নিজস্ব প্রতিবেদক: পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্মাণাধীন ২১টি স্লুইসগেটের প্রকল্পটি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) কাছে হস্তান্তর করা হবে বলে জানিয়েছেন পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ।সোমবার (১৩ জুলাই) দুপুরে চসিক কার্যালয়ে নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে অগ্রগতি এবং প্রকল্পটি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর বিষয়ে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় তিনি এ কথা বলেন।প্রতিমন্ত্রী জানান, প্রকল্পটি হস্তান্তরের জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং চসিকের মধ্যে একটি ত্রিপক্ষীয় সমঝোতা চুক্তি হবে। প্রকল্পটি যাতে চসিক ঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারে সেজন্য চসিকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী বলেন, রেকর্ড বৃষ্টিতে চট্টগ্রামের কোন কোন স্থানে জলাবদ্ধতা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এই ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলায় করণীয় নির্ধারণে আমরা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট পরিদর্শন করেছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চট্টগ্রামের রেকর্ড বৃষ্টিপাতের বিষয়ে অবগত আছেন এবং সেজন্যই উনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন যে এখানে স্লুইসগেট নির্মাণের যে প্রজেক্টটি শেষের পর্যায়ে আছে এই প্রজেক্ট যেন কোন কারণে ব্যাহত না হয় এবং চট্টগ্রামের মানুষ কোনোভাবেই যেন ভবিষ্যতে জলবদ্ধতার সম্মুখীন না হয়।এইভাবে যদি আমাদের রেকর্ড বৃষ্টিপাতও হয় সেখানে দ্রুততার সঙ্গে যেন সেই পানি নিষ্কাশন হয় সেই বিষয়টা মাথায় রেখেই উনি এই প্রজেক্টটা আমাদের সমাপন করার নির্দেশ দিয়েছেন।তিনি বলেন, প্রকল্পটি আমরা সিটি করপোরেশনকে হস্তান্তর করব।
প্রকল্পটি হস্তান্তরের বিষয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং চসিকের মধ্যে সমঝোতা চুক্তি হবে। আমি সিটি করপোরেশনের মেয়র মহোদয়কে অনুরোধ করেছি এক বছর যেহেতু আমাদের এই প্রকল্পের মেয়াদ আছে, এই এক বছরের মধ্যে এই প্রকল্প পরিচালনার জন্য চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ দিতে হবে। আমরা চাই প্রকল্পটি যেন চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই স্লুইসগেটগুলো পুরোপুরি সচল হলে জলাবদ্ধতা অনেকাংশে কমে আসবে বলে আশা করছি।
সভাপতির বক্তব্যে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের প্রায় ৬০-৭০ শতাংশ কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। তবে কাতালগঞ্জ, বহদ্দারহাট, চকবাজার, হিজড়া খাল ও বামনশাহী খালের বিভিন্ন অংশের কাজসহ প্রায় ৩০ শতাংশ কাজ বাকি থাকায় কিছু এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। তিনি বলেন, বাকি কাজ দ্রুত সম্পন্ন হলে নগরবাসী প্রকল্পটির পূর্ণ সুফল ভোগ করতে পারবেন।মেয়র বলেন, জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। নগরীতে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার ২০০ মেট্রিক টন বর্জ্য উৎপন্ন হলেও এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার মেট্রিক টন বর্জ্য ড্রেন ও খালে পড়ছে, যা পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা মারাত্মক ব্যাহত করছে। এ সমস্যা সমাধানে নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি, বর্জ্য সংগ্রহ কার্যক্রমের আওতা বৃদ্ধি এবং খাল-ড্রেনে বর্জ্য ফেলা বন্ধে সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণের ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
মেয়র বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসন ব্যবস্থা আরও কার্যকর, আধুনিক ও টেকসই করতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের অধীনে একটি স্বতন্ত্র ‘ওয়াটার লগিং ডিপার্টমেন্ট’ গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। এই বিভাগ রেগুলেটর, পাম্প, ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক ও খালগুলোর সার্বক্ষণিক তদারকি এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় দায়িত্ব পালন করবে।
মেয়র জানান, সাম্প্রতিক অতিবৃষ্টি ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সহায়তায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ইতোমধ্যে ৭ হাজার প্যাকেট খাদ্য সহায়তা বিতরণ করেছে এবং ভবিষ্যতেও যেকোনো দুর্যোগে নগরবাসীর পাশে থাকবে।
চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী-চান্দগাঁও) আসনের সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ বলেন, স্লুইসগেটগুলোর মাপ পানি অপসারণের উপযোগী কী না তা যাচাই করতে হবে। এগুলো বড় করা দরকার নাকি ছোট করা দরকার নাকি ঠিকভাবে আছে সে বিষয়ে সঠিকভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। যেহেতু স্লুইসগেটের পরিকল্পনাটি পূর্ববর্তী সরকারের এ কারণে সেসময় প্রকল্পের ডিজাইন ত্রুটিপূর্ণ কিনা তা যাচাই করা যেতে পারে। যদি এমন হয় যে স্লুইসগেট করলাম কিন্তু পানি সরানোর ক্যাপাসিটি নেই তাহলে জনগণ সুফল পাবে না। এবারের রেকর্ড বৃষ্টি আমাদের একটা শিক্ষা দিয়েছে। এই শিক্ষা থেকে আমাদের ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি না হয় সেজন্য কাজ করতে হবে। এ ছাড়া, জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল-নালা পরিষ্কার করার কার্যক্রম আরো বেগবান করতে হবে। বর্তমানে কাউন্সিলর না থাকায় ওয়ার্ড পর্যায়ে পরিচ্ছন্ন কার্যক্রম যাতে ব্যাহত না হয় সেজন্য মনিটরিং বাড়াতে হবে।
চট্টগ্রাম-১০ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান বলেন, আমি এখানে বারুনিঘাট এবং ২৬ নম্বরে দুটো খাল দেখে আসলাম। ছড়া বলতে পারেন এবং নালা। দেখলাম সবকিছু ব্লক হয়ে আছে। এর পেছনে ১৬ নম্বর যে স্লুইসগেট। আমি ৩৪ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাহেবকে ওখান থেকে ফোন করে জানিয়েছি যে ওখানে স্লুইসগেট ছোটটাও বন্ধ, যেটা বড় তৈরি করা হয়েছে, অনেক বড় করে, অনেক খরচ করে, ওটাও বন্ধ এবং ওটার সাথে কোনো কানেকশন নাই সাগরের অথবা মহেশখালের। খুব পরিত্যক্ত। খুব দুঃখজনক। এই কারণগুলো আমাদের খুঁজে দেখতে হবে কেন হল এমন এবং আমাদের আজকে যে জলাবদ্ধতার সমস্যা সেটি সমাধানে এ ধরনের সমস্যাগুলো খুঁজে বের করে সমাধান করতে হবে।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. এ কে এম শাহাবুদ্দিন বলেন, চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধান করার জন্য আমাদের সবাই কাজ করছে। আমাদের এই প্রকল্পটি যেহেতু প্রায় ৯৫ শতাংশ কাজ শেষ। ৫ শতাংশ বাকি আছে। এটি আগামী জুনে শেষ হয়ে যাবে। আমরা যদি এখন থেকে এটার এক্সিট প্ল্যান না করি তাহলে এটা তো ফুল ইমপ্লিমেন্টেশনের সুফলটা আমরা আগামী বর্ষা মৌসুমে পাব না। এজন্য আমরা একটা এমওইউ ড্রাফট করে স্থানীয় সরকারের কাছে পাঠিয়ে দেব। এই এমওইউ চেক করতে ও অনুমোদন করতে দুই তিন মাস লাগতে পারে। যারা পাম্পগুলো নির্মাণ করেছে তারা বিনামূল্যে এগুলো পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় লোকবলকে প্রশিক্ষণ দেবে। এজন্য আমাদের দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে হবে।
সভায় চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন বলেন, দীর্ঘমেয়াদে রেগুলেটর, স্লুইসগেট ও সংশ্লিষ্ট ড্রেনেজ অবকাঠামোর কার্যকর পরিচালনা নিশ্চিত করতে এসব স্থাপনার দায়িত্ব চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের হাতে ন্যস্ত করা প্রয়োজন। তবে দায়িত্ব হস্তান্তরের আগে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এবং বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে চসিকের প্রকৌশলী ও সংশ্লিষ্ট জনবলকে প্রয়োজনীয় কারিগরি প্রশিক্ষণ দিলে ভবিষ্যতে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ আরও দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধানে শুধু নতুন অবকাঠামো নির্মাণই যথেষ্ট নয়; বরং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ডিজিটাল মনিটরিং, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, দক্ষ জনবল এবং সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত কার্যক্রম নিশ্চিত করা গেলে প্রকল্পের কাঙ্ক্ষিত সুফল দীর্ঘমেয়াদে নগরবাসী পাবেন।
চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সেলিম মোহাম্মদ জানে আলম বলেন, স্লুইসগেটগুলো মেইনটেনেন্স করার জন্য আলাদা মেইনটেনেন্স টিম করতে হবে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে অথবা অন্য যেকোনো ডিপার্টমেন্টের মাধ্যমে এবং ডিজিটাল পদ্ধতিতে যেতে হবে যাতে মনিটরিং সিস্টেমে আমরা দেখতে পারি আবহাওয়ার অবস্থা কী এবং আমাদের সাগরে কখন জোয়ার-ভাটা হবে। একটা মনিটরিং সিস্টেমে আনতে হবে এবং একটা ডিপার্টমেন্ট থাকতে হবে যেটি এই তথ্যগুলো মনিটরিং করবে। ভবিষ্যতে ড্রেনগুলো বাৎসরিক মেনটেইনেন্সের আওতায় আনতে হবে। ড্রেন সবসময় সচল রাখতে হবে, পরিষ্কার রাখতে হবে।
সভায় উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সচিব মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) হোসাইন মোহাম্মদ কবির ভূঁইয়া, ৩৪ ইঞ্জিনিয়ারিং ব্রিগেডের জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ মহসিনুল হক চৌধুরী, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চিফ হাইড্রোগ্রাফার কমান্ডার মো. ওবায়দুর রহমান, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের পরিচালক আহমদ মঈনুদ্দিন, চট্টগ্রাম সিটি মেয়রের খাল ও জলাবদ্ধতা বিষয়ক উপদেষ্টা শাহরিয়ার খালেদ প্রমুখ।


