ডা. কিউ এম অহিদুল আলম : ১৯৮৯ সালে ধাক্কা ছাড়াই কমিউনিস্ট ব্লক ও রুশ দেশের পতন হলেও ৭২ বছরে একটি কৃষিপ্রধান অনুন্নত জাতি কিভাবে শিল্পায়িত ও বিশ্বের পরাশক্তিতে পরিণত হল সেই ইতিহাসের ভিত্তি রচিত হয়েছিল লেনিন-স্টালিনের দৃঢ় সমাজতান্ত্রিক নেতৃত্বের ফলে। দূরের যুদ্ধ আজকে আমাদের ঘরে (বাংলাদেশে) যে সমস্যার সৃষ্টি করেছে তার কারণ জ্বালানী সরবরাহে বিঘ্ন। জ্বালানী দরকার বিদ্যুৎ, শিল্প, ব্যবসা বাণিজ্য জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে জ্বালানীর জন্য আমরা রাষ্ট্রীয় ভাবে কি করেছি, কি করি নাই তা বোঝার আগে লেনিনের একটা স্মরণীয় উক্তি আজকের ধনবাদী বা মিশ্র অর্থনীতির সমাজেও প্রাসঙ্গিক। লেনিন বলেছিলেন, সভ্যতা মানে- বিদ্যুতায়ন, শিল্পায়ন ও শিক্ষা বিস্তার।
লেনিন মনে করতেন রাশিয়ার মত কৃষিপ্রধান ও পাশ্চত্যের তুলনায় অনুন্নত দেশকে (১৯১৭) উন্নত করতে হলে দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ায়ে শিল্পে বিনিয়োগ করতে হবে। এঙঊখজঙ পরিকল্পনার মাধ্যমে পাঁচ বছরে গোটা রাশিয়াকে তিনি বিদ্যুতায়ন করেন। তৎকালীন তিনজন প্রকৌশলী পুরো প্রকল্প বাস্তবায়ন করেন। আমাদের দেশে গ্যাস এর ব্যবহারের অব্যবহিত পরপরই অর্থাৎ ১৯৮০-৯০ এর দশকেই ভয় করা হচ্ছিল যে গ্যাস হয়ত ১৫-২০ বছরে শেষ হয়ে যাবে। বিশ্বব্যাপী সেই ৮০-৯০ এর দশক থেকেই বিকল্প জ্বালানীর চেষ্টা চলছে। কয়লা ও জ্বালানীর বিকল্প বা জবহবধিনষব ঊবত্যুর জন্য বিশ্বের সচেতন দেশগুলো তখন থেকেই বিনিয়োগ করছে। দেখা যাক বিকল্প এনার্জির ব্যবহারে কোন দেশ কি অবস্থানে।
বাংলাদেশের সামগ্রিক জ্বালানী চাহিদার প্রায় ৪০%- ৫৬% আসে গ্যাস থেকে। এটা না হলে বিদ্যুতের যে অবস্থা আমরা আফ্রিকার সাহারার মত হাড্ডিসার দেশ হতাম। বর্তমানে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় তরল গ্যাস ও আমদানী নির্ভরতা বেড়েছে। ২০২০ সাল নাগাদ সৌরশক্তি ও নবায়ন যোগ্য বিদ্যুতের ব্যবহার দেশের মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের ১০% লক্ষ্য নির্ধারণ হয়। কিন্তু আমরা নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের ব্যবহারে এখনো মোট জ্বালানীর ৩.৪%- ৪% এর মধ্যে আটকা আছি। দুঃখজনক হল, নবায়নযোগ্য জ্বালানী সৌর বিদ্যুৎ ও বায়ুবিদ্যুৎ, ছোট জলবিদ্যুতের দিকে না গিয়ে আমরা অদ্ভূত রেন্টাল পদ্ধতি, আমদানী ইত্যাদিতে লিপ্ত ছিলাম। আবার গ্যাস এর নতুন কূপ, উত্তোলণ, সমুদ্রে গ্যাস, তেল অনুসন্ধানে বিনিয়োগও করিনি, চেষ্টাও করিনি। আমদানী নির্ভর বিদ্যুৎ ও জ্বালানী খাতে যা হবার তাই হচ্ছে। বিশেষত ইরান-আমেরিকার যুদ্ধ আমাদের এনার্জি ব্যবহার এর নগ্ন ও স্ব-বিধ্বংসী চিত্র অসহায় ভাবে ফুটে তুলেছে।
সম্ভাবনা: বর্তমানে আমাদের দেশে শিল্প ও অর্থনীতিতে জ্বালানী ও বিদ্যুতের দুরবস্থা সমস্ত সমস্যার মূল। উৎপাদন কম, রপ্তানী কম, অর্ডার অন্য দেশে যাচ্ছে, বেকারত্ব ইত্যাদি। অথচ বিকল্প নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার আমাদেরকে প্রকৃতিই দিয়েছে। সৌরশক্তির সম্ভাবনা সীমাহীন। বায়ু-বিদ্যুৎ থেকে পুরো উপকূলীয় অঞ্চলে বিদ্যুৎ উৎপাদন হতে পারে। সমুদ্রে ও সমতলে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের অপার সুযোগ ছিল।
২০২৫ সালে বৃটেনের বিদ্যুতের প্রায় ৫১-৬৬% নবায়ণ যোগ্য বায়ু, সৌর, জলবিদ্যুৎ এবং পারমানবিক থেকে এসেছে। শুধু সৌর বিদ্যুৎ মোট বিদ্যুত উৎপাদনের মোট ৪৪-৪৭%। জার্মানীতে ২০২৫ সালে নবায়নযোগ্য বায়ু, সৌর, জলবিদ্যুৎ ও বায়োমাস থেকে এসেছে ৬০% বিদ্যুৎ। বায়ু বিদ্যুৎ হচ্ছে সবচেয়ে পরিবেশবান্ধব উৎস। ২০২৫ সালে জার্মানীর বিদ্যুতের ৪৫% এসেছে সৌর থেকে। আমাদের প্রতিবেশী ভারতে মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ৯- ১৪% ২০২৫ সালে এসেছে সৌর বিদ্যুত থেকে। পাকিস্তানে ২০২৫ সালে ২৫% বিদ্যুৎ এসেছে সৌর
শক্তি থেকে। উপরের আলোচনা থেকে সুস্পষ্ট যে আমাদের প্রকৌশলী, নীতি নির্ধারকরা সহজলভ্য সৌর বিদ্যুৎ, বায়োমাস ও জলবিদ্যুৎ থেকে উৎপাদনের না গিয়ে স্থানীয় বিশেষ গোষ্ঠীর আর্থিক মুনাফার জন্য রেন্টাল এবং বিদ্যুত, কয়লা আমদানীতে সব অর্থ ও শ্রম দিয়েছে। ইউরোপের জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র গুলো না আমাদের কাপ্তাই, না পাকিস্তানের মংলা ড্যাম এর মত বৃহৎ। ছোট ছোট খালে বাধ দিয়ে ড্যাম সৃষ্টি করে সেই পানি মেশিনের সাহায্যে উচ্চ স্থান থেকে টারবাইনে ফেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। সেই বিদ্যুৎ গুলো দু’চার দশটা গ্রামের জন্য যথেষ্ট। কয়েকটিদন আগে ঢাকার ব্যবসায়ীরা বলেছেন- গার্মেন্টস ক্রেতারা যেহেতু দেখছেন বিদ্যুৎ, গ্যাস এর সুরাহার সম্ভাবনা দু-তিন মাসে হবে না- তারা অর্ডার অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছে। পুরো দেশ বিদ্যুৎ এর কারণে অচল। জ্বালানী আমদানীতে যদি সব রেমিটেন্স চলে যায়, দেশের অন্যান্য কর্মকান্ড চলবে কীভাবে? পাকিস্তানের প্রয়াত নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো বলেছিলেন- যদি পুরো জাতিকে ঘাস খেয়ে থাকতে হয়, তাই খাব, তবুও পারমানবিক বোমা বানাব। আমাদের দেশের জন্য সৌর, বায়ু, জলবিদ্যুৎ ও বায়োমাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিনিয়োগ করা ছাড়া ভবিষ্যতে বলতে কিচ্ছু নাই সরকারের এক নম্বর প্রায়োরিটি হওয়া উচিৎ এই নবায়নযোগ্য শক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন। লেখক- বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, কলামিস্ট।


