নিজস্ব প্রতিবেদক: মায়ের মৃত্যুর শোক এখনো কাটেনি। এরই মধ্যে আত্মহত্যার প্ররোচনার মামলায় বাবা, দাদি ও ফুফুকে কারাগারে পাঠানোর আদালতের আদেশে তাদের সঙ্গেই জেল হাজতে যেতে হচ্ছে আড়াই বছরের এক শিশু ও মাত্র সাত মাস বয়সী এক কন্যাশিশুকে।
চন্দনাইশে যৌতুকের দাবিতে গৃহবধূ আয়শা ছিদ্দিকা মুক্তার আত্মহত্যার প্ররোচনার মামলার এ ঘটনায় আদালত প্রাঙ্গণে তৈরি হয় এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি। একইসঙ্গে মানবিক বিবেচনায় দুই শিশুর পরিচর্যা নিয়ে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ।
চন্দনাইশে যৌতুকের দাবিতে গৃহবধূ আয়শা ছিদ্দিকা মুক্তা’র (২১) আত্মহত্যার প্ররোচনার মামলায় স্বামী, শাশুড়ি ও ননদকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। একইসঙ্গে তাদের হেফাজতে থাকা মুক্তার দুই অবুঝ সন্তানকেও কারাগারে যেতে হচ্ছে।
বুধবার (১ জুলাই) চট্টগ্রাম জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল হান্নানের আদালতে মামলার তিন আসামি আত্মসমর্পণ করে জামিন আবেদন করেন। শুনানি শেষে আদালত জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাদের জেল হাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
কারাগারে যাওয়া আসামিরা হলেন-মৃত মুক্তা’র স্বামী আরিফুল ইসলাম জিফাত (২৯), শাশুড়ি মোছাম্মৎ মনোয়ারা বেগম (৪৫) এবং ননদ মোছা. নাদিয়া আক্তার (৩২)। তাদের সঙ্গে কারাগারে যেতে হয়েছে মুক্তার দুই সন্তান আড়াই বছরের ছেলে আরাফ এবং সাত মাস বয়সী কন্যা জাইফা ইসলামকে। আদালত প্রাঙ্গণে শিশু দুটিকে নিয়ে পুলিশ হাজতখানার দিকে যাওয়ার সময় উপস্থিত অনেকে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর দৌলা রানা বলেন, যৌতুকের জন্য গৃহবধূ আয়শা ছিদ্দিকা মুক্তার আত্মহত্যার প্ররোচনার মামলায় স্বামী, শাশুড়ি ও ননদকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। একইসঙ্গে সাত মাসের শিশুকন্যাকেও তাদের সঙ্গে কারাগারে যেতে হয়েছে।
আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ফোরকান মোহাম্মদ বলেন, মানবিক দিক বিবেচনায় তিন আসামির জামিন চাওয়া হয়েছিল। কারণ, ভিকটিমের দুই নাবালক সন্তান বর্তমানে আসামিদের হেফাজতেই রয়েছে। শিশু দুটির দেখাশোনা করার মতো অন্য কেউ না থাকায় আদালতের কাছে জামিন প্রার্থনা করা হয়। তবে শুনানি শেষে আদালত জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তিন আসামিকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
তিনি আরও বলেন, মায়ের মৃত্যুর পর বাবা, দাদি ও ফুফু শিশু দুটিকে লালন-পালন করে আসছিলেন। বর্তমানে তাদের দেখভাল করার মতো আর কেউ না থাকায় দাদি ও ফুফুর সঙ্গে সাত মাসের জাইফা ও আড়াই বছরের আরাফকেও কারাগারে যেতে হচ্ছে। বর্তমানে দুই শিশুসহ তিন আসামি চট্টগ্রাম জেলা হাজতখানায় রয়েছে।
মামলার নথি থেকে জানা যায়, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি চন্দনাইশ পৌরসভার হাজিপাড়া এলাকায় নিজ শয়নকক্ষে গলায় ওড়না পেঁচানো অবস্থায় আয়শা ছিদ্দিকা মুক্তার লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় তার বাবা মো. মনির আহমদ বাদী হয়ে চন্দনাইশ থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করেন। মামলার তদন্তভার পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
তদন্ত শেষে গত ৬ মে আদালতে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে পিবিআই উল্লেখ করে, মুক্তাকে সরাসরি হত্যা করা হয়নি। তবে স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনের ধারাবাহিক মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন এবং যৌতুকের দাবির কারণে তিনি আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন বলে প্রাথমিকভাবে সত্যতা পাওয়া গেছে। এ কারণে আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০৬ ধারায় আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগ আনা হয়।
মামলার নথিতে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০২৩ সালের ২৭ এপ্রিল আরিফুল ইসলাম জিফাতের সঙ্গে মুক্তার বিয়ে হয়। বিয়ের সময় নগদ দুই লাখ টাকা এবং আসবাবপত্রসহ প্রায় ১৩ লাখ টাকার মালামাল দেওয়া হয়। কিন্তু বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই জিফাত ব্যবসার জন্য আরও পাঁচ লাখ টাকা এবং ঈদ উপলক্ষে দামি উপহার দাবি করে মুক্তার ওপর নির্যাতন শুরু করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তদন্তে আরও উঠে আসে, ঘটনার চার দিন আগে, অর্থাৎ ২৫ ফেব্রুয়ারি, মুক্তা তার বাবাকে ফোন করে কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, যৌতুকের টাকা না দিলে তাকে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এর তিন দিন পর নিজ ঘর থেকে তার ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে মৃত্যুর কারণ হিসেবে শ্বাসরোধে আত্মহত্যা উল্লেখ করা হয়েছে।


