নিজস্ব প্রতিবেদক : চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনাল বিদেশি অপারেটরের কাছে হস্তান্তর করা হলে তা জনগণের প্রত্যাশা ও বিশ্বাসের পরিপন্থী হবে বলে মন্তব্য করেছে বৃহত্তর জাতীয় শ্রমিক জোট শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ) চট্টগ্রাম।
সংগঠনটির নেতারা বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অতীতে এনসিটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়ার বিরোধিতা করেছিলেন। এখন তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকার যদি সেই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করে, তাহলে দেশের শ্রমিক-কর্মচারী ও সাধারণ মানুষ গভীরভাবে হতাশ হবে।
বুধবার (১০ জুন) দুপুরে চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ চত্বরে আয়োজিত সমাবেশ ও মিছিল শেষে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছে দেওয়া এক স্মারকলিপিতে এসব কথা তুলে ধরে স্কপ। এতে চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি, সিসিটি, জিসিবিসহ কোনো টার্মিনাল বিদেশি অপারেটরের নিয়ন্ত্রণে না দেওয়ার বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট ঘোষণা দাবি করা হয়।
স্মারকলিপিতে বলা হয়, দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম জাতীয় অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। দেশের প্রায় ৯২ শতাংশ আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম এ বন্দরের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। ফলে এটি কেবল একটি বাণিজ্যিক স্থাপনা নয়, বরং জাতীয় অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, কৌশলগত স্বার্থ এবং সার্বভৌমত্বের অন্যতম ভিত্তি।
স্কপ নেতারা দাবি করেন, বিভিন্ন সূত্রে বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনালগুলো বিদেশি অপারেটরের কাছে হস্তান্তরের উদ্যোগ পুনরায় সক্রিয় হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। তারা বলেন, এনসিটি, সিসিটি ও জিসিবি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়া হলে তা জাতীয় স্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হবে এবং জনগণের মধ্যে উদ্বেগ আরও বাড়বে।
স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়, ২০০৭ সালে আংশিক এবং ২০১৫ সালে পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হওয়া এনসিটি বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে বেশি রাজস্ব আয়ের উৎস। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাসে এনসিটিতে ১ লাখ ২৬ হাজার ৪৯৬ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে, যা টার্মিনালটির ইতিহাসে এক মাসের সর্বোচ্চ রেকর্ড। এর মধ্যে আমদানি ছিল ৫৯ হাজার ৮৫১ টিইইউ এবং রপ্তানি ৬৬ হাজার ৬৪৫ টিইইউ। এর আগে ২০২৫ সালের অক্টোবরে ১ লাখ ২৫ হাজার ৫৩৩ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের রেকর্ড হয়েছিল।
নেতারা বলেন, এসব তথ্য প্রমাণ করে যে দেশীয় জনবল, দক্ষতা ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এনসিটি সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে। একইভাবে সিসিটিও দীর্ঘদিন ধরে দেশীয় ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয়ে আসছে। তাই বিদেশি কোম্পানি ছাড়া বন্দর পরিচালনা সম্ভব নয়, এমন দাবি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তারা আরও বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর একটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এবং কেপিআই-১ হিসেবে স্বীকৃত। একই এলাকায় নৌবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের স্থাপনা এবং শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর অবস্থিত। ফলে বন্দরের নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
স্কপের ৬ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে, এনসিটি, সিসিটি ও জিসিবিসহ কোনো টার্মিনাল বিদেশি অপারেটরকে হস্তান্তরের উদ্যোগ বন্ধ করা, ডিপি ওয়ার্ল্ড বা অন্য বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চলমান আলোচনা বাতিল, দেশীয় সক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন বৃদ্ধি, শ্রমিক-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলা প্রত্যাহার, শ্রমিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক এবং বন্দর বিদেশি নিয়ন্ত্রণে দেওয়া হবে না মর্মে সরকারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা।
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন স্কপের যুগ্ম সমন্বয়কারী এস কে খোদা তোতন এবং সঞ্চালনা করেন ইফতেখার কামাল খান। এতে তপন দত্ত, কাজী শেখ নুরুল্লাহ বাহার, খোরশেদ আলম, কে এম শহিদুল্লাহ, নুরুল আবছার তৌহিদ, হেলাল উদ্দিন কবির, মো. হারুন ও তসলিম হোসেন সেলিমসহ বিভিন্ন শ্রমিক নেতা বক্তব্য দেন। পরে একটি মিছিল নিয়ে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি জমা দেন তারা।


