উত্তম কুমার আচার্য্য : পহেলা মে হলো ‘মে দিবস’ তথা আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। এ দিবস শ্রমজীবী মানুষের প্রেরণার দিন। এ দিবস শ্রমজীবীদের জন্য উৎসবের দিনও। তবুও এ দিবস শুধু উদযাপনের দিন নয়; এটি শ্রমিক অধিকার, ন্যায্য মজুরি এবং মানবিক কর্মপরিবেশ নিয়ে আত্মসমালোচনারও সময়। বাংলাদেশ একটি শ্রমনির্ভর অর্থনীতির দেশ—বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পের কারণে। তাই আন্তর্জাতিক শ্রম মান (labour standards) অনুসরণ এবং শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা দেশের উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আন্তর্জাতিক শ্রম আইন মূলত International Labour Organization (ILO) প্রণীত কনভেনশন ও নীতিমালার মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। এগুলোর মধ্যে রয়েছে—শ্রমিকের সংগঠন করার অধিকার,জোরপূর্বক শ্রম নিষিদ্ধকরণ, শিশুশ্রম বন্ধ,
বৈষম্যহীন কর্মসংস্থান, নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিতকরণ প্রভৃতি।বাংলাদেশ এসব মানদণ্ড অনুসরণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং বহু কনভেনশন অনুমোদন করেছে।
বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক শ্রম আইন অনুসরণের বাস্তব চিত্রের দিকে যদি আমরা দৃষ্টি দিই তাহলে কিছু বিষয় আমাদের নজরে আসে।
১. আইনি কাঠামোঃ বাংলাদেশের শ্রম ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬, যা সময়ের সাথে সংশোধিত হয়েছে (যেমন ২০১৮ ও ২০২৫ সংশোধন)। এই আইন শ্রমিকের নিরাপত্তা, মজুরি, কর্মঘণ্টা, ছুটি ইত্যাদি নির্ধারণ করে। এছাড়া আইন প্রণয়ন ও সংশোধনে ILO-এর মানদণ্ড বিবেচনা করা হয়।
২. আন্তর্জাতিকভাবে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতিঃ বাংলাদেশ ILO-এর মোট ৩৬টি কনভেনশন অনুমোদন করেছে, যার মধ্যে ১০টি মৌলিক কনভেনশনের ৮টি অন্তর্ভুক্ত। এটি দেখায় যে, কাগজে-কলমে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক শ্রম আইনের সঙ্গে যথেষ্ট সামঞ্জস্য রক্ষা করতে আন্তরিক।
৩. প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রয়োগের সীমাবদ্ধতাঃ আইন প্রয়োগে দুর্বলতার কারণে অনেক কারখানায় নিয়ম ঠিকভাবে মানা হয় না। পর্যাপ্ত তদারকির অভাব অর্থাৎ শ্রম পরিদর্শকের সংখ্যা একেবারেই অপ্রতুল। শ্রমিকের সচেতনতার ঘাটতি প্রকট। অনেক শ্রমিক নিজের অধিকার সম্পর্কে জানে না। এ ছাড়া অনেক কারখানায় বা সংস্থায় ট্রেড ইউনিয়ন গঠনে বাধা দেয়া হয়। অর্থাৎ, আইন থাকলেও বাস্তব প্রয়োগ এখনও চ্যালেঞ্জপূর্ণ।
৪. শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও বাস্তবতাঃ এ বিষয়টিকে কয়েকটি পয়েন্টে আলোচনা করা যায় –
(ক) ন্যায্য মজুরিঃ
ন্যায্য মজুরি বলতে বোঝায় এমন আয়—
যা দিয়ে একজন শ্রমিক ও তার পরিবার স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে বা খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ইত্যাদি মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারে।
(খ) বাংলাদেশে মজুরির অবস্থাঃ
বাংলাদেশে অনেক খাতে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারিত থাকলেও তা প্রায়ই জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় কম। বিশেষ করে—পোশাক খাতে মজুরি তুলনামূলক কম, অনানুষ্ঠানিক খাতে (informal sector) শ্রমিকদের কোনো নির্দিষ্ট মজুরি কাঠামো নেই। দৈনিক মজুরির শ্রমিকরা অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকে। কোনো কোনো ক্ষেত্র ন্যূনতম মজুরি এত কম নির্ধারণ করা হয়েছে, যাকে এক প্রকার অমানবিক বলা চলে। চা শ্রমিকদের মজুরি এ ক্ষেত্রে একটি বড় উদাহরণ।
(গ) বাস্তব সমস্যাঃ
জীবনযাত্রার ব্যয় যে হারে বৃদ্ধি পায় – মজুরি সেই অনুপাতে বাড়ে না। অতিরিক্ত কাজ (overtime) – অনেক সময় বাধ্য হয়ে করতে হয়।
নারী ও পুরুষের মধ্যে মজুরি বৈষম্য দেখা যায়।
সময়মতো মজুরি না পাওয়া বা না দেওয়া অন্যতম বাস্তবতা। অনেক ক্ষেত্রে মালিক পক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে মজুরি পরিশোধ করতে দেরী করে যাতে শ্রমিক অন্য কোথাও চাকরি করতে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত হন।
(ঘ) ইতিবাচক অগ্রগতিঃ
বাংলাদেশে কিছু ইতিবাচক অগ্রগতিও হয়েছে—
তৈরি পোশাক খাতে নিরাপত্তা মান অনেক উন্নত হয়েছে (বিশেষ করে রানা প্লাজার দূর্ঘটনার পর)।
শ্রম আইন নিয়মিত আপডেট করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বাজারের চাপের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান শ্রম মান উন্নত করছে।
(ঙ) চ্যালেঞ্জ ও করণীয়ঃ প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো হলো-
আইন প্রয়োগের দুর্বলতা, শ্রমিক সংগঠনের সীমাবদ্ধতা, মজুরি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের ব্যবধান।
এক্ষেত্রে প্রধান করণীয়সমূহের কয়েকটি হলো–
(১) শ্রম আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
(২) শ্রমিকদের সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।
(৩) ন্যূনতম মজুরি নিয়মিত সমন্বয় করতে হবে।
(৪)ট্রেড ইউনিয়ন করার এবং কার্যক্রম পরিচালনার স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।
(৫) শ্রম পরিদর্শন ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে।
বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক শ্রম আইন অনেকাংশে গ্রহণ করেছে এবং আইনি কাঠামোও উন্নত করতে সচেষ্ট আছে। তবে বাস্তব প্রয়োগে এখনও ঘাটতি রয়েছে। পাশাপাশি, অনেক শ্রমিক এখনও প্রকৃত অর্থে ‘ন্যায্য মজুরি’ পাচ্ছে না—বিশেষ করে নিম্ন আয়ের শ্রম বাজারে ও অনানুষ্ঠানিক খাতে।
সুতরাং বলা যায়—বাংলাদেশ আইনি দিক থেকে এগিয়ে, কিন্তু বাস্তব প্রয়োগে এর সামনে এখনও অনেক পথ বাকি।
লেখক: শিক্ষাব্রতী, প্রাবন্ধিক ও সাব এডিটর- দৈনিক পুর্বকাল।


