উত্তম কুমার আচার্য্য : অযৌক্তিকভাবে জোরে আওয়াজ তুললেই কোনো বিষয় “বিতর্কিত” হয়ে যায় না।আর এমন আওয়াজে যদি বারবার সিদ্ধান্ত বদলায়, তাহলে গণতন্ত্র দুর্বল হতে পারে—তবে সেটি পুরোপুরি শেষ হয়ে যায় না, বরং তার মানের প্রশ্ন ওঠে।
এ সমস্যাটি নিয়ে আলোচনা সমকালের প্রেক্ষিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন সামাজিক প্রথা, দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত, মূল্যবোধভিত্তিক বিভিন্ন অনুষঙ্গের বিরুদ্ধে কারণে অকারণে আওয়াজ তুলে কোনো কিছুকে, কোনো ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠান, প্রথা, সংস্কৃতিকে বিতর্কিত করে তোলা এখন প্রায় স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গণতন্ত্রের বৈশিষ্ট্যই হলো মানুষ মন খুলে কথা বলবে, সহমত কিংবা ভিন্নমত পোষণ করবে কিংবা নিজের আলাদা মত তুলে ধরবে। এভাবে গণতন্ত্রে বিতর্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ আঙ্গিক। কোনো বিষয় নিয়ে বিতর্ক হলেই কি তা বিতর্কিত (কেন জানিনা, বাংলায় বিতর্কিত শব্দটি নেতিবাচক অর্থেই ব্যবহৃত হয়)? জোরে বললেই কিংবা অল্প আওয়াজকে পরিকল্পিতভাবে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়ে কোনো বিষয়কে বিতর্কিত করে কোনো স্বীকৃত বিষয়কে পরিবর্তনের চেষ্টা করা আদৌ কি প্রকৃত গণতন্ত্রকে সাহায্য করে? কয়েকটা প্রশ্ন সামনে রেখে এগুনো যাক-
১. “জোরে বললেই বিতর্ক” — আসলে কী ঘটে?
কোনো বিষয় বিতর্কিত হতে সাধারণত লাগে—
বাস্তব মতভেদ, যুক্তি বা স্বার্থের সংঘাত, সামাজিক গুরুত্ব প্রভৃতি ; কিন্তু বাস্তবে কী হয়?
অল্প কিছু মানুষও যদি খুব তীব্রভাবে, বারবার, দৃশ্যমানভাবে কথা বলে বিশেষ করে মিডিয়া/সোশ্যাল মিডিয়ায় তখন সেটি “বড় বিতর্ক” বলে মনে হতে পারে। একে অনেক সময় বলা হয় “amplification effect” (আওয়াজ বাড়িয়ে তোলা)।
২. সমস্যা কোথায়?
যখন—সংখ্যা কম কিন্তু আওয়াজ বেশি, যুক্তির চেয়ে আবেগ বা চাপ বেশি কাজ করে
তখন ঝুঁকি তৈরি হয়: নীতিনির্ধারকরা বাস্তব জনমতের বদলে “শব্দ” দেখে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।“নীরব সংখ্যাগরিষ্ঠ” (silent majority) উপেক্ষিত হতে পারে।
৩. তাহলে গণতন্ত্র কি ক্ষতিগ্রস্ত হয়?
গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো—মত প্রকাশের স্বাধীনতা, যুক্তিভিত্তিক আলোচনা, সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত + সংখ্যালঘুর অধিকার।
সুস্থ গণতন্ত্রে সবাই মত দিতে পারে, সিদ্ধান্ত হয় তথ্য, যুক্তি ও জনমতের ভিত্তিতে।
দুর্বল গণতন্ত্রে বেশি আওয়াজ ➤বেশি প্রভাব তথা
চাপ বা ভয় ➤সিদ্ধান্ত পরিবর্তন।
এই অবস্থায় গণতন্ত্র থাকে, কিন্তু তার গুণগত মান হ্রাস পায়।
৪. বাস্তব সত্য কি?
“আওয়াজ” গণতন্ত্রের অংশ—কারণ মানুষ কথা বলবে কিন্তু “শুধু আওয়াজ” যদি সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করে তাহলে সেটি populism বা pressure politics-এর দিকে যায়।
তাহলে-
৫. কী হলে ভারসাম্য থাকে?
একটি স্বাস্থ্যকর সমাজে দরকার—তথ্যভিত্তিক আলোচনা, স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম, সচেতন নাগরিক, সংখ্যালঘুর কণ্ঠ শোনা কিন্তু তা যাচাই করে নিশ্চিত হওয়া।
মোদ্দাকথায়, অযৌক্তিক জোরে আওয়াজ কোনো বিষয়কে “দেখতে” বিতর্কিত করতে পারে, কিন্তু সত্যিকারের গণতন্ত্রে সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত যুক্তি ও বাস্তব জনমতের ভিত্তিতে—শুধু আওয়াজের ওপর নয়।
লেখক: শিক্ষাব্রতী, সংস্কৃতিজন, কবি ও প্রাবন্ধিক; সাব-এডিটর, দৈনিক পূর্বকাল।


