বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৬
spot_img

সময়ের কথন :: বাংলায় দালাল : ইতিহাস বিচরণ

ডা. কিউ.এম. অহিদুল আলম: রাজনৈতিক বক্তব্যে ‘দালাল’ শব্দের বহুল ব্যবহার হাল আমলের। কেউ সাম্রাজ্যবাদী কর্পোরেটের দালাল, কেউ ভারত-পাকিস্তানের দালাল। চীন-রাশিয়ার দালালি আপাতত স্তিমিত। ১৯৪৭ সালের পর বাংলাদেশ যখন পাকিস্তানের অংশ তখন পূর্ব অংশের চিফ মিনিস্টার এ.কে. ফজলুল হক কলকাতা সফরে গেলে পুরোনো বন্ধুদের মাঝে আবেগ-আপ্লুত কিছু বক্তব্য রাখেন। সেই থেকেই পাকিস্তানি রাজ- নীতিতে ভারতের দালাল’ শব্দের প্রচলন। অনেককেই এই গালাগাল শুনতে হয়েছে। সত্য-মিথ্যা প্রমাণের অবকাশ ছিলনা। যুৎ মতো কাউকে ‘দালাল’ ডাকলেই কিল্লাফতে। ঐতিহাসিকভাবে বাঙালি জাতির সংগ্রামী ঐতিহ্য যেমন আছে তেমনি বিদেশি শক্তির প্রতি দালালের কখনো অভাব ছিল না এই দেশে। ইখতিয়ার উদ্দিন বকতিয়ার খলজী রাজা লক্ষণ সেনের অন্দরমহলে সোজা কিভাবে। চলে এলেন। তা ইতিহাসে বিশদ উল্লেখ নেই।

পাঠানদের গোয়েন্দা একেবারে লক্ষণ সেনের বাবুর্চিসহ প্রধান গেইট রক্ষককে পর্যন্ত হাত করে ফেলে। বাবুর্চি খাদ্যে নেশা মেশানোর ফলে আর গেইট রক্ষক গেইট খোলা রাখার ফলে পুরো অন্দর মহলেই সেদিন গভীর তন্দ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে সমস্ত লোকজন। ঘোড়ার আওয়াজেও অনেকেরই তন্দ্রা যায়নি। আকবর বাদশার দরবারে বিদেশি বেনিয়াদের সুবিধা পাইয়ে দেবার জন্য কিছু লোক ছিল। এরা সবসময় বিদেশিদের গুণকীর্তন করতেন সম্রাটের কাছে। বিনিময়ে রাজকৃপা জুটে যেত বিদেশিদের। মোগল দরবারের দালালদের সবিস্তার বর্ণনা দিয়েছেন ফরাসি ভ্রমণকারী জর্জ বার্নিয়ের । বার্নিয়েরের বর্ণনা মতে ঘুষ পেলেই এরা রাজকৃপার তদবির করত। দেশ বেচে দেবার কাহিনী আজ নতুন নয়, বহু শতাব্দী প্রাচীন । আমাদের দেশে রাষ্ট্রশত্রু, বিশ্বাসঘাতকতা ও বিদেশির দালাল আর ‘মীরজাফর’ সমার্থক হলেও নবাবী বাংলার ইতিহাসে মীরজাফর থেকেও বড় বড় দালাল ছিলেন। এ সব দালাল প্রকৃত অর্থেই ‘দেশ বিক্রি করে দিয়েছিল। ইংরেজরা পলাশীযুদ্ধের আগে বাংলার সম্পদ এত সহজে লুট করার সুযোগ দেখে নিজেরাই আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিল। শ্রী প্রতিভারঞ্জন মৈত্র মুর্শিদাবাদের ইতিহাস গ্রন্থে ইংরেজদের সাথে ষড়যন্ত্র করে বিপুল বিত্ত বৈভব গড়ে তোলার মধ্যে মীরজাফরকেও ছাড়িয়ে গেছে, যারা তাদের মধ্যে দেবীসিংহ, কান্তবাবু ও নন্দকুমারের নাম উল্লেখ করেছেন। কাশিম বাজার কুঠির পাশে মুদির দোকান করতেন কান্তবাবু। নামও ছিল কান্তমুদি, গভর্নর হেস্টিংস এর সমস্ত অপকর্মের দোসর ছিল এই কান্তবাবু। হেস্টিংসরা কাশী রাজভবন লুট করলে কান্তবাবু এক নৌকা মনিমুক্তা নিয়ে হেস্টিংসের সাথে গঙ্গায় পালিয়ে যায়। নন্দকুমারকে নবাবরা ফৌজদার হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। যখনই নবাবের সৈন্যরা অন্যত্র যেত তখনই নন্দকুমার ক্লাইভকে খবর দিত আক্রমণ করতে। এভাবেই কলকাতা ও চন্দননগর দুর্গ নবাবের হাতছাড়া হয়। ক্লাইভ ও মীরজাফরের মাঝে বৈঠক করে দেওয়ার জন্য নন্দকুমার বিপুল অর্থ গ্রহণ করেন। পলাশীর যুদ্ধের পর ইংরেজরা তাকে ‘মহারাজ’ উপাধি দেয়। কিন্তু ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে গোলমাল হওয়ায় এই হেস্টিংসই অন্য দালাল কান্তবাবু, দেবীসিংহ দ্বারা জাল দলিল তৈরির অভিযোগে মহারাজ নন্দ কুমারকে মিথ্যা মামলায় ইংরেজ জজ দ্বারা ফাঁসিতে ঝোলান। সাধারণ নাগরিকের আর্থিক ক্ষতি সাধন করে নিজের ও ইংরেজদের অর্থ লাভের ক্ষেত্রে অদ্যাবধি বাংলার ইতিহাসে নন্দকুমারের জুড়ি নেই। কম দামে জিনিস কিনে ভারতের অন্য প্রদেশে ও ইউরোপে রফতানি করে নন্দকুমারই ছিয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ সৃষ্টির প্রধান নায়ক। এদেশে দালালির সবচেয়ে ন্যাক্কারজনক ঘটনা হচ্ছে নন্দকুমারের রায় ঘোষণার আগেই হেস্টিংস এর দালাল বন্ধু নবকৃষ্ণ, হুজুরমল, রামলোচন কান্তবাবু প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তিগণ ইংরেজ বিচারপতিকে নন্দকুমারের বিচারের জন্য অভিনন্দন জানায়। যে হেস্টিংস বাংলায় এত হত্যা, লুণ্ঠন করল তার দেশ ইংল্যান্ডে যখন তাকে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয় তখন এদেশের দালালির ইতিহাসে সবচেয়ে ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটে, হেস্টিংসকে মুক্তি দেয়ার আবেদন করেন বাংলার কিছু দালাল। তারা হেস্টিংসের মহানুভবতা ও দানশীলতার কথা বৃটিশরাজকে অবহিত করেন। এই আবেদনপত্রে নন্দকুমার এর (যাকে অন্যায়ভাবে ফাঁসি দেয় হেস্টিংস)-দৌহিত্র রাজা মহানন্দ প্রথম স্বাক্ষর করেন। মহারানী ভবানী থেকে শুরু করে কাশী, নবদ্বীপের বেশকিছু পণ্ডিত ও পূজারী ও হেস্টিংসের মুক্তির আবেদনে স্বাক্ষর করেন (সূত্রঃ প্রতিভারঞ্জন)। শ্রী রতন লাহিড়ী ও পূর্ণেন্দু পত্রী পলাশীপরবর্তী সময়ে ক্লাইভ-হেস্টিংসচক্র ও তাদের দেশীয় দালালদের অর্থ ভাগাভাগির বিশদ বিবরণ দিয়েছেন। ওয়ারেন হেস্টিস এদেশে এসে মাসিক পনের টাকা বেতনের চাকরি শুরু করেন। ১৭৮৫ সালে বাংলা ত্যাগ করার সময় হেস্টিংসের বিক্রিলব্ধ অর্থ আসে ৬৩ বিঘার ধান, ৪৬ বিঘার অট্টালিকা, ১৯০ বিঘা জমি এবং বহু আসবাবপত্র থেকে। মুদির দোকানি কান্তবাবু হয় মহারাজ কান্তবাবু। বিদেশি স্বার্থে দেশের বিরুদ্ধে কাজ করছে অগণিত বাঙালি । রাজনীতিবিদ থেকে আমলা, পেশাজীবী ও নাগরিক অনেকে কখনো কয়লা নিয়ে, কখনো গ্যাস নিয়ে, কখনো রেল নিয়ে বিদেশিদের স্বার্থ রক্ষায় সিদ্ধহস্ত। হেস্টিংস- কান্তবাবুদের প্রেতাত্মা এদেশকে এখনো লুটেপুটে খাচ্ছে, ছিয়াত্তরের দুর্ভিক্ষে এক তৃতীয়াংশ জনসংখ্যার মারা যায়।
ক্লাইভ চম্পট দেয় ৩২ জাহাজ সম্পদ নিয়ে। এখনো কখনো বিদ্যুৎ কখনো গ্যাসের আহাজারি। কিন্তু বহু ক্লাইভ ও তাদের দোসররা দিব্যি সম্পদ পাচার করছে উত্তর আমেরিকাসহ বহু সাদা মানুষের দেশে। হেস্টিংস, ক্লাইভ সবার কখনো রাষ্ট্রীয় বিচার কখনো অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়ে পাপের প্রায়শ্চিত্ত হয়ে ছিল। যারা গ্যাস রফতানি, কয়লা রফতানির প্রবক্তা হয়ে আজকে দেশের চরম সংকট সৃষ্টি করেছে তাদের রাষ্ট্রীয় বিচার না হলেও পলাশীপরবর্তী সকল পান্ডাদের অস্বাভাবিক মৃত্যুর মত ঘটনা হয়তো অনাগত ইতিহাসে লিখা হবে। পাপ কি বাপকেও ছাড়ে? প্রকৃতির শাস্তি অবধারিত।
ডা. কিউ.এম অহিদুল আলম বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, কলামিস্ট ।

 

 

সর্বশেষ

পাঠ্যপুস্তক

রতন চন্দ্র পাল, অতিথি লেখক: মানব সভ্যতার শ্রেষ্ঠ প্রকাশ...

ইজারাদারদের দাবি, সাতকানিয়া দেওয়ানহাট বাজার পরিচালনায় সুশাসন নিশ্চিতকরণের

অনলাইন ডেস্ক: সাতকানিয়ার দেওয়ানহাট বাজার পরিচালনায় সুশাসন নিশ্চিতকরণের দাবী...

সাতকানিয়ার কেরানীহাটে আশ্-শেফা স্কুল এন্ড কলেজে নাতে রাসুল (সাঃ) প্রতিযোগিতা সম্পন্ন

এস এম আনোয়ার হোসেন, দক্ষিণ চট্টগ্রাম: পবিত্র রবিউল আউয়াল...

যুক্তরাষ্ট্র আ.লীগের কৃষি বিষয়ক সম্পাদক নিযুক্ত সঞ্জয় কুমার সাহা

পূর্বকাল ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের কৃষি বিষয়ক সম্পাদক...

আ.লীগের কেন্দ্রীয় তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক উপকমিটির সদস্য হলেন বিধান রক্ষিত

নিজস্ব প্রতিবেদক: আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক...
spot_img