ক্রীড়া ডেস্ক: ডালাসের আকাশে তখন সন্ধ্যা নেমেছে। গ্যালারিজুড়ে নীল-সাদা পতাকার ঢেউ, আর মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে এক মানুষ লিখে চলেছেন ফুটবলের নতুন ইতিহাস। কিছুক্ষণ আগেই পেনাল্টি মিস করেছিলেন তিনি। কিন্তু লিওনেল মেসির গল্প কখনো একটি ব্যর্থতায় আটকে থাকে না। দুই গোলে অস্ট্রিয়াকে হারিয়ে আর্জেন্টিনাকে দ্বিতীয় রাউন্ডে তুললেন, আর একই সঙ্গে বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে নিজের নাম লিখলেন ইতিহাসের পাতায়। ডালাসের সেই রাত তাই শুধু একটি জয়ের গল্প নয়, এটি আরেকটি মেসি-অধ্যায়ের জন্ম।ম্যাচের শুরুতেই পেনাল্টি পেয়েছিল আর্জেন্টিনা। স্পট কিকে দাঁড়িয়েছিলেন অধিনায়ক মেসি। অস্ট্রিয়ার গোলরক্ষক আলেকজান্ডার শ্লাগার যেন আগে থেকেই বুঝে রেখেছিলেন কী হতে যাচ্ছে। মেসির শট ঠেকিয়ে দিয়ে তিনি স্তব্ধ করে দেন হাজারো আর্জেন্টাইন সমর্থককে। কিন্তু মেসির গল্প কি কখনও একটি মিস করা পেনাল্টিতে শেষ হয়?
মাঝমাঠ থেকে নিজেরাই আক্রমণের সূচনা করেন মেসি। বল যায় থিয়াগো আলমাদার কাছে, সেখান থেকে ফাকুন্দো মেদিনা। বাম প্রান্ত থেকে মেদিনার নিচু ক্রস আবার পৌঁছে যায় আলমাদার পায়ে। কিন্তু আলমাদা শট না নিয়ে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে বল ছেড়ে দেন পাশে থাকা মেসির জন্য। বাঁ পায়ের নিখুঁত ফিনিশে কাছের পোস্ট দিয়ে বল জালে জড়িয়ে দেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।গোলের সঙ্গে সঙ্গেই লেখা হয়ে যায় নতুন ইতিহাস। বিশ্বকাপে এটি ছিল মেসির ১৭তম গোল—যা তাকে জার্মান কিংবদন্তি মিরোশ্লাভ ক্লোসার ১৬ গোলের রেকর্ড ছাড়িয়ে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে বসায়।
ইনজুরি টাইমে আবারও নিজের জাদু দেখান তিনি। প্রায় একক প্রচেষ্টায় ড্রিবল করে বক্সে ঢুকে পড়েন। গোলকিপার সামনে, পোস্টে দাঁড়িয়ে দুই ডিফেন্ডার—তবু থামানো যায়নি তাকে। প্রায় মাটিতে স্লাইড করতে করতে নেওয়া তার শট জড়িয়ে যায় জালে। ডালাস স্টেডিয়াম তখন কেবল এক নামেই মুখর—মেসি।
২-০ গোলের এই জয়ে টানা দ্বিতীয় ম্যাচ জিতে নকআউট পর্ব নিশ্চিত করে ফেলে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। দুই ম্যাচ শেষে তাদের সংগ্রহ ছয় পয়েন্ট। আরও এক ম্যাচ হাতে রেখেই শেষ ৩২ নিশ্চিত করেছে লিওনেল স্কালোনির দল।সংখ্যার হিসাবে মেসির বিশ্বকাপ এখন অবিশ্বাস্য। প্রথম ম্যাচে আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক, দ্বিতীয় ম্যাচে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল। দুই ম্যাচে আর্জেন্টিনার পাঁচ গোলের সবকটিই এসেছে তার পা থেকে। পরপর দুই ম্যাচেই হয়েছেন ম্যাচসেরা।
অস্ট্রিয়া অবশ্য সহজে হার মানেনি। পল ওয়ানারের নেতৃত্বে কয়েকবার পাল্টা আক্রমণ গড়ে তুলেছিল তারা। কিছু সময় আর্জেন্টিনার মাঝমাঠকে চাপে ফেলতেও সক্ষম হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনার রক্ষণ ভাঙার মতো ধার দেখাতে পারেনি ইউরোপের দলটি।
এই ম্যাচ আবারও মনে করিয়ে দিল, মেসি শুধু গোল করেন না, ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণও করেন। বল পায়ে না থাকলে তিনি ধীরে হাঁটেন, জায়গা খুঁজে নেন, শক্তি সঞ্চয় করেন। আর বল পেলেই এমন সব ফাঁকা জায়গা তৈরি করেন, যেগুলো অনেক খেলোয়াড় কল্পনাও করতে পারেন না।
পেনাল্টি মিস দিয়ে শুরু হওয়া রাত শেষ হলো ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল আলোয়। বিশ্বকাপে নতুন সর্বোচ্চ গোলদাতা, টানা দুই ম্যাচে পাঁচ গোল, আর আর্জেন্টিনাকে নকআউটে তোলা—৩৯ বছর ছুঁইছুঁই বয়সেও লিওনেল মেসি যেন এখনও প্রমাণ করে চলেছেন, ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে শেষ কথাটা এখনো তিনিই বলেন।


