মোস্তফা কামাল যাত্রা : এই অবক্ষয়ী ভেঙ্গে পড়া অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যে দাঁড়িয়ে সমাজের ব্যাপকতর অংশের মানুষ যেমন এই অর্থনৈতিক কাঠামোটাকের ভেঙ্গে দুমড়ে মুচড়ে দিয়ে একটা নুতন অর্থনৈতিক কাঠামের গড়ে তোলবার জন্য লড়াই করে আসছে হাজার হাজার বছর ধরে সেই লড়াই চলে আসছে ধারাবাহিকভাবে, তেমনই সেই মানুষই আবার এই সমাজ ব্যবস্থার উপরিকাঠামোর পরিবর্তনের জন্য সংগ্রাম করে চলেছে, এটাও হাজার হাজার বছরের ইতিহাস। স্বাভাবিকভাবেই তাই কোন শিল্প-সাহিত্য, সংস্কৃতি-রাজনীতির বাইরে নয়, রাজনীতির সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
একটা শ্রেনী বিভক্ত সমাজ ব্যবস্থাতেই যে দ্বন্দ্ব শ্রেণীতে যে দ্বন্দ্ব, বুর্জোয়া জমিদার একটা শ্রেণী, শোষিত মানুষ একটা শ্রেণী, এই উভয়ের মধ্যে যে সংগ্রাম এবং এই সংগ্রামের জন্য যে নীতি সেই নীতিটাই হচ্ছে রাজনীতি। মার্কস এবং এঙ্গেলস বৈজ্ঞানিক বস্তবাদের ভিতর দিয়ে বৈজ্ঞানিক বিম্লেষণের ভেতর দিয়ে প্রচার করলেন যে শ্রেণী সংগ্রাম ছাড়া, বিশ্বের মানুষের মুক্তি নেই, অর্থনৈতিক দাসত্ব থেকে মুক্তি নেই। ১৯৯৭ সালে কমরেড লেলিনের নেতৃত্বে রাশিয়ার শ্রমিকশ্রেণী প্রমাণ করে দিয়েছে যে মার্কস, এঙ্গেলস-এর বিশ্লেষণ ভূল নয়।
যে সময় যে সে কারণগুলো ভেতরেতে যে যে ঈড়হঃৎধফরপঃরড়হ গুলো মৎড়ি করেছে, সেই Contradiction নিয়ে আমরা নাটকের ক্ষেত্রে; শিল্প- সাহিত্য, সংস্কৃতির ক্ষেত্রেতো একটা অগ্রগতির দিক দেখতে পাই, যে অগ্রগতির দিক ধরে আজরে পৃথিবীতে মানুষ, বিশেষ করে নাটকের জগত, একটা ইতিবাচক ভূমিক পালন করার দিকে চলেছে। সেই ইসকাইলাস যুগেতে সেই এমথিউস টহনড়ঁহফ- এর সময় থেকে। প্রতিবাদী নাটকের যে সূচনা ঘটেছিল তার রাস্তা ধরে পৃথিবীতে বহু তাবড় তাবড় নাট্যকার এসেছেন- মানুষের জয়গান তারা গেয়েছেন বিজ্ঞানকে তারা স্বীকার করে নিয়েছেন বৈজ্ঞানিক বস্তুবাদের ভিত্তিতে রাজনীতিকে তার স্বীকার করে নিয়েছেন এবং নাটকের ভিতর দিয়ে তার প্রতিফলন ঘঠিয়েছেন।
বিশ্ব-নাট্য ইতিহাসে বার্টোল্ড ব্রেখট উল্লেখিত নাট্যভাবনা ও সমাজ চেতনার বিশ্বস্থ একজন নাট্যজন। নাটকে রাজনীতি এবং রাজনৈতিক নাটকের যে উত্তরাধিকার আমাদের রয়েছে, সেখানে বর্টোল্ড ব্রেখট প্রচন্ডতম ব্যক্তিত্ব নিয়ে তাঁর সময়কালকে চাড়িয়ে আজও আমাদের কাছে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। আধুনিক নাট্যকারদের মধ্যে বার্টোল্ড ব্রেখট একই সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও গোপন, সরল ও জটিল। তাঁর সৃষ্ট প্রাথমিক চরিত্ররা নৈরাজ্যিক প্রবৃত্তির দ্বারা পরিচালিত হয়েছে। কিন্তু পরবর্তী চরিত্ররা আবেগী বিশৃঙ্খলার সঙ্গে যৌক্তিক নিয়ন্ত্রণের একটা মাঝামাঝি পথ অনুসরণ করেছেন।
মূলতঃ ব্রেখটের মধ্যে যুক্তি ও আবেগের দ্বন্দ্বই তাঁর চরিত্রসমূহকে দ্বৈততায় চিত্রিত করেছে। দ্বৈততার বিষয়ে কোন সুনির্দিষ্ট সমাধানে আসতে না পারার জন্যই ব্রেখট যে পৃথিবী অর্জনের জন্যে ক্রোদ প্রকাশ করেছেন তা কেমন হবে বলতে পারেননি। কিন্তু ইউরোপীয় আদর্শবাদী হতে পারার ব্যর্থতা নাট্যকার হিসাবে তাঁর শক্তির প্রমাণ। অন্যসব মহৎ বিদ্রোহী নাট্যকারের মতো তাঁর ক্ষতাও অর্জিত হয়েছে থেসিস, এন্টি থেসিস-এর দ্বন্দ্বথেকে জানানো সিন্থেসিস। ব্রেখটের নাট্য ভাবনায়ও এই দ্বৈত দ্বৈতাবাদ নাট্য সমালোচকদের কাছে তাঁকে করেছে দ্বিধা বিভক্ত। ঠিক তাঁর উদ্ভাবিত ‘বিচ্ছিন্নতাবাদ’-এর মত তিনিও বিচ্ছিন্ন ও বিভক্ত বিশ্ব-নাট্য মন্ডপে। তবে এটা ঠিক, কোন শক্তিই ব্রেখটের সিগারেটকে নেভাতে পারবে না। আধুনিক নাট্যকলায় তিনি যে অর্জন করেছেন তার দীপ্ত শিখা জ্বলতেই থাকবে।
দ্বৈতদ্বৈতাবাদের এই নাট্য দর্শন ও ভাবনার বিতর্কে জড়ানোর অবকাশ এখানে নেই। প্রকৃতপক্ষে আমার সেই যোগ্যতাও নেই। ব্রেখটীয় রাজনৈতিক দর্শন ও নাট্য ঘরনার তথা তাঁর নাট্য উপস্থাপনা আঙ্গিকের আলোচনায় তাই ইতি টেনে শিরনামে উল্লেখিত বিষয়ে দৃষ্টিপাত করছি।
এ্যারিস্টটলীয় নাট্যতত্ত্বের বিপরীতে স্বকীয় নাট্যচিন্তা নিয়ে বিশ্ব নাট্যাঙ্গনে সর্বাধিক প্রভাব বিস্তারকারী কিংবদন্তী নাট্যতাত্ত্বিক ব্রার্টোল্ড ব্রেখট (ইবৎঃড়ষঃ ইৎববশঃ) জন্মেছিলেন ১০ ফেব্রুয়ারী ১৮৯৮ সালে এবং মৃত্যুবরণ করেন ১৪ আগষ্ট ১৯৫৬ সালে। সেই হিসাবে বিগত ১৯৯৮ সারা বিশ্বে যথাযোগ্য মর্যাদা সহকারে উদযাপিত হয়েছে বর্ষিয়ান নাট্য¯্রষ্টা ব্রেখটের “জন্ম শতবার্ষিকী”। আগামী ১০ ফেব্রুয়ারী ১৯৯৯ তাঁর ১০১ তম জন্মবার্ষিকী। জন্মবার্ষিকীতে তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতেই আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস। নি¤েœ সংগঠন ভিত্তিক প্রাপ্ত তথ্য সমূহ প্রদান করা হয়।
অরিন্দম
চট্টগ্রামে প্রথম ব্রেখটের নাটক মঞ্চে আনার কৃতিত্ব এই নাট্য সংগঠনের। যদিও নাটকটি মূল নাটকের অনুবাদ নয়। মূল ‘সেনেরা কারা রাইলে’ অবলম্বনে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে অমিত চন্দ্র কর্তৃক রূপান্তরীত ‘রাইফেল’ নাটকটি তাঁরই নির্দেশনায় মঞ্চস্থ হয়েছে। সম্প্রতি সি. টিভিও নাটকটি সম্প্রচার করেছে অরিন্দমের প্রযোজনা।
থিয়েটার’ ৭৩
রুদ্র প্রসাদ সেনগুপ্ত অনুদিত ‘ব্যতিক্রম’ কামালউদ্দিন নীলু’র নির্দেশনায় মঞ্চস্থ করেছে কর্মশালা উত্তর প্রযোজনা হিসাবে।
মুক্তধারা
বন্দর রিপাবলিক মিলনায়তনে সংগঠন আয়োজিত নাট্য উৎসবে ঢাকা থিয়েটার মঞ্চস্থ করে ব্রেখট রচিত বাংলায় অনুদিত ‘ধূর্ত উই’ নাটকটি।
প্রদীপ্ত
চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমী মিলনায়তনে আয়োজিত নাট্য উৎসবে নাগরিক ঢাকা পরিবেশনা করে ব্রেখটের ‘দেওয়ান গাজির কিসসা’ নাটকটি।
তির্যক নাট্য গোষ্ঠি
ব্রেখটের ৯২তম জন্ম জয়ন্ত্রী উপলক্ষে ১৯৯০ সালে শিল্পকলা একাডেমী প্রাঙ্গণে তিনদিনব্যাপী দেশের প্রথম ‘ব্রেখট নাট্য উৎসব’ আয়োজন করেছিল। যে উৎসবে ঢাক’র দুটি শীর্ষস্থানীয় দলের ব্রেখট প্রযোজনা সহ দলী প্রযোজনা ‘সমাধান’ মঞ্চস্থ হয়। এ উপলক্ষে সমাধান নাটকের নির্দেশক নাট্য ব্যক্তিত্ব জামিল আহমেদকেও দেওয়া হয় সম্মাননা। আমার দেখা ব্রেখট প্রযোজনাগুলোর মধ্যে ‘সমাধানই ব্রেখটিও আঙ্গিকে উপস্থাপিত চুড়ান্ত সিদ্ধির নাটক।
কথক নাট্য সম্প্রদায়
ব্রেখটের ‘বিচার নাটকটি নিয়মিত প্রযোজনা হিসাবে মঞ্চস্থ করছে বিক্রম চৌধরীর নির্দেশনায়।
কালপুরুষ
ব্রেখটের ছোট গল্প অবলম্বনে নীলকন্ঠ সেনগুপ্ত নাট্যরূপকৃত ‘জুলিয়াস সিজারের শেষ সাত দিন’ মঞ্চস্থ করেছে শান্তুনু বিশ্বাসের নির্দেশনায়।
খেলাঘর
সংগঠনের আমন্ত্রণে স্থানীয় মুসলিম হলে নাগরিক ঢাকা পরিবেশন করে ‘দেওয়ান গাজির কিসসা’ নাটকটি।
শহীদনগর থিয়েটার
শুধুমাত্র মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নাটক মঞ্চায়নে অঙ্গাকারাবদ্ধ দেশের একমাত্র নাট্য সংগঠন ‘শহীদনগর থিয়েটার’ অমিত চন্দ্র কর্তৃক মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রূপন্তরীত ‘রাইঠেল নাটকটি প্রযোজনা করেছে মোস্তফা কামাল যাত্রা’র নির্দেশনায়।
লোজাইওন
ব্রেখটের জন্মশতবর্ষে বিগত ১০ ফেব্রুয়ারী ’৯৮ স্থানীয় শিল্পকলা একাডেমী প্রাঙ্গণে আয়োজন করেছিল আলোচনা সভা ও ব্রেখটের কবিতা পাঠ অনুষ্ঠান দলীয়কর্মী রুবেলের সভাপতিত্বে আয়োজিত ব্রেখট স্মরণ সভায় ‘ব্রেখটের জীবন ও মানস’ শীর্ষক প্রবন্ধ পাঠ করেন নাট্যকর্মী মোস্তফা কামাল যাত্রা এবং আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন অধ্যাপক ম. সাইফুল আলম চৌধুরী, কবি হাফিজ রশিদ খান ও মানস নন্দি।
তির্যক নাট্যদল
উৎপল দত্ত অনুদিত জামিল আহমেদ ও আহমেদ ইকবাল হায়দার নির্দেশিত ব্রেখটের নাট্য ‘সমাধান’ দলীয় প্রযোজনা হিসাবে শততম প্রদর্শনী করেছে ১৬ মে’ ৯৩ স্থানীয় মুসলিম হলে। যা চট্টগ্রামের কোন নাটকের প্রথম শততম মঞ্চায়নও বটে। ব্রেখটের নাটকের শততম মঞ্চায়নের মাধ্যমে চট্টগ্রামে কোন নাটকের শততম মঞ্চায়ন ব্রেখট নাট্যপ্রেমীদের জন্য বড় পাওয়া। ‘সমাধান’-এর শততম প্রদর্শনী’র পূর্বে ব্রেখটের নাট্য ধারারও উপস্থাপন প্রক্রিয়া নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেছিলেন নাট্য শিক্ষক অধ্যাপক জিয়া হায়দার। ব্রেখটের ৯২ তম জন্ম জয়ন্তীতে ৮ থেকে ১০ ফেব্রুয়ারী’ ৯০ চট্টগ্রামে তির্যক আয়োজন করেছিল ‘ব্রেখট নাট্য উৎস’। এই উৎসবে ৮ ফেব্রয়ারী র্যিক পরিবেশন করে ‘সমাধান’ ৯ ফেব্রুয়ারী ঢাকা থিয়েটার পরিবেশন করে ‘ধূর্ত উই’; ১০ ফেব্রুয়ারী নাগরিক ঢাকা পরিবেশন করে ‘সৎ মানুষের খোঁজে’ ব্রেখট রচিত নাটকত্রয়। উৎসবের শেষ দিন দেশ বরেণ্য নাট্য নির্দেশক ব্রেখটিয় রীতির সার্থক রূপকার জামিল আহমেদকে সম্মাননাও প্রদান করা হয়েছিল। ব্রেখটের জন্ম শতবার্ষিকীতেও র্যিক স্থানীয় স্টুডিও থিয়েটারে আয়োজন করেছিল দুদিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালা। যাতে আহমেদ ইকবাল হায়দার পরিচালিত ‘ব্রেখটের থিয়েটার ও লোক আঙ্গিক’ শীর্ষক লেকচার ওয়ার্কসপ ছাড়াও দলীয় প্রযোজনা ‘সমাধান’ নাটকের ১২৪টি প্রদর্শনী সম্পন্ন করেছে। ব্রেখটের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনষ্টিটিউট বাংলাদেশ কেন্দ্রের উদ্যোগে ঢাকায় আয়োজিত ব্রেখট উৎসবেও তির্যক ‘সমাধান’ নাটক পরিবেশন করেছে। ব্রেখটের ১০১তম জন্মবার্ষিকীতে আগামী ৯ ও ১০ ফেব্রুয়ারী ’ ৯৯ স্থানীয় স্টুডিও থিয়েটারে তির্যক আয়োজন করেছে ‘সমাধান’ নাটক মঞ্চায়ন ও ব্রেখট সম্মন্ধীয় অনুষ্ঠন মালার। এছাড়া ১২ ফেব্রুয়ারী’ ৯৯ বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের চট্টগ্রাম বিভাগীয় আঞ্চলিক প্রতিনিধি সভা শেষে সন্ধায় স্টুডিও থিয়েটারে তির্যক প্রযোজনা ব্রেখটের ‘সমাধান’ মঞ্চস্থ হবে।
ইউনাইট থিয়েটার
নাট্যচর্চায় নবধারা ‘ইউনাইট থিয়েটার কনসেপ্ট’-এর নাট্যকর্ম সম্পদনের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত “ইউনাইট থিয়েটার” আওতাভূক্ত থিয়েটার ইউনিট ‘আলোড়ন’ ব্রেখটের ১০১তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আগামী ১২ ফেব্রুয়াররী সংগঠনের কার্যালয়ে মোস্তফা কামাল যাত্রা’র গ্রন্থনা ও নির্দেশনায় পরিবেশন করবে ‘ব্রেখট যজ্ঞ’ শীর্ষক অনুষ্ঠান মালা। ‘ব্রেখট যজ্ঞ’ গ্রন্থিত হয়েছে ব্রেখটের গল্প, কবিতা, নাটক, ব্যক্তিগত ডাইরী, বিভিন্ন সাক্ষাৎকার ও ব্রেখট সমালোচকদের সমালোচনার সমন্বয়ে। উল্লেখ্য বিগত ১৯৯৮ সালেও ব্রেখটের শততম জন্ম জয়ন্তিতে অনুরূপ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল।


