শনিবার, অক্টোবর ৩১, ২০২৬
spot_img

ভূরাজনীতির নতুন কেন্দ্র বাংলাদেশ: সম্ভাবনার দুয়ার, নাকি পরাশক্তির দাবার বোর্ড?

মোহাম্মদ হাসান: ভৌগোলিক অবস্থান একটি দেশের জন্য আশীর্বাদ হতে পারে, আবার দূরদর্শী রাষ্ট্রনীতি ও কৌশলগত প্রজ্ঞার অভাবে তা বড় ধরনের ঝুঁকির কারণও হয়ে উঠতে পারে। দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত বাংলাদেশ আজ এমন এক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ পাশাপাশি অবস্থান করছে। বঙ্গোপসাগর, ভারত মহাসাগর, চীনের অর্থনৈতিক বিস্তার, ভারতের নিরাপত্তা-স্বার্থ এবং যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। প্রশ্ন হলো, এই গুরুত্বকে বাংলাদেশ জাতীয় সমৃদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগাতে পারবে, নাকি পরাশক্তির প্রতিযোগিতায় অন্যের স্বার্থ বাস্তবায়নের ক্ষেত্র হয়ে উঠবে?
বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক গুরুত্বের কেন্দ্রে রয়েছে বঙ্গোপসাগর। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি পরিবহন ও সামুদ্রিক নিরাপত্তার জন্য এ অঞ্চল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্প এবং আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থা বাংলাদেশকে বাণিজ্যিক ও কৌশলগতভাবে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। চীন এ অঞ্চলে বাণিজ্য ও যোগাযোগ সম্প্রসারণে আগ্রহী। ভারত তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ ও নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলে সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও অবাধ নৌ-চলাচল গুরুত্বপূর্ণ, আর জাপান অবকাঠামো, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব জোরদার করতে চায়।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের সামনে যেমন নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তেমনি কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার কঠিন পরীক্ষাও উপস্থিত হয়েছে।
সম্প্রতি চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশকে ঘিরে প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক করিডোর নিয়ে আলোচনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। ২০ অক্টোবর ২০২৬ দৈনিক নয়া দিগন্তে প্রকাশিত ড. মোহাম্মদ আবদুর রবের ‘প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক করিডোর ভূরাজনীতির নতুন সমীকরণ’ শীর্ষক নিবন্ধে এ উদ্যোগের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত তাৎপর্য তুলে ধরা হয়েছে। এ ধরনের করিডোর বাস্তবায়িত হলে আঞ্চলিক বাণিজ্য, পণ্য পরিবহন, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারে প্রবেশ, সীমান্তবর্তী অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক সরবরাহব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগও তৈরি হতে পারে বাংলাদেশের।
তবে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বিবেচনার সময় ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি উপেক্ষা করা যাবে না। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত, রাখাইন অঞ্চলে জান্তা সরকার ও আরাকান আর্মির লড়াই, সীমান্তের নিয়ন্ত্রণ পরিস্থিতি এবং রোহিঙ্গা সংকট এ ধরনের উদ্যোগের বাস্তবায়নকে জটিল করে তুলতে পারে। সীমান্তে গোলাগুলি, অনুপ্রবেশ, মাদক ও অস্ত্র পাচার এবং নতুন করে বাস্তুচ্যুত মানুষের প্রবেশের আশঙ্কা বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক। তাই যেকোনো আঞ্চলিক অর্থনৈতিক উদ্যোগে জাতীয় নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক বাস্তুচ্যুত মানুষকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ মানবিক দায়িত্ব পালন করছে। কিন্তু প্রত্যাবাসনে কার্যকর অগ্রগতি না থাকায় কক্সবাজার ও আশপাশের অঞ্চলের পরিবেশ, অর্থনীতি, সামাজিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার ওপর চাপ বাড়ছে। এ সংকটের স্থায়ী সমাধানে মিয়ানমারের সঙ্গে যোগাযোগের পাশাপাশি চীন, ভারত, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘকে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। বাংলাদেশের কূটনীতি হতে হবে সক্রিয়, সমন্বিত ও ফলাফলমুখী।
বৈশ্বিক অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও কাঁচামালের প্রতিযোগিতাও বাংলাদেশের জন্য আলোচনার একটি ক্ষেত্র। বৈদ্যুতিক গাড়ি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সেমিকন্ডাক্টর ও প্রতিরক্ষা শিল্পে ব্যবহৃত বিভিন্ন খনিজ এখন কৌশলগত সম্পদে পরিণত হয়েছে। এসব সম্পদের সরবরাহব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা তীব্র হচ্ছে। তবে বাংলাদেশের ভূখণ্ড বা সমুদ্রসীমায় এ ধরনের সম্পদের সম্ভাবনা নিয়ে অনুমাননির্ভর সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক জরিপ, নির্ভরযোগ্য তথ্য, পরিবেশগত মূল্যায়ন ও স্বচ্ছ নীতিমালা।
২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ দৈনিক আমার দেশ-এ প্রকাশিত ড. মাহরুফ চৌধুরীর ‘ভূরাজনীতির কেন্দ্রে বাংলাদেশ’ নিবন্ধেও বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্বের বিভিন্ন দিক আলোচিত হয়েছে। অন্যদিকে, জাপানে তারেক রহমানের সফর নিয়ে ২৭ অক্টোবর ২০২৬ দৈনিক প্রথম আলোয় প্রকাশিত সাইমন মোহসিনের নিবন্ধ আঞ্চলিক কূটনীতির বৃহত্তর প্রেক্ষাপট সামনে এনেছে। এসব আলোচনার মধ্য দিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট—বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি শুধু চীন-ভারত সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গেও অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার করতে হবে।
এখানেই বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রজ্ঞার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য হওয়া উচিত কোনো একটি শক্তির ওপর অতিনির্ভরশীলতা তৈরি না করে সবার সঙ্গে মর্যাদাপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা। চীনের বিনিয়োগ, ভারতের সঙ্গে ভৌগোলিক ও নিরাপত্তাগত সম্পর্ক, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজার ও প্রযুক্তি এবং জাপানের উন্নয়ন সহযোগিতা—সবই বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে কোনো সম্পর্কই যেন দেশের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে সংকুচিত না করে।
এ জন্য প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক ও বহুমাত্রিক কূটনীতি। বড় প্রকল্প গ্রহণের আগে অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা, ঋণের শর্ত, পরিবেশগত প্রভাব, স্থানীয় জনগণের স্বার্থ ও দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায় যাচাই করতে হবে। বন্দর, করিডোর কিংবা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার ক্ষেত্রে শুধু বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ নয়, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি স্থানান্তর, রপ্তানি সক্ষমতা ও স্থানীয় শিল্পের বিকাশকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। উন্নয়নের নামে এমন কোনো চুক্তি করা উচিত নয়, যার দায় বহন করবে দেশের মানুষ, অথচ সুফল তাদের কাছে পৌঁছাবে না।
একই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা জোরদার করাও জরুরি। দুর্বল প্রতিষ্ঠান, দুর্নীতি, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, নীতির ধারাবাহিকতার অভাব ও জবাবদিহির ঘাটতি থাকলে দীর্ঘমেয়াদে কৌশলগত অংশীদারদের আস্থা অর্জন কঠিন হয়ে পড়ে। ভূরাজনৈতিক গুরুত্বকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপ দিতে হলে সুশাসন, আইনের শাসন, কার্যকর গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও দক্ষ প্রশাসন নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশের সামনে এখন সম্ভাবনা ও ঝুঁকি—দুটিই রয়েছে। দূরদর্শী কূটনীতি, বিচক্ষণ বিনিয়োগনীতি ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে দৃঢ় অবস্থান থাকলে ভৌগোলিক অবস্থান দেশের সমৃদ্ধির হাতিয়ার হতে পারে। অন্যথায়, পরাশক্তির প্রতিযোগিতা নতুন চাপ, নির্ভরশীলতা ও নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশ কারও প্রতিপক্ষ হওয়ার প্রয়োজন নেই; আবার কারও কৌশলগত স্বার্থ বাস্তবায়নের হাতিয়ার হওয়ারও সুযোগ নেই। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত—সবার সঙ্গে সহযোগিতা, কিন্তু সিদ্ধান্তে স্বাধীনতা; বিনিয়োগ গ্রহণ, কিন্তু সার্বভৌমত্বে আপস নয়; আঞ্চলিক সংযোগ, কিন্তু জাতীয় নিরাপত্তা বিসর্জন নয়।
ভূগোল বাংলাদেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে এসেছে। কিন্তু সেই অবস্থানকে জাতীয় শক্তিতে রূপ দেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। পরাশক্তির দাবার বোর্ডে ঘুঁটি হয়ে নয়, বরং নিজস্ব স্বার্থ, সক্ষমতা ও দূরদর্শী কূটনীতি নিয়ে বাংলাদেশকে এগিয়ে যেতে হবে সমমর্যাদার অংশীদার হিসেবে। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক সাফল্যের মাপকাঠি হবে বিশ্বের কাছে দেশটির গুরুত্ব কতটা বেড়েছে, তা নয়; বরং সেই গুরুত্ব কাজে লাগিয়ে দেশের মানুষের জীবনমান, অর্থনীতি ও নিরাপত্তার কতটা উন্নতি ঘটানো গেছে, সেটিই হবে প্রকৃত সাফল্যের নির্ণায়ক।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

সর্বশেষ

পাঠ্যপুস্তক

রতন চন্দ্র পাল, অতিথি লেখক: মানব সভ্যতার শ্রেষ্ঠ প্রকাশ...

ইজারাদারদের দাবি, সাতকানিয়া দেওয়ানহাট বাজার পরিচালনায় সুশাসন নিশ্চিতকরণের

অনলাইন ডেস্ক: সাতকানিয়ার দেওয়ানহাট বাজার পরিচালনায় সুশাসন নিশ্চিতকরণের দাবী...

সাতকানিয়ার কেরানীহাটে আশ্-শেফা স্কুল এন্ড কলেজে নাতে রাসুল (সাঃ) প্রতিযোগিতা সম্পন্ন

এস এম আনোয়ার হোসেন, দক্ষিণ চট্টগ্রাম: পবিত্র রবিউল আউয়াল...

যুক্তরাষ্ট্র আ.লীগের কৃষি বিষয়ক সম্পাদক নিযুক্ত সঞ্জয় কুমার সাহা

পূর্বকাল ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের কৃষি বিষয়ক সম্পাদক...

আ.লীগের কেন্দ্রীয় তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক উপকমিটির সদস্য হলেন বিধান রক্ষিত

নিজস্ব প্রতিবেদক: আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক...
spot_img