সোমবার, এপ্রিল ১৩, ২০২৬
spot_img

পহেলা বৈশাখ: বাংলার চিরায়ত অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতির মহা উৎসব

উত্তম কুমার আচার্য্য : বাংলা নববর্ষ ও পহেলা বৈশাখ-একটি অপেক্ষাকৃত বিস্তৃত কালপর্বের, অন্যটি এর সূচনা দিন। একটি ছাড়া অন্যটি অসম্ভব- যৌক্তিকভাবেই। অপরদিকে দুটোই বাঙালির চিরায়ত সংস্কৃতির প্রোজ্জ্বল অংশ এবং সূচনা উৎসবটি অর্থাৎ পহেলা বৈশাখের উৎসবটি অবশ্যই দল, মত, গোষ্ঠী, সম্প্রদায় নির্বিশেষে বৃহত্তর ও স্বতঃস্ফূর্ত। রবীন্দ্রনাথ পুরো বৈশাখকেই আবাহন করেছেন এভাবে- ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো, তাপস নিঃশ্বাস বায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে…।’ আর নজরুলের আহ্বান ‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর, ওই নতুনের কেতন ওড়ে কালবোশেখীর ঝড়…।’ অবশ্য বৈশাখকে আবাহনে সর্বস্তরের বাঙালি নিজ নিজ ও সার্বজনীন উভয় ধরনের প্রকাশে তৎপর। বৈশাখ নতুনের শুরু, নতুনের প্রতিভূ এবং জীর্ণতার ধ্বংসস্তুপে নবজীবনের পতাকা ওড়ানোর সময় হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে আসছে। ক্রমে পহেলা বৈশাখ, বৈশাখ মাস, নববর্ষ প্রভৃতি শব্দ বা শব্দবন্ধ বাঙালির প্রাণের সাথে মিশে গেছে। সবকিছু আবর্তিত হয়েছে বাংলা সনকে কেন্দ্র করেই। বাঙালির জীবন-জীবিকাকে নিয়ে জীবনব্যাপী কিংবা প্রজন্মান্তরে প্রবহমান কর্মধারা এবং সাথে মিশে থাকা অনুভূতি ও তার প্রকাশের একটি পঞ্জিই হলো বাংলা সন। তাই বাংলা নববর্ষ নিছক একটা ক্যালেন্ডার শুধু নয় আরও বেশি কিছু।

বাংলা সনের উদ্ভব ইতিহাস প্রসঙ্গে অনেকের ধারণা- হিন্দু ধর্ম ও ঐতিহ্যের সাথে সম্পর্ক আছে এর। কিন্তু এ ধারণা সঠিক নয়। বাংলা সন কোন ধর্ম সম্প্রদায়ের সন নয়। হিন্দুয়ানী সন তো নয়ই। বাংলা সাল তথা বঙ্গাব্দ প্রচলনের আছে গৌরবময় ইতিহাস। মুঘল সম্রাট আকবর পূর্বে রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে হিজরি বর্ষপঞ্জি ব্যবহার করতেন। এটি ছিল কৃষক শ্রেণির জন্য ক্লেশকর ব্যাপার, কারণ চান্দ্র ও সৌর বর্ষের মধ্যে ১১/১২ দিনের ব্যবধান এবং এ কারণে ৩১ চন্দ্রবর্ষ ৩০ সৌরবর্ষের সমান ছিল। সে সময় রাজস্ব আদায়ে চন্দ্রবর্ষ এবং ফসল সংগ্রহে সৌরবর্ষ অনুসরণ করা হতো। একটি বিজ্ঞানভিত্তিক কর্মোপযোগী ও গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি দিন তারিখ গণনার ক্ষেত্রে চালুর জন্য বর্ষপঞ্জি সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন সম্রাট আকবর, তাঁর রাজত্বের শুরু থেকেই। দায়িত্ব দিলেন বিজ্ঞানী ও জ্যোতির্বিদ আমির ফতেউল্লাহ সিরাজীকে। ৯৬৩ হিজরির মুহররম মাসের শুরু থেকে বাংলা বর্ষের ৯৬৩ অব্দের সূত্রপাত হয় তাঁর প্রচেষ্টায়। যেহেতু ৯৬৩ হিজরির মুহররম মাস বাংলা বৈশাখ মাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল, সেহেতু চৈত্র মাসের পরিবর্তে বৈশাখ মাসকেই বাংলা বর্ষের প্রথম মাস করা হয়। চৈত্র ছিল শক বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস, যা সে-সময় বঙ্গে ব্যবহৃত হতো। বাংলা সন গণনা শুরু হয় ১৬ জুলাই ৬২২ খ্রিস্টাব্দ থেকে। কিন্তু ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট আকবর বাংলা বর্ষপঞ্জি প্রবর্তন করেন। এ নতুন বর্ষপঞ্জিটি প্রথমে ‘তারিখ-ই-ইলাহী’ নামে পরিচিত ছিল; ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে ১০ বা ১১ মার্চ এটি বঙ্গাব্দ নামে প্রচলিত হয়। নতুন এ সনটি আকবরের রাজত্বের উনত্রিশতম বর্ষে প্রবর্তিত হলেও তার প্রবর্তন গণনা করা হয় ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দের ৫ নভেম্বর থেকে কারণ এদিন আকবর দ্বিতীয় পানিপথের যুদ্ধে হিমুকে পরাজিত করে সিংহাসনে আরোহণ করেন।

তারিখ-ই-ইলাহী প্রবর্তন থেকে অতিক্রান্ত ৪৪৫ বছরের মধ্যে হিজরি ও বাংলা বর্ষপঞ্জির মধ্যে ১৪ বছরের পার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে। এর কারণ ইসলামী হিজরি বর্ষ হচ্ছে চন্দ্র নির্ভর, আর বাংলা বর্ষ সূর্য নির্ভর যা পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। তারিখ-ই-ইলাহী প্রবর্তনের সময়ে গ্রেগরিয়ান ও হিজরি বর্ষের মধ্যে পার্থক্য ছিল ১৫৫৬-৯৬৩=৫৯৩ বছর, যা বর্তমানেও কার্যকর। অর্থাৎ বাংলা সনের সঙ্গে ৫৯৩ যোগ করলে খ্রিস্টীয় সন পাওয়া যায়।

আকবরের সময়ে মাসের প্রতিদিনের জন্য একটি করে স্বতন্ত্র নাম ছিল। কিন্তু এত নাম মনে রাখা কষ্টসাধ্য ছিল বিধায় সম্রাট শাহজাহান তাঁর ফসলি সনে সেগুলোকে সাপ্তাহিক পদ্ধতিতে রূপান্তরিত করেন। সম্ভবত একজন পর্তুগীজ পণ্ডিতের সহায়তায় তিনি সাতদিনের সমন্বয়ে সপ্তাহ পদ্ধতি চালু করেন। ইউরোপে ব্যবহৃত রোমান নামকরণ পদ্ধতির সঙ্গে সপ্তাহের দিনগুলোর লক্ষ্যণীয় মিল রয়েছে। যেমন: Sun (Sunday)-এর সঙ্গে রোববার, Moon (Monday)-এর সঙ্গে সোমবার, Mars (Tuesday or Tiwes Daeg, the day of Tiw, Mars, The god of war)-এর সঙ্গে মঙ্গলের, Mercury (Wednesday)-এর সঙ্গে বুধের, Jupitar (Thurs-day)-এর সঙ্গে বৃহস্পতির, Venus (Friday)-এর সঙ্গে শুক্রের এবং Saturn (Sat-urday)-এর সঙ্গে শনির। পাশ্চাত্য বর্ষপঞ্জির মতোই বাংলা সপ্তাহও তখন রোববারে শুরু হতো। দিনের নামের মতো একসময় মাসগুলোর নামও পরিবর্তন করা হয়। প্রথমদিকে মাসগুলো ফারওয়ারদিন, উর্দিবাহিশ, খোরদাদ, তীর, মুরদার, শাহারিবার, মেহের, আবান, আজার, দে, বাহমান এবং ইসকান্দ নামে পরিচিত ছিল। পরবর্তীকালে মাসগুলোর নাম কিভাবে বৈশাখ, জৈষ্ঠ্য ইত্যাদি হয় তা জানা না গেলেও এটা সন্দেহাতীত যে, এ নামগুলোর ভিত্তি ছিল বিভিন্ন তারকা। অনুমান করা হয় যে, শক রাজবংশের স্মরণার্থে ৭৮ খ্রিস্টাব্দে প্রবর্তিত শকাব্দ থেকে এ নামগুলো এসেছে। যে তারকামণ্ডলীর নামানুসারে বাংলা মাসের নাম এসেছে সেগুলো হল- বিশাখা থেকে বৈশাখ, জ্যেষ্টা থেকে জ্যেষ্ঠ, উত্তরাষাঢ়া থেকে আষাঢ়, শ্রবণা থেকে শ্রাবণ, ভাদ্রপদ থেকে ভাদ্র, অশ্বিনী থেকে আশ্বিন, কৃত্তিকা থেকে কার্তিক, অগ্রাহইনী থেকে অগ্রহায়ন, পুষ্যা থেকে পৌষ, মঘা থেকে মাঘ, ফাল্গুনী থেকে ফাল্গুন এবং চিত্রা থেকে চৈত্র।

১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দের ১৭ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমির তত্ত্বাবধানে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে ‘বঙ্গাব্দ’ বিশ্বের আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত সনগুলোর মর্যাদা লাভকরে।

বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন ও বিদায়ী বর্ষের শেষ দুইদিন নানাভাবে এতদঞ্চলের মানুষের মধ্যে বিশিষ্ট স্থান অর্জন করে আছে। চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষের মধ্যে উক্ত তিনটি দিন বাঙালি ও উপজাতি উভয়ের দ্বারা পালিত হয়ে আসছে প্রায় অভিন্ন নামে ও আনুষ্ঠানিকতায়।

ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীসমূহ বিঝু, সাংগ্রাই, বৈসু প্রভৃতি নামে পালন করে চৈত্র মাসের ৩০ ও ৩১ তারিখ এবং বৈশাখের ১ তারিখ। সমতলে একসাথে এ উৎসবকে ‘বৈসাবি’ বলা হয়। ‘বৈসাবি’ নামকরণ করা হয়েছে তিনটি উৎসবের প্রথম অক্ষরগুলো নিয়ে। ত্রিপুরাদের ‘বৈসু’, মারমাদের ‘সাংগ্রাই’ এবং চাকমাদের ‘বিঝু’, চাকমারা প্রথমদিনকে অর্থাৎ চৈত্রের ২৯ তারিখকে ‘ফুল বিঝু’ ও দ্বিতীয় দিনকে চৈত্র্যের ৩০ তারিখকে ‘মূল বিঝু’ এবং তৃতীয় দিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখকে ‘নুয়া বিঝু’ বলেন।

বাংলায় বর্ষবরণের আনুষ্ঠানিকতা জাতীয় পরিসরে শুরুর ইতিহাস উনিশশ একষট্টি সালের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ইতিহাসের সমান্তরাল। এ বছর ছায়ানট প্রতিষ্ঠিত হয়। ওয়াহিদুল হক, কবি সুফিয়া কামাল, সাইদুল হাসান, ফরিদা হাসান, মোখলেসুর রহমান, শামসুন্নাহার রহমান, আহমেদুর রহমান, মিজানুর রহমান, সাইফ উদ্দীন আহমদসহ অনেকেই সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের জন্য একটি সমিতি গঠনের উদ্যোগ নেন। তবে ওয়াহিদুল হক এবং তাঁর স্ত্রী সানজিদা খাতুনের প্রাণপাত পরিশ্রমে ‘ছায়ানট’ নামক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রতিষ্ঠানটির জন্ম ও বেড়ে ওঠা। চিরায়ত বাঙালি সংস্কৃতির নানান দিক বর্ষবরণের উৎসবকে পূর্ণতা দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ফসলি সন হিসেবে বাংলা সনের প্রবর্তনের মূল সুর যাতে মিশে আছে প্রাচীন বাংলার কৃষি সমাজের প্রাত্যহিকতা, তা থেকে আজকের বর্ষবরণ উৎসব অনেকখানিই সরে এসেছে। ‘মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা, অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।’… কবিগুরুর এই বহুশ্রুত গানখানিতে বর্ষবরণের বাণী কৃষি সমাজের শীতকালীন নির্জীবতার পর নবজীবনের আবির্ভাব বিষয়ক ধারণার প্রতিধ্বনিই যেন। পুরাতনকে বর্জনের ডাক, নবজীবনের আহ্বান, ধরার শুচিতা প্রভৃতি বিষয়গুলো যুগপৎ এখানে মিশে আছে। তবুও প্রাচীন কৃষি সমাজের উপরিউক্ত ধারণার সাথে কবির নবীন বরণের বাণী স্থায়ী বন্ধনে বাঁধা নয়। ‘বৈশাখ হে, মৌনী তাপস, কোন্ অতলের বাণী’ যে গানখানির প্রথম কলি, তার শেষ দিকে তিনি আশার বাণী শুনিয়েছেন অবশ্যই, কিন্তু সমগ্রবাণী সেখানে তাঁর জীবন দেবতাকে বরণের। যদিও বৈশাখ বা নববর্ষ এখন অংশত বিভ্রান্ত অর্থাৎ ঐতিহ্যের সন্ধান থেকে অনেকটা দূরে সরে এসেছে তবু এ বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত নববর্ষ এক বড় এবং বেসরকারিভাবে বৃহত্তম জাতীয় উৎসব।

এদেশেরই মাটিতে প্রাচীন শেকড় নিয়ে, আপন থেকে আপন নববর্ষ উৎসব উদযাপনের ইতিহাস আমাদের আছে যা আমাদের পূর্ব দক্ষিণ অঞ্চলে বৌদ্ধ ও উপজাতি সমাজে প্রচলিত। এটির উল্লেখ ইতোপূর্বে করেছি। সে যাই হোক, বাঙালির কাছে নববর্ষ এক অন্তর্গত পরিবর্তন চেতনার নাম। প্রকৃতিও যেন এ চেতনাকে সায় দেয়। শীতের রুক্ষতা ফাল্গুনের আমেজকে অনেকখানি স্নান করে রাখে। কিন্তু চৈত্রের দাবদাহ সত্ত্বেও প্রকৃতি জেগে ওঠে প্রাণের স্পন্দনে। বৃক্ষে, পত্র-পল্লবে সাজ সাজ রব ওঠে যেন। আড়মোড়া দিয়ে জেগে ওঠে আমাদের পরিপার্শ্ব। আকাশ, বায়ুও যেন পিছিয়ে থাকে না। ভূমিজ প্রাকৃতিক অনুষঙ্গের সাথে তাল মিলিয়ে মেতে ওঠে তারা, পুরাতনকে ঝরিয়ে নতুনকে বরণে। আর প্রকৃতির সন্তান মানুষ আরেক দফা জীবন সাজাতে কোমর বাঁধে, বুক বাঁধে আশায়। এভাবে বাংলা নববর্ষ তথা পহেলা বৈশাখ জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, সম্প্রদায়, নির্বিশেষে চিরনতুনেরে ডাক দিয়ে যায়।
লেখক: শিক্ষাব্রতী, সংস্কৃতিজন, কবি ও প্রাবন্ধিক; সাব-এডিটর, দৈনিক পূর্বকাল।

সর্বশেষ

পাঠ্যপুস্তক

রতন চন্দ্র পাল, অতিথি লেখক: মানব সভ্যতার শ্রেষ্ঠ প্রকাশ...

ইজারাদারদের দাবি, সাতকানিয়া দেওয়ানহাট বাজার পরিচালনায় সুশাসন নিশ্চিতকরণের

অনলাইন ডেস্ক: সাতকানিয়ার দেওয়ানহাট বাজার পরিচালনায় সুশাসন নিশ্চিতকরণের দাবী...

যুক্তরাষ্ট্র আ.লীগের কৃষি বিষয়ক সম্পাদক নিযুক্ত সঞ্জয় কুমার সাহা

পূর্বকাল ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের কৃষি বিষয়ক সম্পাদক...

আ.লীগের কেন্দ্রীয় তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক উপকমিটির সদস্য হলেন বিধান রক্ষিত

নিজস্ব প্রতিবেদক: আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক...

সাতকানিয়ার কেরানীহাটে আশ্-শেফা স্কুল এন্ড কলেজে নাতে রাসুল (সাঃ) প্রতিযোগিতা সম্পন্ন

এস এম আনোয়ার হোসেন, দক্ষিণ চট্টগ্রাম: পবিত্র রবিউল আউয়াল...
spot_img