মোহাম্মদ হাসান : একটি রাষ্ট্রের শক্তি কেবল তার অর্থনীতি, অবকাঠামো কিংবা সামরিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না; বরং রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে সামাজিক স্থিতিশীলতা, মানুষের পারস্পরিক আস্থা, ন্যায়বিচার এবং নাগরিক নিরাপত্তার মধ্যে। সমাজে যখন অবিশ্বাস, অসহিষ্ণুতা, বৈষম্য, হতাশা ও সংঘাত ক্রমাগত বাড়তে থাকে, তখন তাকে আর বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ থাকে না। এটি হয়ে ওঠে গভীর সামাজিক সংকটের বহিঃপ্রকাশ। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় সামাজিক অস্থিরতা এখন এমন এক উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা রাষ্ট্র, রাজনীতি ও নাগরিক সমাজ—সবার জন্য নতুন করে ভাবনার দাবি রাখে।
সামাজিক অস্থিরতা কোনো একক কারণে সৃষ্টি হয় না। এর পেছনে থাকে রাজনৈতিক বিরোধ, অর্থনৈতিক বৈষম্য, বেকারত্ব, বিচারহীনতা, শিক্ষার দুর্বলতা, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের অভাব। এসব সংকট যখন একসঙ্গে বিস্তার লাভ করে, তখন সমাজের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়। মানুষের মধ্যে তৈরি হয় ক্ষোভ, হতাশা ও নিরাপত্তাহীনতা। এর পরিণতিতে ছোটখাটো বিরোধও অনেক সময় সংঘাত, সহিংসতা কিংবা অপরাধে রূপ নেয়।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর রাষ্ট্র ও সমাজের সামনে নতুন সম্ভাবনার পাশাপাশি নানা চ্যালেঞ্জও তৈরি হয়েছে। পরিবর্তনের প্রত্যাশা ছিল—আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে, বৈষম্য কমবে, নাগরিক অধিকার সুরক্ষিত হবে এবং মানুষ নিরাপদে জীবনযাপন করতে পারবে। কিন্তু রাজনৈতিক বিভাজন, প্রতিহিংসার অভিযোগ, সামাজিক অসহিষ্ণুতা এবং বিভিন্ন পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা নিয়ে উদ্বেগ সেই প্রত্যাশাকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য গণতন্ত্রের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য; কিন্তু মতের অমিল যখন প্রতিপক্ষকে শত্রুতে পরিণত করে, তখন গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি দুর্বল হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো—দল, মত, ধর্ম ও পরিচয় নির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিকের নিরাপত্তা ও আইনি অধিকার নিশ্চিত করা।
অর্থনৈতিক চাপ সামাজিক অস্থিরতার আরেকটি বড় চালিকাশক্তি। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্য, সীমিত আয়, কর্মসংস্থানের সংকট এবং জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় সাধারণ মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। একদিকে সমাজের একটি অংশের হাতে বিপুল সম্পদ কেন্দ্রীভূত হচ্ছে, অন্যদিকে বিপুলসংখ্যক মানুষ ন্যূনতম চাহিদা পূরণ করতেই হিমশিম খাচ্ছে। এই বৈষম্য কেবল অর্থনৈতিক নয়; এটি মানুষের মধ্যে বঞ্চনা ও ক্ষোভের অনুভূতিও বাড়ায়। বিশেষ করে শিক্ষিত বেকার তরুণদের মধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়তে থাকলে তার সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাবও অনিবার্য হয়ে ওঠে।
তরুণ সমাজ একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা। অথচ কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগ, দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার অভাব এবং যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ না পাওয়ার হতাশা অনেক তরুণকে বিপথে ঠেলে দিতে পারে। কেউ অপরাধে জড়িয়ে পড়ে, কেউ মাদকাসক্ত হয়, আবার কেউ উগ্রবাদী চিন্তা কিংবা অসহিষ্ণুতার শিকার হয়। শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বাড়িয়ে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। তরুণদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ এবং সম্মানজনক কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হবে।
সামাজিক অস্থিরতার আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাহীনতা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদ্বেষ ছড়ানোর প্রবণতা। নারী নির্যাতন, শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, পারিবারিক সহিংসতা কিংবা গণপিটুনির মতো ঘটনা কোনো সভ্য সমাজের স্বাভাবিক চিত্র হতে পারে না। একইভাবে গুজব, অপপ্রচার ও উসকানিমূলক বক্তব্যের মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে সামাজিকভাবে হেয় করা কিংবা সহিংসতার মুখে ঠেলে দেওয়াও ভয়ংকর প্রবণতা। এসব ক্ষেত্রে অপরাধীর পরিচয় নয়, অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
এখানে বিচারব্যবস্থা ও আইনের শাসনের প্রশ্নটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অপরাধের বিচার না হলে অপরাধীর সাহস বাড়ে, আর নিরপরাধ ব্যক্তি হয়রানির শিকার হলে রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যায়। রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা প্রভাবশালীদের ক্ষমতা যেন আইনের প্রয়োগে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। আইন সবার জন্য সমান—এই বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া সামাজিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।
তবে সব দায় রাষ্ট্রের ওপর চাপিয়ে নাগরিক সমাজ ও পরিবারের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ারও সুযোগ নেই। পরিবারই মানুষের প্রথম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। শিশুর মধ্যে সহনশীলতা, মানবিকতা, নৈতিকতা ও অন্যের মতের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ গড়ে তোলার দায়িত্ব পরিবারের। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে শুধু সনদ দেওয়ার কেন্দ্র না বানিয়ে মানবিক ও দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরির জায়গা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। গণমাধ্যমের দায়িত্বও গুরুত্বপূর্ণ—সংবাদ পরিবেশনে দায়িত্বশীলতা, বস্তুনিষ্ঠতা ও সত্যনিষ্ঠা বজায় রাখতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাই ছাড়া কোনো তথ্য ছড়িয়ে না দেওয়ার নাগরিক সচেতনতাও জরুরি।
সামাজিক অস্থিরতা নিরসনে প্রথম প্রয়োজন রাজনৈতিক সহনশীলতা ও কার্যকর সংলাপ। দ্বিতীয়ত, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আয়বৈষম্য কমানো এবং শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ এবং নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষা, সংস্কৃতি, ক্রীড়া ও সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে তরুণদের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করতে হবে।
সবশেষে মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্র কেবল প্রশাসনিক নির্দেশে স্থিতিশীল হয় না; স্থিতিশীলতা আসে মানুষের আস্থা, ন্যায়বিচার ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ থেকে। রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন হলেই সমাজের সব সংকটের অবসান ঘটে না। প্রকৃত পরিবর্তন তখনই দৃশ্যমান হয়, যখন একজন সাধারণ মানুষ নিরাপদে চলাফেরা করতে পারেন, একজন শ্রমিক ন্যায্য মজুরি পান, একজন তরুণ যোগ্যতা অনুযায়ী কাজের সুযোগ পান এবং একজন নাগরিক রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে সমান অধিকার ভোগ করেন।
বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক পুনর্গঠন নয়; বরং সামাজিক আস্থা পুনরুদ্ধার। বিভাজন নয়, ঐক্য; প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচার; বৈষম্য নয়, সমান সুযোগ—এই নীতিগুলোকে রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনার ভিত্তি করতে হবে। অন্যথায় সামাজিক অস্থিরতা একসময় রাষ্ট্রের সামগ্রিক অগ্রযাত্রাকেই বাধাগ্রস্ত করবে। তাই এখনই সময় সমস্যার উপসর্গ নয়, শিকড় চিহ্নিত করে সমাধানের পথে এগিয়ে যাওয়ার।লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট


