নিজস্ব প্রতিবেদক: চট্টগ্রামের সাহিত্য ও সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষের অন্যতম পরিচিত স্থান ডিসি হিলকে আরও নান্দনিক ও আধুনিকভাবে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) বিকেলে চট্টগ্রাম ডিসি হিলের নজরুল স্কয়ারে নজরুল মুক্তমঞ্চের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিনের ব্যবহারে ডিসি হিলের বিভিন্ন স্থাপনা জীর্ণ হয়ে পড়েছে। সেগুলো সংস্কারের পাশাপাশি পুরো এলাকাকে নান্দনিকভাবে সাজানোর কাজ করছে জেলা প্রশাসন।এরই অংশ হিসেবে কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতিবিজড়িত পুরোনো মঞ্চকে নতুন রূপ দেওয়া হচ্ছে।চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের অর্থায়নে প্রায় ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে নজরুল স্কয়ারে এই মুক্তমঞ্চ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জেলা প্রশাসক বলেন, ‘ডিসি হিলকে আরও সুন্দরভাবে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটিকে আধুনিকায়নের লক্ষ্যে নতুনভাবে রূপ দেওয়ার কাজ চলছে।
এরই মধ্যে নজরুল স্কয়ার সম্প্রসারণ ও সৌন্দর্যবর্ধন করা হয়েছে। এবার নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত পুরোনো মঞ্চকে নতুন রূপ দেওয়া হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘কবি নজরুলের সৃষ্টিকে আমরা লালন করতে চাই এবং সেই আঙ্গিকে নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাম্য, মানবিকতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে। বৈষম্যহীন ও মানবিক সমাজ গড়তে নজরুলকে শুধু স্মরণ করলেই হবে না, তাঁর আদর্শ ও মূল্যবোধ ধারণ করতে হবে।’
নজরুলের সঙ্গে ডিসি হিলের ঐতিহাসিক সম্পর্ক তুলে ধরে জেলা প্রশাসক বলেন, ১৯২৬ সালে কাজী নজরুল ইসলাম চট্টগ্রামে এসে ডিসি হিলে অবস্থান করেছিলেন। ১৯২৬ থেকে ২০২৬—নজরুলের সেই অবস্থানের ১০০ বছর পূর্তিতে তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণ এবং নজরুল চর্চার সুযোগ বাড়াতেই মুক্তমঞ্চ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, নজরুল ধর্ম-বর্ণের বিভেদের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের মিলন, সম্প্রীতি ও মানবতার কথা বলেছেন। তিনি যেমন ইসলামী সংগীত রচনা করেছেন, তেমনি শ্যামাসংগীতও লিখেছেন। তাঁর সৃষ্টিতে বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষের সহাবস্থানের বার্তা রয়েছে।
‘নজরুল এমন একজন কবি, যিনি মানবতাকে আরও বিস্তৃত করেছেন। আমাদের নজরুলকে জানতে হবে, আরও বেশি জানতে হবে। তাঁর সাহিত্য মানুষকে অন্যায়, বৈষম্য ও অসাম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে অনুপ্রাণিত করেছে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামেও তাঁর লেখনী মানুষকে প্রেরণা দিয়েছে। বর্তমান সময়েও তাঁর সাম্য ও মানবিকতার দর্শন অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক,’ বলেন জেলা প্রশাসক।
নজরুলের আপসহীনতার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও কবি নিজের বিবেক ও মূল্যবোধের সঙ্গে আপস করেননি। কোনো কিছুর কাছে তাঁর বিবেক পরাজিত হয়নি। পরাজিত বিবেক দিয়ে কোনো কিছু অর্জন করা সম্ভব হলেও সেই অর্জন দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
তরুণ প্রজন্ম প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক বলেন, মেধা ও দক্ষতার পাশাপাশি তরুণদের মানবিক মূল্যবোধ ও বিবেকবোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। নজরুলের জীবন ও সাহিত্য নতুন প্রজন্মকে সেই শিক্ষা দিতে পারে। নজরুল যেভাবে বৈষম্যহীন ও মানবিক সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই চেতনায় তরুণ সমাজকে গড়ে তুলতে হবে।
নজরুল মুক্তমঞ্চ নির্মাণ শেষ হলে সেখানে নজরুলের সাহিত্য, সংগীত ও দর্শন নিয়ে নিয়মিত চর্চার পাশাপাশি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজন করা যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন জেলা প্রশাসক। এতে শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীরা চর্চার সুযোগ পাবেন এবং নতুন প্রজন্মও নজরুল সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হবে বলে তিনি মনে করেন।
অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. শরীফ উদ্দিনের সঞ্চালনায় বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের নির্বাহী কর্মকর্তা খোন্দকার ইখতিয়ার উদ্দিন আরাফাত এবং মুক্তমঞ্চের নকশা ডিজাইনার স্থপতি প্রণব মিত্র।
এ সময় চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের উপপরিচালক (স্থানীয় সরকার) গোলাম মাঈনউদ্দিন হাসান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এলএ) মো. কামরুজ্জামান, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মাহবুবুল হক প্রমুখ।


