ড. মুহম্মদ মাসুম চৌধুরী : জ্ঞান ছাড়া বাদশাহী চলে না, কিন্তু বাদশাহী ছাড়া চলে (কয়েক বাদশাহ ব্যতীত) সব মানুষের জীবন। মানুষ মানুষ হওয়ার জন্য বাদশাহীর প্রয়োজন হয় না কিন্তু বাদশাহীর জন্য প্রয়োজন হয় সঠিক জ্ঞান। আব্বাসী শাসক মামুনুর রশীদের শাসনামলে জ্ঞান-বিজ্ঞানের ছিল রাজত্ব। ইউরোপের জন্য ছিল তখন মধ্যযুগ (অন্ধকার যুগ)। আমেরিকা তখন আবিষ্কার হয়নি। তাঁর শাসনামলে জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা গেল চরম উৎকর্ষে। তাঁর ‘বাইতুল হিকমা’ (জান-বিজ্ঞানের গবেষণাগার) পৃথিবীর সেরা ইউনিভার্সিটি। সৌদি আরব, সিরিয়া, ইরান, ইরাক, তুর্কিস্তান, খোরাসন, আফগানিস্তান,সিন্ধু আফ্রিকা মিলে ছিল বিশাল সম্রাজ্য।প্রতি জনপদে গড়ে তুলেন তিনি মহাবিদ্যালয়। খলিফা মামুনুর রশীদ শুধু বিশাল রাজ্যের অধিপতি দিলেন না, ছিলেন জ্ঞানের রাজ্যের রাজাও। জাহেরী ও বাতেনী শিক্ষা অর্জন করেন হযরত ঈমাম মালেক (রা.) ও ঈমাম মোহাম্মদ (রহ.) নিকট। তাঁর বাগদাদের রাজ দরবারে ছিল দুই শত খ্যাতিমান আলেমের এক পর্ষদ। কেউ ইন্তেকাল করলে তাঁর স্থানে আগমন হতো আরেক প্রসিদ্ধ আলেম। এই পর্ষদ বাদশাহ আকবরের রাজ দরবারের নবরত্নের মত মোসাহেব ছিল না। গবেষণা, সংলাপ বিতর্কে ছিল অসাধারণ পর্ষদ। খলিফা নিজেই গ্রহণ করতেন এসব জ্ঞানের স্বাদ। জ্ঞানের এই অনুরাগী শাসক নিজের দুই সন্তানকে ভাষা শিখার জন্য তুলে চলে দেন ঈমাম ফাররা (রহ.)’র হাতে। একদিন ঈমাম ফাররা (রহ.) পাঠদান শেষে উঠে দাঁড়ালেন, তাঁকে জুতো এগিয়ে দেওয়ার জন্য দুই রাজপুত্রের শুরু হলো প্রতিযোগিতা। কে দিবে জুতো তা নিয়ে শুরু হলো দুজনের মধ্যে ঝগড়া। এক পর্যায়ে দু’জনে আপোস করে একটি করে দুজনে দু’টি জুতো এগিয়ে দিবেন প্রিয় শিক্ষকের পদতলে। তা-ই হলো। ঘটনা খলিফা মামুনুনের কানে গেল। খলিফা ঈমামকে ডেকে প্রশ্ন করেন, বলুন তো এই জগতের সবচেয়ে সম্মানিত মানুষ কে? ঈমাম বললেন, খলিফাতুল মোসলেমিন, ‘আপনিই’। যাঁর জুতো এগিয়ে দিতে দুই রাজপুত্র লড়াই করে সে-ই প্রকৃত রাজ্যের রাজা। হৃদয়ের রাজা। রাজ্য জয় করা সহজ কিন্তু হৃদয় জয় করা অত্যন্ত কঠিন। ইমাম ফাররার সামনে এসব সত্য উচ্চারণ করলেন জগতের রাজা মামুনুর রশীদ।
খলিফা মামুনুর রশীদের পিতা হারুনুর রশীদের রাজত্বকালে বাক্কায় নির্মাণ করেন অবকাশ মহল। স্ত্রীকে সাথে নিয়ে একদিন উঠেন ওই মহলে। এমনই সময় সেখানে গমন করেন হাদিস শাস্ত্র জগতের বিখ্যাত পণ্ডিত আবদুল্লাহ ইবনে মোবারক (রহ.)। পড়ে গেল সাড়া। তাঁকে দেখতে চারদিক হতে আসতে থাকে হাজার হাজার মানুষ। পড়ে গেল হুড়োহুড়ি। খলিফার স্ত্রী অবকাশ মহল হতে উকি দিয়ে এই অসাধারণ দৃশ্য দেখে বলে উঠেন, কসম করে বলছি, এই রাজত্বের কাছে হারুনের রাজত্ব কী। যে রাজা অর্থ, ভয় ও বাহিনী ছাড়া মানুষের সমাবেশ ঘটাতে পারে না। (সূত্র: আল্লামা জাহাবী সিয়ারু আলামিন নুবালা, ৭:৬০২, তরজমাঃ ১২৮৪)
এই অসাধারণ দৃশ্যের বর্ণনা দিয়েছেন, লেখক গবেষক মুহাম্মদ যাইনুল আবেদীন। তিনি লিখেছেন, ‘দুই রাজা মুখোমুখি। একজন মাটি ও রাষ্ট্রের সম্রাট আরেকজন সম্রাট জ্ঞানের-নববী ইলমের। একজনের শাসন চলে পিঠে আরেকজনের শাসন চলে অন্তরে। একজনের রাজত্ব পুলিশ ছাড়া অচল আরেকজনের রাজত্বে পুলিশ নিষিদ্ধ। একজনের রাজত্ব দুইদিনের আরেকজনের রাজত্ব অমর। কী আশ্চর্য। একজন নারীও বোঝেন এই পার্থক্য। অথচ এই শ্রেষ্ঠ রাজত্বের দরজা সকলের জন্যে উন্মুক্ত। হয়তো এর জন্য চাই কিছু নিদ্রাহীন রাত; যোগ্যজনের নিবিড় সান্নিধ্য এবং লক্ষ্য অর্জনে মনোযোগী সংগ্রাম। তবে মাটি ও কুরসীর রাজত্বলাভের মতো খুনোখুনি নেই এখানে: নেই বন্য খাঁচায় প্রাণ হারাবার সার্বক্ষণিক ভয়। (সূত্র: বড় যদি হতে চাও, পৃষ্ঠা:২৭)
পৃথিবীর মধ্যে যত নেশা আছে তার মধ্যে সবচেয়ে উৎকৃষ্ট নেশা জ্ঞানের নেশা।পৃথিবীর মধ্যে যত নেশা আছে তার মধ্যে জ্ঞান সবচেয়ে উৎকৃষ্ট নেশা।জ্ঞান অন্বেষণকারীদের জ্ঞান বিতরণের কারণেই পৃথিবীব্যাপী ইসলামের বাণী ছড়িয়ে পড়েছে। দুনিয়ার মুসলমানের ৬০ ভাগ ঈমাম আবু হানিফা (রাহ.)’র মাজহাবের অনুসারী। আবু হানিফা (রাহ.)’র ছাত্রদের মধ্যে ফেকাহ ও মারেফাতের অধিক উজ্জ্বল নক্ষত্রটির নাম ঈমাম আবু ইউসুফ (রহ.)। ঈমাম আবু ইউসুফের কারণেই হানাফী মাজহাবের বিশ্বব্যাপি এত বিস্তৃতি।ঈমাম আবু হানিফা (রহ) আধ্যাত্মিক রহস্য প্রকৃতপক্ষে ধারণ করতে পেরেছিলেন ঈমাম আবু ইউসুফ (রহ.)।তিনি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে ধ্যান যোগে ঈমাম আবু হানিফা (রহ.)’র সান্নিধ্যে কাটিয়েছে পুরো সতেরো বছর। এই সতেরো বছর অসুস্থতা ব্যতীত দুই ঈদেও তিনি ইমামের সঙ্গ ছাড়েনি।
ঈমাম আবু ইউসুফ (রহ.) নিজেই বর্ণনা করেছেন, ‘আমার সন্তান মারা গেল, আমি তাঁর দাফন কাফনে যাইনি। কারণ যদি আমি আবু হানিফার পাঠ হারিয়ে ফেলি,সে বেদনা কোনদিন ভুলতে পারবো না। সন্তানের দাফন কাফেনের কাজে আত্মীয় ও প্রতিবেশীদের নিকট অর্পণ করি। (সূত্র: আল্লামা জাহেদ কাওসারী, হুসুত তাকাজী ফি সীরাতিল ঈমাম আবু ইউসুফ আলকারী, সাফতাবাতুল হাসান, পৃঃ ৮১-৭৬)
ঈমাম আবু ইউসুফের কাছে ছেলে হারানোর কষ্টের চেয়ে জ্ঞান হারানোর কষ্ট বড় ছিল।জ্ঞানের প্রতি প্রচণ্ড অনুরাগই ঈমাম আবু ইউসুফ (রহ.) কে বিশ্বখ্যাত করে ছিলো। ক্ষুদ্র দোকানদারের সন্তান হয়ে উঠে পৃথিবীর সেরা প্রধান বিচারপতি। জ্ঞান সাধনার জন্য প্রয়োজন ইচ্ছা শক্তি। ইচ্ছা শক্তির অভাবে কত মেধাবী যুবক বেলায় আবেলায় নষ্ট হয়ে যেতে দেখেছি। অল্প মেধাবী ছেলে সাধনা ও ইচ্ছা শক্তির কারণে জগৎ বিখ্যাত হতে দেখেছি। জ্ঞান সাধনা এক বড় ইবাদত। মহানবী হযরত মুহম্মদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি জ্ঞান সাধনায় নামে মহান আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত তাঁকে জান্নাতের পথে পরিচালিত করে। তার পদতলে ফেরেস্তারা ডালা বিছিয়ে দেয়। জ্ঞানীদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে আসমান ও জমিনের সবকিছু। আলেমগণ নবীর উত্তরাধিকারী। নবীগণ দিনার দেরহামের উত্তরাধিকার রেখে যান না, জ্ঞানের উত্তরাধিকারই রেখে যান।
ইয়াহইয়া আন্দালুসী (রহ.) মদিনায় এসে হযরত ঈমাম মালেক (রহ.)’র পাঠশালায় ভর্তি হলেন। ডুবে থাকেন ঈমামের সোহবতে। একদিন রব উঠল-মদিনায় হাতি এসেছে। উটের দেশে হাতির আগমনের কথা শুনে সব ছাত্র দৌড়ে গেল হাতি দেখতে। কিন্তু ইয়াহইয়া আন্দালুসী বসে রইল ঈমামের সোহবতে।ঈমাম বললো, তুমিও হাতি দেখে এসো।
ইয়াহইয়া আন্দালুসী (রহ) বললেন, হুজুর আমি আমার দেশে ছেড়ে এসেছি আপনাকে দেখতে, আমি তো হাতি দেখতে আসিনি। হাতি দেখতে গিয়ে আধ্যাত্মিক ও জ্ঞানী মনীষীর সান্নিধ্যের এক মুহুর্তও যদি হারিয়ে যায় তা হবে তাঁর জন্য অত্যন্ত কষ্টের।
জ্ঞানের পিপাসা কোনদিন নিবারণ হয় না। মহানবী হযরত মোহাম্মদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, দুই তৃষ্ণার্থ ব্যক্তির তৃষ্ণা কখনো নিবারণ হয় না। জ্ঞানের তৃষ্ণা আর সম্পদের তৃষ্ণা। (মিশকাত)
ঈমাম বোখারী (রহ.) হাদিসের জ্ঞান সাধনায় জীবন উৎসর্গ করেছিলে। একটি হাদিস সংগ্রহের জন্য তিনি শত শত মাইল পাড়ি দিয়েছিলেন। হাফেজ ইবনে কাসীর (রহ.) বর্ণনা করেছেন, ঈমাম বোখারী রাতে ঘুম থেকে অনেক বার উঠে প্রদীপ জ্বালিয়ে মনে উদিত হওয়া তথ্যটি নোটবুকে লিখতেন। তারপর বাতি নিভিয়ে ঘুমাতেন। কিছুক্ষণ পর আবার প্রদীপ জ্বালিয়ে উঠে লিখতেন। এভাবে একরাতে বিশ বার পর্যন্ত উঠতেন। শেষ রাতে আবার তাহাজ্জুদের নামাজ পড়তেন। এই হলো তাঁর নবীজীর রেখে যাওয়া জ্ঞান সাধনা।
আল্লাহর অলি সাহল ইবনে আবদুল্লাহ তুসতারী (রহ.) হযরত ঈমাম আবু দাউদ (রহ.) নিকট হাজির হয়ে বললেন, আপনার নিকট বিনীত অনুরোধ আছে,যদি বলেন, অনুরোধটি রক্ষা করবেন তবে বলতে পারি। ঈমাম বললেন, বলুন। অনুরোধটি রক্ষা করতে চেষ্টা করবো। সাহল তুসতারী বললেন, ‘আপনি যে জিহ্বা দিয়ে আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিস বর্ণনা করেন সেই পবিত্র জিহ্বাটা একটি বার বের করে দিন আমি আপনার জিহ্বায় চুমু খেতে চাই। তিনি জিহ্বা বের করে দেন,সাহল তুসতারী (রহ.) তাতে চুমু খান। (সূত্র: ওফায়াতুল আ’য়ান, তরজমা: ২৭২ এর সূত্রে মাকালাতে হাবীব, ৩:১৮২)
এসব আলোকিত ঘটনা হতে আজকের প্রজন্মের অনেক কিছু শিখার আছে। আমরা স্মরণ করি, অনুসরণ করি না। স্মরণের মধ্যে অনুসরণ না থাকলে সে স্মরণ ব্যর্থতা ছাড়া কোন দিন সফলতা আসবে না।লেখক: কলাম লেখক, রাজনীতিক


