পায়েল বিশ্বাস : মুখে নতুনদের নিয়ে কত স্বপ্ন, কত বড় বড় কথা! থিয়েটারের ভবিষ্যৎ নাকি তরুণদের হাতে, নতুনদের এগিয়ে আসতে হবে, থিয়েটার বাঁচাতে হবে! অথচ বাস্তবে নতুন কেউ একটু ভালো করলে, নিজের মতো করে ভাবতে শিখলে কিংবা নিজের একটা পরিচিতি তৈরি করতে চাইলে—কিছু মানুষের ভেতরেই কেমন যেন অস্বস্তি শুরু হয়ে যায়। তখন আর প্রতিভার কদর থাকে না, শুরু হয় কে কার চেয়ে ছোট, কে কার কথা শুনবে, কে কাকে কতটা মান্য করবে—সেই অদৃশ্য প্রতিযোগিতা!

সমস্যাটা কি সত্যিই নতুন প্রজন্মের অনাগ্রহ, নাকি নতুনদের জায়গা করে দিতে না পারার মানসিকতা?
চট্টগ্রামের থিয়েটার চর্চায় যারা নিজেদের অভিজ্ঞ, সিনিয়র কিংবা অভিভাবক ভাবেন, তাঁদের সবার কথা বলছি না। কিন্তু কিছু মানুষের আচরণ দেখে মনে হয়, তাঁরা চান নতুনরা কাজ করুক, সময় দিক, শ্রম দিক, প্রয়োজনে নিজের পকেটের টাকাও খরচ করুক—কিন্তু দিনশেষে স্বীকৃতি, পরিচিতি আর কর্তৃত্বের জায়গাটা যেন তাঁদের হাতেই থাকে!
নতুনরা ভুল করলে সেটা অপরাধ, আর সিনিয়ররা ভুল করলে সেটা অভিজ্ঞতা! নতুনরা প্রশ্ন করলে বেয়াদবি, আর সিনিয়ররা অপমান করলে সেটা শাসন! নতুনরা নিজের মতামত দিলে সেটা অহংকার, অথচ নিজেরাই যখন অন্যের মতামতকে পাত্তা দেন না, তখন সেটার নাম হয় নেতৃত্ব! বাহ, কী সুন্দর নিয়ম!

থিয়েটার তো কাউকে নিজের ইগোর কাছে জিম্মি রাখার জায়গা নয়। একজন সিনিয়র হওয়ার অর্থ এই নয় যে, আপনার চেয়ে ভালো কেউ উঠে আসতে পারবে না। বরং আপনার প্রকৃত সার্থকতা তো সেখানেই—আপনার হাত ধরে এমন কেউ তৈরি হবে, যে একদিন আপনার চেয়েও ভালো কাজ করবে, আপনার চেয়েও দূর যাবে। তাতে আপনার সম্মান কমবে না, বরং বাড়বে।

কিন্তু সমস্যা হলো, কিছু মানুষ উত্তরসূরি তৈরি করতে চান না; তাঁরা চান অনুসারী। তাঁরা চান এমন কিছু তরুণ, যারা প্রশ্ন না করে নির্দেশ মানবে, প্রশংসা করবে, পরিশ্রম করবে; অথচ নিজের জায়গা তৈরি করার সময় এলে চুপচাপ পেছনে সরে থাকবে!এভাবে একটা শিল্পমাধ্যম এগোয় না, এগোয় কেবল কিছু ব্যক্তির ব্যক্তিগত বলয়।

আর একটা কথা—নতুনদের সময়, শ্রম, মেধা আর স্বপ্নেরও মূল্য আছে। তাঁরা বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করছেন বলে তাঁদের শ্রমের মূল্য শূন্য হয়ে যায় না। তাঁদের পরিবার আছে, পড়াশোনা আছে, ক্যারিয়ার আছে, নিজের জীবন গড়ার তাগিদ আছে। থিয়েটারের নামে তাঁদের কাছ থেকে সবটুকু নিয়ে নেওয়াটাই যদি আপনার সংস্কৃতিচর্চা হয়, তাহলে সেই সংস্কৃতির চর্চা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।

চট্টগ্রামের থিয়েটারকে ভালোবাসলে শুধু মঞ্চে দাঁড়িয়ে বড় বড় কথা বললেই হবে না; মঞ্চের বাইরেও উদারতা, পারস্পরিক সম্মান আর নতুনদের জায়গা করে দেওয়ার মানসিকতা দেখাতে হবে।মনে রাখবেন, একটা মঞ্চে আলো জ্বললেই শিল্পের বিকাশ হয় না। শিল্পের বিকাশ হয় তখন, যখন সেই আলোয় নতুন মুখও সমানভাবে দৃশ্যমান হওয়ার সুযোগ পায়।

তাই নতুন প্রজন্ম থিয়েটারে আসছে না বলে হাহাকার করার আগে নিজেদের দিকে একবার তাকান। ভাবুন, আপনাদের আচরণে কতজন আগ্রহ হারিয়েছে, কতজন অভিমান নিয়ে সরে গেছে, আর কতজন সম্ভাবনাময় মানুষ নিজের স্বপ্নটাকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়েছে।
সব তরুণের অনাগ্রহের দায় সিনিয়রদের নয়, ঠিক। কিন্তু নিজেদের ইগো, দলাদলি, কর্তৃত্বপরায়ণতা আর নতুনদের প্রতি অবজ্ঞার দায়টুকুও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
চট্টগ্রামের থিয়েটারের সবচেয়ে বড় সংকট যদি প্রতিভার অভাব না হয়ে প্রতিভাকে জায়গা দিতে না পারার সংকট হয়, তাহলে শুধু নতুনদের ডাকাডাকি করে লাভ কী? আগে নিজেদের মানসিকতার দরজাটা খুলুন।

কারণ থিয়েটার কোনো ব্যক্তির সম্পত্তি নয়, কোনো গোষ্ঠীর একচ্ছত্র রাজত্বও নয়। থিয়েটার একটা সম্মিলিত শিল্পচর্চা। এখানে কেউ চিরকাল কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে না। আজ যে নতুন, কাল সে-ই নেতৃত্ব দেবে।

সুতরাং, নতুনদের দিয়ে নিজের নাম উজ্জ্বল করার আগে তাঁদের নিজেদের নামে পরিচিত হওয়ার সুযোগ দিন। তাঁদের অনুসারী নয়, সহশিল্পী ভাবুন। প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, সম্ভাবনা হিসেবে দেখুন।

নইলে একদিন মঞ্চ থাকবে, দল থাকবে, সিনিয়রদের স্মৃতিচারণও থাকবে—শুধু নতুনরা থাকবে না। আর তখন দায়টা শুধু সময়ের ঘাড়ে চাপিয়ে দিলে সত্যিটা বদলাবে না!

কথাটা হয়তো অনেকের গায়ে লাগবে, তবু বলি।
চট্টগ্রামের থিয়েটার থেকেই তো অনেকের পথচলা শুরু। এই মঞ্চ, এই দল, এই থিয়েটারের মানুষগুলোর হাত ধরেই একসময় নিজেদের তৈরি করেছেন অনেকে। আজ তাঁদের কেউ সিনেমায়, কেউ ওয়েব ফিল্মে, কেউ টেলিভিশনে—নিজেদের জায়গা করে নিয়েছেন। তাঁদের সাফল্যে আমরা গর্ব করি, তাঁদের কাজ দেখি, তাঁদের নিয়ে আলোচনা করি। কিন্তু একটা প্রশ্ন মাঝেমধ্যে খুব পোড়ায়—যে থিয়েটার একদিন তাঁদের পরিচয় তৈরি করতে সাহায্য করেছিল, সেই থিয়েটারের দুঃসময়ে তাঁদের কণ্ঠস্বর কোথায়?

দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী এলে আবেগ উথলে ওঠে। পুরোনো দিনের স্মৃতি, মঞ্চের বিখ্যাত ডায়লগ, সেই চরিত্র, সেই মানুষগুলো—সব ফিরে আসে। কেউ বলেন, ‘আমার সেকেন্ড বউ’, কেউ *‘অমুক*স্মৃতি টেনে আনেন। পোস্টে পোস্টে নস্টালজিয়া, ভালোবাসা, গর্ব! এসব দেখতে ভালোই লাগে। কিন্তু সত্যি বলতে কী, শুধু পুরোনো ডায়লগ আওড়ে শিকড়ের প্রতি দায়বদ্ধতা প্রমাণ করা যায়?

যে মঞ্চে দাঁড়িয়ে একদিন স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই মঞ্চের বর্তমান নিয়ে কথা বলেন কজন? যে থিয়েটার আজও অর্থসংকট, দর্শকস্বল্পতা, সুযোগের অভাব আর নানা সীমাবদ্ধতার সঙ্গে লড়ছে, সেই থিয়েটারের পাশে দাঁড়ানোর কথা বলেন কজন? নতুনরা কেন আগ্রহ হারাচ্ছে, কেন অনেকে মাঝপথে থেমে যাচ্ছে, কেন একটা ভালো প্রযোজনা নিয়েও বৃহত্তর পরিসরে আলোচনা তৈরি হচ্ছে না—এসব নিয়ে আপনাদের কোনো কথা নেই কেন?

আপনারা তো জানেন, থিয়েটার করতে কতটা শ্রম লাগে। জানেন, একটা প্রযোজনা দাঁড় করাতে কত রাতের ঘুম হারাম হয়, কত ব্যক্তিগত সময় বিসর্জন দিতে হয়। জানেন, অনেক তরুণ নিজের পকেটের টাকা খরচ করে, নিজের জীবনের ব্যস্ততা সামলে শুধু ভালোবাসার টানে থিয়েটার করে যাচ্ছে। তাহলে তাঁদের এই লড়াই নিয়ে কথা বলতে এত দ্বিধা কেন?

আমি বলছি না, সবাইকে এসে দলের দায়িত্ব নিতে হবে। সবাইকে নিয়মিত নাটক করতে হবে। এমনকি প্রত্যেকটা বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতেই হবে, সেটাও না। কিন্তু যাঁদের একটা কথা বলার ক্ষমতা আছে, যাঁদের কথা মানুষ শোনে, যাঁদের পরিচিতির পেছনে এই থিয়েটারেরও একটা অবদান আছে—তাঁরা অন্তত মাঝেমধ্যে এই জায়গাটার বাস্তব সমস্যাগুলো নিয়ে কথা বলতে পারেন না?

একটা পোস্ট, একটা সাক্ষাৎকার, একটা প্রকাশ্য আলোচনা—এতটুকুও কি অসম্ভব? আপনাদের একটা বক্তব্য হয়তো নতুনদের সাহস দিতে পারে, দর্শকদের আগ্রহী করতে পারে, সংশ্লিষ্ট মানুষদের ভাবাতে পারে। অথচ আমরা অনেক সময় দেখি, স্মৃতিচারণের বেলায় আবেগের কোনো কমতি নেই, কিন্তু বর্তমানের সংকট নিয়ে কথা বলার বেলায় অদ্ভুত নীরবতা! তাহলে কি থিয়েটার শুধু নিজের অতীতকে সুন্দর করে মনে করার জায়গা? বর্তমানের দায় নেওয়ার জায়গা নয়?

সবচেয়ে কষ্টের ব্যাপার হলো, একটা সময় যে জায়গাটাকে নিজের পরিচয়ের অংশ বলে গর্ব করা হয়, সেই জায়গাটারই মানুষ যখন প্রতিদিন নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যায়, তখন তাদের লড়াইটা আলোচনার বাইরে থেকে যায়। অথচ পুরোনো দিনের গল্পগুলো দিব্যি সামনে আসে, বাহবা পায়, ভালোবাসা পায়!

শিকড়ের কথা বলা খুব সহজ। শিকড়ের সঙ্গে ছবি তোলা সহজ। পুরোনো ডায়লগ বলে দর্শককে নস্টালজিক করাও সহজ। কিন্তু শিকড়টা যখন দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন তার পাশে দাঁড়ানোই আসল পরীক্ষা।

আর একটা কথা—আজ যাঁরা প্রতিষ্ঠিত, তাঁদের সাফল্য অবশ্যই তাঁদের নিজেদের পরিশ্রমের ফল। এখানে কারও অর্জনকে ছোট করার প্রশ্ন নেই। কিন্তু নিজের পথচলার পেছনে যে মানুষগুলো ছিলেন, যে মঞ্চটা ছিল, যে পরিবেশটা ছিল—সেই জায়গার প্রতি ন্যূনতম সংহতি দেখানো কি খুব বেশি চাওয়া?
চট্টগ্রামের থিয়েটার কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এটা অনেক মানুষের ঘাম, শ্রম, স্বপ্ন, অভিমান আর ভালোবাসায় তৈরি। আজও কিছু মানুষ নিজেদের সর্বস্ব দিয়ে সেই চর্চাটা বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। তাঁদের লড়াইটা শুধু প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর শুভেচ্ছাবার্তায় সীমাবদ্ধ থাকার কথা নয়।

আপনাদের পুরোনো ডায়লগ শুনে আমরা আনন্দিত হই, আপনাদের সাফল্যে গর্ব করি। কিন্তু মাঝেমধ্যে বর্তমানের থিয়েটারকর্মীদের হয়ে দুটো কথা বললেও হয়তো আরও বেশি গর্বিত হতাম।কারণ শিকড়ের পরিচয় শুধু মুখে বহন করার বিষয় নয়; কখনো কখনো সেই শিকড়ের দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ানোরও বিষয়।নস্টালজিয়া থাকুক। স্মৃতি থাকুক। ভালোবাসাও থাকুক। শুধু ভালোবাসাটা যেন অতীতের জন্যই বরাদ্দ না থাকে।

যে মঞ্চ একদিন আপনাদের স্বপ্ন দেখিয়েছিল, সেই মঞ্চের আজকের স্বপ্নগুলোও একটু দেখুন। সেখানে এখনও অনেক তরুণ দাঁড়িয়ে আছে—কেউ সুযোগের অপেক্ষায়, কেউ স্বীকৃতির, কেউ শুধু একটু সহযোগিতার আশায়। তাদের লড়াইটা অন্তত একেবারে একা হয়ে থাকতে দেবেন না। সো সিনিয়ররা রাগ করলেন!!! ভুলে যাইয়েন না এই থিয়েটারই আপনাদের সেলিব্রিটি বানাইছে।


