সৈয়দ নাজমুস সাকিব: সবসময়ই দেখবেন দেশে কোনো পরিক্ষার রেজাল্ট প্রকাশ পেলে তখন কিছু ছেলে-মেয়ে থাকে যারা খুব নিম্ন আয়ের পরিবার থেকে উঠে আসা। তাদের অনেকের নাম-ডাক ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। পত্রিকা কিংবা টিভি স্ক্রিনে ক্রল হতে থাকে হেডলাইন আকারে। আপনার বাবা-মা এসব দেখে খুবই হা-হুতাশ করতে থাকবে। “আহা! কোনো কিছুতো কমতি রাখলাম না আমার ছেলের জন্যে, একজনও তো এতো চেষ্টায় এমন কিছু করতে পারলো না। এরা না পেয়েছে খাবার, না পেয়েছে মোমবাতি, বই-খাতা, এদের ছেলেমেয়েরাই আসলে মানুষ হলো।”আপনাদের দেখে মনে হতে পারে, আপনার বাবা-মা আপনাকে অন্যের সাথে কম্পেয়ার করছে, বা আপনাকে নিয়ে অসন্তোষের শেষ নেই। আসলে বিষয়টা এমন না। আপনার বাবা-মা উনাদের নিজেদেরকে নিয়ে হতাশ হয়েছেন। কারন মানুষের জীবনের এক একটা ধাপে এসে সফলতার সংজ্ঞা বার বার পাল্টে যায়। যেমন ধরেন ছোটবেলায় আপনি খেলাধুলায় ভালো করবেন, হাতের লেখা সুন্দর করবেন, ঠিকঠাক খাওয়া-দাওয়া করবেন, সময়মত ঘুমাবেন, সবাই খুশি। তারপর এক সময় বড় হবেন, বড় বড় পরিক্ষায় ভালো সিজিপিএ পাবেন, সবাই খুশি। তারপর পড়াশোনা শেষে টাকা-পয়সা আয় করবেন, যত বেশি করবেন সবাই তত বেশি খুশি। তারপর বিয়ে করবেন, সুন্দরী এবং ভালো মেয়ে হলে সবাই খুশি। তারপর বাচ্চা-কাচ্চা হবে, সবাই খুশি। তারপর এই বাচ্চাগুলো বড় হতে থাকবে, আর পরের সব স্টেপগুলো আবার চলতে থাকবে, কিন্তু বাচ্চাদের সফলতা ব্যার্থতা গুলো আপনার নিজের বলে মনে হবে। আপনার বাচ্চা মানুষ হবে, ভালো পড়াশোনা করবে, ভালো চাকরি করবে, সব আপনার সফলতা। ব্যার্থতাও আপনার।
ঠিক আপনার বাবা-মা আপনার সাথে অন্যের তুলনা করে আফসোস করেন না, নিজেদেরকে অন্যের বাবা-মা’র সাথে তুলনা করেই আফসোস করেন। উনারা নিজেদেরকে অন্যের প্রতিযোগী বানিয়ে ফেলেন নিজের অজান্তেই। তাই নিজেকে নিয়েই অতুষ্ট থাকেন।
তাই আপনারা ছেলে-মেয়েরা কেউ এসবে কষ্ট পাবেন না। সব জায়গায় আপনাকে প্রথম হতে হবে, আপনাকেই জয়ী হতে হবে, এমন চাপ নেওয়ার প্রয়োজন নাই। ভালো করার চেষ্টা করবেন, যেটুকু করা যায়, আল্লাহ যেটুকু দেওয়ার তা পাবেন। মনে রাখবেন, দুনিয়ার সবকিছু আপনি হবেন না, এক এক জায়গায় এক জন যাবেন, ভালো করবেন।
যেমন আমার বাবা-মা আমাকে চেয়েছিলেন আমি একজন ভালো কৃষক হবো, ভালো ইলেক্টিক মিস্ত্রি হবো, সু-বক্তা হবো, একজন বড় আলেম হবো, খুব মিশুক হবো, সবাইকে আগলে রাখবো, অনেক বড় চাকরি হবে, টুকটাক ডাক্তারি জানবো, প্রয়োজনে বাজারে গিয়ে কিছু একটা বিক্রি করে আসতে পারবো, খুব ভালো ছাত্র হবো, শিক্ষক হবো, কাঠুরে হবো, বক-ডাহুক এসব পাখি ধরে আনতে পারবো, ডাব-সুপারি পাড়তে পারবো গাছে উঠে, ভালো রাঁধুনি হবো, নামকরা খেলোয়াড় হবো, ঘর ধোয়া-মোছার কাজে অনন্য হবো, আচার-আচরণে সবার সেরা হবো, পাড়াতে সবার মধ্য মনি হবো, কোথাও প্রয়োজনে ভালো গাইতে পারবো, কবিতা লিখবো সুন্দর, কাপড় সেলাইয়ের কাজও কিছু জানা থাকবে, দক্ষ জেলে হবো, ভ্যানগাড়িতে মালামাল টানতে জানবো।
কিন্তু শেষে আমি কিছুই হলাম না। হলাম অকালকুষ্মাণ্ড। তা উনারা চেয়ে কি কোনোটা পেয়েছেন?? না আমি কোনোটা হতে পেরেছি?? আমি তো আমার ব্যার্থতা হিসেবে দেখছি না কোনোটাতেই, সব উনাদের ব্যার্থতা বলে ভেবেছি। তাই আমি কোনো প্রকার চাপ অনুভব করি না কখনো, বিন্দাস থাকি সবসময়।