অনলাইন ডেস্ক: বাংলাদেশের বেসরকারি খাত চরম সংকটে রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। গত বৃহস্পতিবার রাতে যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান আটলান্টিক সেন্টার আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি এ মন্তব্য করেন।আটলান্টিক সেন্টারের সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যানের সঞ্চালনায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাংলাদেশের অথনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করেন।অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘দায়িত্ব গ্রহণ করার পর দেখা যাচ্ছে, যে অর্থনীতি উত্তরাধিকার হিসেবে পাওয়া গেছে তা গভীরভাবে আলোচনার দাবি রাখে।আর্থিক খাত কার্যত সংকটময় অবস্থায় রয়েছে এবং পুঁজিবাজারও মারাত্মকভাবে স্থবির। এর পাশাপাশি, বাংলাদেশ থেকে ২০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ পাচার হয়েছে বলে জানা যায়, যার ফলে দেশে তীব্র পুঁজিসংকট তৈরি হয়েছে।বাজারে মূলধনের বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।’
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মূলত বেসরকারি খাতনির্ভর ছিল, কিন্তু বর্তমানে সেই বেসরকারি খাতই চরম সংকটে রয়েছে।অতীতে যে কৌশল অনুসরণ করা হয়েছে তা ছিল বেসরকারি খাতকে কেন্দ্র করে। কিন্তু এখন সেই খাতকে উদ্ধার করাই প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ব্যাংকিং খাত অত্যন্ত দুর্বল অবস্থায় রয়েছে এবং অনেক ব্যাংক কার্যত দেউলিয়া হয়ে পড়েছে।এসব ব্যাংককে দ্রুত পুনঃপুঁজিকরণ (রিক্যাপিটালাইজেশন) করা জরুরি।’
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বেসরকারি খাতে পুঁজিসংকটের পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। একটি বড় কারণ হলো অতীতে অর্থনীতি অনেকটা অলিগার্কিক বা গোষ্ঠীনির্ভর ছিল, যার ফলে সাধারণ ব্যবসায়ীরা প্রকৃত বাজারভিত্তিক পরিবেশে কাজ করার সুযোগ পাননি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে টাকার মান প্রায় ৪০ শতাংশ অবমূল্যায়ন এবং অতিরিক্ত ১০ শতাংশ মূল্যহ্রাস (মুদ্রাস্ফীতির কারণে)।তিনি বলেন, এর ফলে মোটামুটি ৫০ শতাংশ মূলধন ও কার্যকরী মূলধন হারিয়ে গেছে।
এতে বেসরকারি খাতে ব্যাপক পুঁজি ক্ষয় হয়েছে। এর ফল হিসেবে অনেক প্রতিষ্ঠান এখন দুর্বলভাবে পরিচালিত হচ্ছে। উৎপাদন কমে গেছে এবং অনেক প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন ৩০ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যায়ে নেমে এসেছে। এই নিম্ন উৎপাদনশীলতার কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো লোকসানে চলছে এবং তাদের অবশিষ্ট মূলধনও ক্ষয় হচ্ছে। অর্থাৎ যারা দেশের অর্থনীতিকে চালনা করে, তারাই এখন সবচেয়ে বেশি সংকটে রয়েছে।
এই পরিস্থিতি মোকাবেলা করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনায় আমরা জোর দিয়ে বলছি যে প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত বেসরকারি খাত ও ব্যাংকিং খাতে পুঁজির ঘাটতি পূরণ করা। এই পুঁজি পুনরুদ্ধার ছাড়া অন্য কোনো সংস্কার কার্যকর হবে না।’
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কর-জিডিপি অনুপাত, যা আগে প্রায় ১১ শতাংশ ছিল, এখন কমে ৭ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। যদিও এই অনুপাত বাড়ানো জরুরি। কিন্তু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো ঘুরে দাঁড়াতে না পারলে কর আদায় বাড়ানো সম্ভব নয়। তাই প্রথমে ব্যবসা খাতকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। এরপর কর-জিডিপি বাড়ানোর বিষয়ে কথা বলা যেতে পারে। প্রক্রিয়াটি সময়সাপেক্ষ।’
অর্থমন্ত্রী আরো বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো আগামী দুই বছরের জন্য একটি আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করা। এর মাধ্যমে ব্যাংকিং খাত ও বেসরকারি খাতে পুঁজি পুনঃসংস্থান করতে হবে। এই দুটি খাতকে শক্তিশালী করাই এখন বাংলাদেশের জন্য সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
এদিকে রাশিয়া থেকে জ্বালানি আমদানির বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ছাড় চেয়েছিল। সেটি এখন কী পর্যায়ে আছে, জানতে চান মাইকেল কুগেলম্যান। জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা বেশ কিছুদিন ধরেই এই ছাড়ের জন্য অনুরোধ করে আসছিলাম এবং অবশেষে অনুমোদন পাওয়া গেছে। এটি অবশ্যই আমাদের জন্য একটি বড় সহায়তা। কারণ রাশিয়ার তেল স্পট মার্কেট থেকে কেনা তেলের তুলনায় তুলনামূলকভাবে সস্তা। এতে স্বাভাবিকভাবেই আমাদের খরচ কমে।’
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের জ্বালানি সহযোগিতা এখন পর্যন্ত খুব বেশি এগোয়নি। বিষয়টি নিয়ে আমরা যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বিভাগ, অর্থ এবং পররাষ্ট্র দপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করে যাচ্ছি—কিভাবে এই সহযোগিতা আরো এগিয়ে নেওয়া যায়।’
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘মূলত পারস্পরিক শুল্ক (রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ) চুক্তির ধারণাটিই ছিল পরিশোধ ভারসাম্য (ব্যালান্স অব পেমেন্টস) পরিস্থিতিকে সামাল দেওয়ার জন্য। আর এর একটি বড় অংশই ছিল জ্বালানি খাত, বিশেষ করে গ্যাস ও পেট্রোলিয়াম পণ্য।’
তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করছি, যদি জ্বালানি খাতে একটি কার্যকর সমঝোতায় পৌঁছানো যায়, তাহলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে। আমরা আমাদের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছি এবং প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। এখন আমরা চুক্তি স্বাক্ষরের অপেক্ষায় আছি। চুক্তিটি সম্পন্ন হলে আশা করা যায়, অগ্রগতি শুরু হবে।’যুক্তরাষ্ট্রের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠক
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক ব্যুরোর অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি পল কাপুরের সঙ্গে গত বৃহস্পতিবার বৈঠক করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বৈঠক প্রসঙ্গে এক্স বার্তায় পল কাপুর বলেছেন, উন্নত বাজারে প্রবেশাধিকার, জ্বালানি সহযোগিতা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো খাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগের সুযোগ অন্তর্ভুক্ত করাসহ যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক আরো গভীর করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।সূত্র: কালের কণ্ঠ


