উত্তম কুমার আচার্য্য : প্রতি বছর ৩ জুলাই বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক প্লাস্টিক ব্যাগমুক্ত দিবস (International Plastic Bag Free Day) পালিত হয়। দিবসটির মূল উদ্দেশ্য হলো একবার ব্যবহারযোগ্য (Single-use) প্লাস্টিক ব্যাগের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং পরিবেশবান্ধব বিকল্প ব্যবহারে মানুষকে উৎসাহিত করা। আধুনিক জীবনে প্লাস্টিক ব্যাগ অত্যন্ত সহজলভ্য ও সস্তা হলেও এর পরিবেশগত ক্ষতি সুদূরপ্রসারী। তাই পৃথিবীকে বাসযোগ্য রাখতে প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো আজ সময়ের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
আন্তর্জাতিক প্লাস্টিক ব্যাগমুক্ত দিবস পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর উদ্যোগে শুরু হয়। পরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ, পরিবেশ আন্দোলন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, নাগরিক সংগঠন এবং সরকারি-বেসরকারি সংস্থা দিবসটি পালন করতে শুরু করে। বর্তমানে এটি বৈশ্বিক পরিবেশ আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
প্লাস্টিক ব্যাগ কেন ক্ষতিকর?
প্লাস্টিক ব্যাগের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এটি সহজে পচে না। একটি প্লাস্টিক ব্যাগ সম্পূর্ণভাবে মাটির সঙ্গে মিশে যেতে কয়েকশ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। এর ফলে—
মাটি ও পানির দূষণ বৃদ্ধি পায়।
নদী-নালা ও ড্রেন বন্ধ হয়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়।
গবাদিপশু ও বন্যপ্রাণী প্লাস্টিক খেয়ে অসুস্থ বা মারা যায়।
সমুদ্রে প্লাস্টিক জমে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ে।
সূক্ষ্ম প্লাস্টিক কণা (মাইক্রোপ্লাস্টিক) খাদ্য, পানি ও বাতাসের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে, যা ভবিষ্যতে নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গেও এর সম্পর্ক নিবিড়।
প্লাস্টিক মূলত জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে তৈরি হয়। এর উৎপাদন, পরিবহন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রতিটি ধাপে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হয়। ফলে প্লাস্টিক দূষণ শুধু পরিবেশ নয়, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনেরও একটি কারণ।
বাংলাদেশের প্রেক্ষিতের যদি দৃষ্টি দিই, তাহলে দেখতে পাই- বাংলাদেশ বিশ্বের প্রথম দিকের দেশগুলোর একটি, যারা পাতলা পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছিল। তবুও বাস্তবে বিভিন্ন বাজার ও দোকানে এখনো প্লাস্টিক ব্যাগের ব্যাপক ব্যবহার দেখা যায়। শহরের ড্রেন, খাল ও নদীতে প্লাস্টিক জমে জলাবদ্ধতা ও পরিবেশ দূষণ সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে বর্ষাকালে এর প্রভাব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতার অন্যতম প্রধান কারণ হলো নগরীর অভ্যন্তরে প্রবাহিত খাল – নালাগুলোতে প্লাস্টিক ব্যাগ নিক্ষেপ করা। প্লাস্টিক বর্জ্যের কারণে কর্ণফুলি নদীর তলদেশে পুরু প্লাস্টিক বর্জ্যের আস্তরন তৈরি হয়েছে যা নদীর নাব্যতাকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে বন্দরকে হুমকীর মুখে ঠেলে দিচ্ছে। প্লাস্টিকের কারণে ড্রেজিং কার্যক্রম চালাতেও হিমসিম খেতে হচ্ছে।
প্লাস্টিক দূষণ কমাতে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র—সবার সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। কিছু উদ্যোগ এ দূষণ উল্রেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে, যেমন—
(১) বাজারে গেলে কাপড়, পাট বা পুনর্ব্যবহারযোগ্য ব্যাগ ব্যবহার করা।
(২) একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক এড়িয়ে চলা।
(৩) প্লাস্টিক বর্জ্য আলাদা করে সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত করা।
(৪) পরিবেশবান্ধব পণ্য উৎপাদনে শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে উৎসাহিত ও প্রণোদিত করা।
(৫) স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিবেশ শিক্ষা জোরদার করা।
(৬) বিদ্যমান আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা।
আন্তর্জাতিক প্লাস্টিক ব্যাগমুক্ত দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে পরিবেশ রক্ষা কেবল সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক কর্তব্য। একটি ছোট অভ্যাস—যেমন নিজের সঙ্গে একটি কাপড়ের ব্যাগ বহন করা—দীর্ঘমেয়াদে বিশাল ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।
পৃথিবী আমাদের একমাত্র বাসস্থান। আজকের অসচেতনতা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ভয়াবহ পরিবেশগত সংকট ডেকে আনতে পারে। তাই আন্তর্জাতিক প্লাস্টিক ব্যাগমুক্ত দিবস কেবল একটি আনুষ্ঠানিক পালন নয়; এটি একটি অঙ্গীকার—প্লাস্টিকের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার কমিয়ে পরিচ্ছন্ন, সবুজ ও টেকসই পৃথিবী গড়ে তোলার অঙ্গীকার। ব্যক্তি, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং সরকার—সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায়ই প্লাস্টিক দূষণমুক্ত বাংলাদেশ এবং একটি সুস্থ পৃথিবী গড়ে তোলা সম্ভব।
লেখক : সভাপতি – ইকো ফ্রেন্ডস, এডিটর – বরুমতির বাঁকে ও সাব এডিটর – দৈনিক পূর্বকাল।


