছেন আউলিয়ার খোঁজে চলে আসেন আনোয়ারার ঝিওরি গ্রামে। তারা তাঁর সাথে সেখানে বসবাস শুরু করেন। ঝিওরি গ্রামে অবস্থানকালে হযরত শাহ্ মোহছেন আউলিয়া (রহ.) অনেক অলৌকিক ঘটনার জন্ম দেন।
ড. মুহাম্মদ এনামুল হকের ‘পূর্ব পাকিস্তানে ইসলাম’ নামক গ্রন্থে হযরত শাহ্ মোহছেন আউলিয়ার (রহ.) ওফাতকাল ১৩৯৭ খ্রিস্টাব্দ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ঝিওরি গ্রামে প্রথম তাঁকে দাফন করা হয় এবং সেখানেই মাজার গড়ে ওঠে। শঙ্খ নদীর ভাঙনে এক পর্যায়ে মাজারটি নদীতে বিলীন হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। বর্তমান বটতলী মাজারের পাশে লাশ মোবারক বটগাছের নিচে দাফন করা হয়। সেই থেকে ওই জায়গাটির নাম হয় বটতলী গ্রাম। এটি শাহ্ মোহছেন আউলিয়ার (রহ.) দ্বিতীয় মাজার, যেখানে তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন। মাজারে আরবিতে লেখা একটি কালো পাথরের শিলালিপি এখনও সংরক্ষিত আছে। মেয়ে নুরজাহান ও জামাতা সেকান্দরকেও সেখানে কাছাকাছি কবর দেওয়া হয়।


