নিজস্ব প্রতিবেদক: চট্টগ্রামে জ্বরে আক্রান্তদের বেশির ভাগের শরীরেই শনাক্ত হচ্ছে চিকুনগুনিয়া। তবে আক্রান্ত প্রায় ৬০ শতাংশ রোগীই স্বাস্থ্য প্রশাসনের তালিকায় আসছে না বলে জানিয়েছেন চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্টরা। বন্দর নগরী চট্টগ্রামে আড়াই মাসে চিকনগুনিয়া আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে ২ হাজার ২৬১ জন। বেসরকারি হাসপাতালগুলোর পরীক্ষার প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সিভিল সার্জন কার্যালয় এই তথ্য দিলেও সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকনগুনিয়ো রোগ পরীক্ষার ব্যবস্থা নেই। সরকারিভাবে প্রধান দুটি চিকিৎসাকেন্দ্র চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল ও জেনারেল হাসপাতালে নেই চিকুনগুনিয়া পরীক্ষার কোনো সুযোগ। অথচ এই দুই হাসপাতালের ওপরেই নির্ভর করে এই অঞ্চলের প্রায় চার কোটি মানুষ। পরীক্ষার সুযোগ না থাকায় সরকারিভাবে আক্রান্ত রোগীর সঠিক পরিসংখ্যান সংরক্ষণে নেই। এ অবস্থায় এইডিস মশাবাহিত রোগ চিকনগুনিয়া সংক্রমণের জন্য ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে নগরীর ছয়টি এলাকা চিহ্নিত করেছে চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) এর জুন মাসের একটি জরিপ এবং আক্রান্ত রোগীদের তথ্য বিশ্লেষণ করে এসব এলাকা চিহ্নিত করার কথা বলেছে সিভিল সার্জন কার্যালয়।
সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের শুরু থেকে বুধবার পর্যন্ত জেলায় ১২৭২ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ১৪ জনের। এরমধ্যে চলতি অগাস্ট মাসে ৫ জন এবং জুলাই মাসে ৭ জনের মৃত্যু হয়। ডেঙ্গুতে আক্রান্তদের মধ্যে ৬৩৯ জন নগরীর এবং ৬৩৩ জন উপজেলাগুলোর বাসিন্দা।
জানা গেছে, চট্টগ্রাম নগরের অন্যতম বৃহৎত্তম প্রতিষ্ঠান পার্কভিউ হাসপাতাল, এপিক হেলথ কেয়ার সেন্টার, মেট্রোপলিটন ডায়াগনস্টিক সেন্টার, এভারকেয়ার, শেভরন, সিএসসিআর, আগ্রাবাদ ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানই কেবল রোগী শনাক্তের তথ্য পাঠায় জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ে।
সরেজমিন চমেক হাসপাতাল, জেনারেল হাসপাতালসহ কয়েকটিতে গিয়ে চিকিৎসক দেখাতে আসা এমন অনেক রোগী পাওয়া গেছে, যারা স্থানীয়ভাবে চিকুনগুনিয়া শনাক্তের পর উন্নত চিকিৎসা করাতে ছুটে এসেছেন চট্টগ্রাম নগরে।
চমেক ও জেনারেল হাসপাতালের তথ্য বলছে, প্রতিদিন জ্বর নিয়ে ডাক্তার দেখাতে আসেন তিন থেকে সাড়ে তিনশ রোগী। যাদের মধ্যে উপসর্গ ও শারীরিক জটিলতা থাকা অর্ধেকের বেশি রোগীকে পরীক্ষার পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা। কিন্তু সরকারিভাবে সুযোগ না থাকায় পরীক্ষা না করেই ফিরতে হয় অনেককে। এ কারণে প্রকৃত রোগীর কোনো তথ্য সংগ্রহে নেই দুই হাসপাতালে। প্রধান দুই হাসপাতালের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কাছে একাধিকবার গিয়েও এ-সংক্রান্ত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এ অবস্থায় চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার পরও আক্রান্তদের অর্ধেকের বেশি রোগী তালিকার বাইরে থাকছে।
এদিকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ ওই ছয়টি এলাকায় এইডিস মশা নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনকে চিঠিও দিয়েছে আইইডিসিআর। একই সাথে নগরীর পাঁচটি ওয়ার্ডকে ডেঙ্গুর জন্য ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করে মশা নিধনে ক্রাশ প্রোগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (সিসিসি)।তবে বর্ষা শেষ হলেও নগরীতে এইডিস মশার ঘনত্ব নির্ধারণে স্বাস্থ্য বিভাগ কোনো জরিপ শুরু করেনি।
এখন পর্যন্ত আক্রান্ত রোগীদের তথ্য বিশ্লেষণ করে নগরীর যে ছয়টি এলাকাকে চিকনগুনিয়া সংক্রমণের জন্য ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে সেগুলো হল- হালিশহর, বন্দর, বায়েজিদ, আগ্রাবাদ, ডবলমুরিং ও সদরঘাট।
জানতে চাইলে চট্টগ্রামের ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, এবার নগরীর সবগুলো এলাকাতেই কম-বেশি চিকনগুনিয়া রোগী শনাক্ত হচ্ছে। আইইডিসিআর এর করা জুন মাসের জরিপ এবং আক্রান্ত রোগীদের তথ্যের ভিত্তিতে কোন এলাকাগুলোতে বেশি ঝুঁকি তা উল্লেখ করে আমরা সিটি করপোরেশনকে চিঠি দিয়েছি। চিকনগুনিয়া আক্রান্ত রোগী প্রথম ১০ দিন জ্বর ও ব্যথায় বেশি কষ্ট পাচ্ছেন। তবে মৃত্যুর ঘটনা নেই। ডাক্তারের পরামর্শ মত চিকিৎসা চালিয়ে গেলে আক্রান্তরা সুস্থ হয়ে উঠবেন।
ডেঙ্গু আক্রান্তদের মৃত্যু ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি জানিয়ে তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, উপজেলা পর্যায়ে আমরা নির্দেশনা দিয়েছি যাতে কোনো ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা বিলম্ব করা না হয়।
জেনারেল হাসপাতালের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. এএসএম লুৎফুল কবির শিমুল বলেন, এখনও চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত অনেক রোগী পাচ্ছি। প্রধান দুই সরকারি হাসপাতালে পরীক্ষার ব্যবস্থা না থাকায় আক্রান্তদের ব্যাপারে কোনো রেকর্ড থাকছে না। এতে অজানা থাকছে আক্রান্ত রোগীর প্রকৃত তথ্য। এ ছাড়া অনেকে স্থানীয়ভাবে পরীক্ষা করালেও তাদের তথ্যও নিয়মিত পাচ্ছে না স্বাস্থ্য প্রশাসন। হাসপাতাল ও চেম্বারে আমরা প্রতিনিয়ত এমন অনেক রোগী পাচ্ছি, যারা ডাক্তার দেখান এক জায়গায়, আর পরীক্ষা করান আরেক জায়গায়।
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, চট্টগ্রামে এবারের মতো এত বেশি চিকুনগুনিয়ার রোগী আর শনাক্ত হয়নি। তবে সরকারিভাবে পরীক্ষা করানোর ব্যবস্থা না থাকায় তাদের সঠিক তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। বৈঠক করে বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানকে রোগী শনাক্তের প্রতিদিনের তথ্য দেওয়ার নির্দেশনা দিলেও সেটিও মানছে না তারা।
চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. তসলিম উদ্দীন বলেন, কিট না থাকায় চিকুনগুনিয়া পরীক্ষা করাতে পারছি না। কিটসহ যাবতীয় যন্ত্রপাতি চেয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি দিলেও সাড়া পায়নি।
জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মোহাম্মদ একরাম হোসেন বলেন, চিকুনগুনিয়া পরীক্ষার জন্য নেই কোনো পিসিআর মেশিন, ল্যাব ও কিট। নেই দক্ষ জনবলও।
জানা গেছে, সিটি করপোরেশন নগরীর ৯ নম্বর উত্তর পাহাড়তলী, ২২ নম্বর এনায়েত বাজার, ২৮ নম্বর পাঠানটুলি, ৩৪ নম্বর পাথরঘাটা এবং ৪০ নম্বর উত্তর পতেঙ্গা ওয়ার্ডকে ডেঙ্গুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করে ক্রাশ প্রোগ্রাম হাতে নিয়েছে।
সিটি করপোরেশেনের এক কর্মকর্তা বলেন, মশক নিধনের এই এলাকাগুলোতে আমরা ক্রাশ প্রোগ্রামের আওতায় সকালে ও বিকালে দুই বেলা প্রত্যেক বাড়ি ও আশেপাশের এলাকায় কীটনাশক ছিটাচ্ছি, লিফলেট বিতরণ করছি ও মাইকিং করছি। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এর মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য ও মশার প্রজনন ক্ষেত্র বিনষ্ট করার জন্য অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
