নিজস্ব প্রতিবেদক: হজরত ইমাম হোসাইনের (রা.) কারবালার প্রান্তরে শাহাদাতের হৃদয়বিদারক ঘটনার স্মরণে ‘শিয়া ইমামিয়া ইসনা আশারা মুমিনবৃন্দ’র আয়োজনে শোক মিছিল বের হয়েছে চট্টগ্রামে। শত শত নারী, শিশুসহ নানা বয়সী শিয়ারা কালো পোশাক পরে, খালি পায়ে এ মিছিলে অংশ নেন।এ সময় তাঁরা শোকাবহ কারবালার নানা ঘটনাবলি তাজিয়া, প্রতীকী কফিন, পতাকা, স্লোগান, মাতম ও কথামালায় তুলে ধরেন।
শুক্রবার (২৬ জুন) সকালে নগরের সদরঘাট ইমাম ইমাম বাড়ি থেকে শোক মিছিল বের হয়।মাওলানা আমজাদ হোসেন এতে নেতৃত্ব দেন। এ সময় বিপুলসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করেন।
মিছিলে ‘নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবর’, ‘ইয়া হোসেন’, ‘লাব্বায়িক ইয়া হোসেন’ ইত্যাদি স্লোগান দেওয়া হয়। হৃদয়গ্রাহী কণ্ঠে ‘আখেরি সালাম লও ওহে নানাজান, তোমারি হোসেন যায় কারবালা ময়দান’সহ ধর্মীয় নাত, গজল পরিবেশন করে যুবকরা মাতম করেন।পিপাসার্ত পথচারীদের মধ্যে বিতরণ করা হয় শরবত।
মিছিলটি কালীবাড়ি মোড়, নিউমার্কেট মোড়, কোতোয়ালী মোড়সহ গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় ইমাম বাড়িতে ফিরে যায়। সেখানে দিনব্যাপী শিয়াদের চিরায়ত ঐতিহ্য অনুযায়ী আচার-অনুষ্ঠান, আলোচনা আর প্রার্থনা হচ্ছে।
বাবা তার ছোট্ট সন্তানকে কাঁধে নিয়ে শরিক হয়েছেন মিছিলে। ছোট্ট শিশুটির হাতে কালো পতাকা। আবেগাপ্লুত কণ্ঠে এই বাবা বলেন, ১০ মহররম হৃদয়বিদারক ঘটনা। ইমাম হোসাইন সপরিবারে কারবালার মরু প্রান্তরে শহীদ হয়েছেন। আজ আমার বাচ্চাকে নিয়ে হাঁটছি কিন্তু সেদিন ছয় মাসের সন্তানও রেহাই পাননি ইয়াজিদ বাহিনীর হাতে। সেই স্মৃতি বুকে ধারণ করে আমার সন্তানকে নিয়ে কারবালার জুলুসে এসেছি।
একজন নারী বলেন, আজ ১০ মহররম। আমাদের পবিত্র আশুরা। কারবালায় ইমাম হোসাইন শহীদ হয়েছেন, তাঁর স্মরণে আমরা শোক পালন করছি। ইসলামের জন্য, হক প্রতিষ্ঠার জন্য নবীজীর বংশধর জীবন দিয়েছেন। এমনকি ছোট্ট আলি আজগর পিপাসার্ত অবস্থায় শহীদ হয়েছেন। উনাকে তীর মেরে শহীদ করা হয়েছে। ইমামের মিছিলে যে নারীরা ছিলেন, তাঁদের ওপর জুলুম করা হয়েছে।
মাওলানা আমজাদ হোসেন বলেন, শোকাবহ কারবালার ঘটনা স্মরণে প্রতিবছর ১০ মহররম তাজিয়া মিছিল বের করি আমরা। ভাবগম্ভীর পরিবেশে কারবালার শহীদদের জীবন ও কর্ম নিয়ে আলোচনা, শোকগাথা, প্রার্থনা হচ্ছে ইমাম বাড়িতে।
তিনি বলেন, আজ আশুরা। হজরত মা ফাতেমা ও মাওলা আলীর সন্তান ইমাম হোসাইন (রা.) রাসুলুল্লাহর দৌহিত্র। জালেমের বিরুদ্ধে, জুলুমের বিরুদ্ধে, অত্যাচারীর বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন ইমাম হোসেন। তিনি মাথা দিয়েছেন, হাত দেননি। আত্মসমর্পণ করেননি। ঠিক সেভাবে আমরা পুরো পৃথিবীর মানুষকে বলতে চাই, জুলুমকে স্বীকার করবেন না, জালেম যেই হোক তাকে আমরা সাহায্য করতে পারি না। মজলুম যে হবে, যে জাতির, বর্ণের হোক আমরা তাকে সমর্থন করব। মানবতার শিক্ষা নিতে চাই। কারবালার শিক্ষা কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়, এটি সত্য, ন্যায়বিচার ও মানবতার পক্ষে দাঁড়ানোর এক চিরন্তন আহ্বান। আজ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মুসলমানসহ নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর ওপর হত্যা, নিপীড়ন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে।
মাওলানা আমজাদ হোসেন বলেন, আমরা সব ধরনের যুদ্ধ, আগ্রাসন ও নিরপরাধ মানুষের রক্তপাতের তীব্র নিন্দা জানাই। বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠা, মুসলিম উম্মাহর ঐক্য সুদৃঢ় করা এবং সব ধরনের জুলুম-নির্যাতনের অবসানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর ভূমিকা কামনা করছি। একই সঙ্গে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনিকে হত্যাকারীদের কঠিন শাস্তি কামনা করি ও ধিক্কার জানাই। ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ ও নিরীহ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার রক্ষায় বিশ্ব সম্প্রদায়কে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। কারবালার মহান আদর্শ আমাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে এবং শান্তি, ন্যায় ও মানবতার পক্ষে ঐক্যবদ্ধ থাকতে শিক্ষা দেয়।
তিনি মিছিলে সহায়তার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, আমরা চাই শোককে শক্তিতে পরিণত করতে।
পবিত্র আশুরা-২০২৬ উপলক্ষে তাজিয়া মিছিলসহ বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ পরিবেশে সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী। এ লক্ষ্যে সোমবার (২২ জুন) বিকেলে দামপাড়া পুলিশ লাইন্সে সিএমপির উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয় নিরাপত্তা সমন্বয় সভা।


