ক্রীড়া ডেস্ক: বিশ্বকাপের শিরোপা জয়ের স্বপ্ন এখন আর মাত্র দুই ধাপ দূরে। ৪৮ দলের লড়াই শেষে টুর্নামেন্টে টিকে আছে মাত্র চার দল।টানা তৃতীয়বারের মতো ফাইনালে উঠতে চায় কিলিয়ান এমবাপ্পের ফ্রান্স, আর ২০১০ সালের পর প্রথমবার বিশ্বকাপের ফাইনালে ফিরতে চায় বর্তমান ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেন।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) প্রথম সেমিফাইনালে বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় ডালাসে মুখোমুখি হবে ইউরোপের দুই পরাশক্তি স্পেন ও ফ্রান্স।ম্যাচের আগে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন স্পেনের তরুণ তারকা লামিন ইয়ামাল। ১৯তম জন্মদিন উদযাপনের একদিন পরই বিশ্বকাপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ খেলতে নামছেন বার্সেলোনার এই ফরোয়ার্ড। জন্মদিনে গলায় হীরার হার, পরিবারকে ঘিরে আলোচনা আর সামনে সেমিফাইনাল—সব মিলিয়ে আলোচনায় ছিলেন তিনি।
তবে ম্যাচের আগেই বিতর্কের জন্ম দেন স্পেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মারিয়ানো রাহয়। তিনি মন্তব্য করেন, ‘ফ্রান্স দুর্দান্ত দল হলেও সেখানে কোনো প্রকৃত ফরাসি খেলোয়াড় নেই।‘ অভিবাসী ও আফ্রিকান বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের নিয়ে করা এ মন্তব্যের জবাবে ইয়ামাল ফুটবলকে সম্প্রীতির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেন।
ডালাসে সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘ফুটবলের যদি কোনো উদ্দেশ্য থাকে, সেটি হলো মানুষকে একত্রিত করা। স্পেন ও ফ্রান্স—দুই দলই বহুসাংস্কৃতিক সমাজের উদাহরণ। অন্য কেউ কী বলেছেন, তা নিয়ে আমি কথা বলতে চাই না।’
ফ্রান্সকে ভয় পান কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ইয়ামাল বলেন, ‘না। আমরা ইউরোপের চ্যাম্পিয়ন। কোনো দলকেই ভয় পাই না।’
এর আগে সংবাদমাধ্যমে তিনি বলেছিলেন, ‘ফ্রান্সের যদি কাউকে ভয় পাওয়ার থাকে, তাহলে সেটা আমাদের। কারণ আমরা আগেও তাদের হারিয়েছি।’ পরে এ মন্তব্য নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হলে ইয়ামাল ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবেই তিনি এমন মন্তব্য করেছিলেন।
স্প্যানিশ এই তরুণ তারকা আরও বলেন, ‘এটি আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ। তবে ফুটবল ম্যাচের চেয়েও জীবনে কঠিন পরিস্থিতি আসে। তাই আমি কোনো চাপ অনুভব করছি না। বরাবরের মতো মাঠে নেমে দলের জন্য নিজের সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা করব।’
বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত মাত্র একটি গোল করলেও তা নিয়ে উদ্বিগ্ন নন ইয়ামাল। তার ভাষায়, ‘গোলের চেয়ে দলের জয়টাই গুরুত্বপূর্ণ। আশা করি আমরা আরও ম্যাচ খেলব এবং আমি আরও গোল করার সুযোগ পাব।’
বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন নিয়েও আত্মবিশ্বাসী স্প্যানিশ ফরোয়ার্ড। তিনি বলেন, ‘অবশ্যই আমি নিজেকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হিসেবে দেখি। আমরা যদি বিশ্বাস করি, তাহলে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব।’বিশ্বকাপে ইয়ামালের তিন বছর বয়সী ছোট ভাই কেইনও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে হাস্যরসের সুরে ইয়ামাল বলেন, ‘ও কিছুই বোঝে না। ক্যামেরা দেখলেই দুষ্টুমি শুরু করে। মানুষ ওকে ভালোবাসছে, এটা দেখে আমার ভালো লাগে।’
এদিকে ইয়ামালের আগের মন্তব্য নিয়ে ফ্রান্সের ডিফেন্ডার এবং বার্সেলোনায় তার সতীর্থ জুলস কুন্দে বলেন, তিনি এতে অসম্মানের কিছু দেখেননি।
কুন্দের ভাষায়, ‘আমি লামিনকে খুব ভালোভাবে চিনি। এটি তার আত্মবিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ মাত্র। বার্সেলোনায়ও ম্যাচের আগে ওরা এমন আত্মবিশ্বাস নিয়েই মাঠে নামে।’
স্পেনের শক্তি সম্পর্কে সতর্ক করে তিনি বলেন, ‘দুই দলই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলে এবং বলের দখল ধরে রাখতে চায়। স্পেনের বিপক্ষে ৯০ মিনিট বল ছেড়ে দিয়ে খেলা সম্ভব নয়।’
অন্যদিকে ফরাসি মিডফিল্ডার আন্দ্রে র্যাবিওট জানান, ইয়ামালকে থামানোর আলাদা কোনো পরিকল্পনা নেই তাদের। তিনি বলেন, ‘আমরা পুরো স্প্যানিশ দলকে নিয়েই পরিকল্পনা করছি। শুধু ইয়ামাল নয়, তাদের পুরো আক্রমণভাগ, বল নিয়ন্ত্রণ এবং ছোট জায়গায় পাসিং আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।’
বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে মূল্যবান সেমিফাইনাল হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে স্পেন-ফ্রান্সের এই লড়াই। দুই দলের খেলোয়াড়দের সম্মিলিত বাজারমূল্য প্রায় ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
এর মধ্যে ফ্রান্স দলের মোট বাজারমূল্য প্রায় ১ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলার, আর স্পেনের ১ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলার।
বর্তমান বিশ্বকাপের সবচেয়ে মূল্যবান খেলোয়াড় লামিন ইয়ামালের বাজারমূল্য প্রায় ২৩৪ মিলিয়ন ডলার। তার পরেই রয়েছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে (২১০ মিলিয়ন ডলার)। ফ্রান্সের মাইকেল অলিসে এবং স্পেনের পেদ্রি—দুজনেরই বাজারমূল্য প্রায় ১৭৫ মিলিয়ন ডলার।
এ ছাড়া দুই দলের স্কোয়াডে এমন ২২ জন খেলোয়াড় রয়েছেন, যাদের প্রত্যেকের বাজারমূল্য কমপক্ষে ৫৮ মিলিয়ন ডলার।
গোলকিপারদের বাজারমূল্যে স্পেন এগিয়ে। স্পেনের তিন গোলরক্ষকের সম্মিলিত বাজারমূল্য প্রায় ১১৪ মিলিয়ন ডলার, যেখানে ফ্রান্সের গোলকিপারদের মূল্য প্রায় ৬৭ মিলিয়ন ডলার।রক্ষণভাগে এগিয়ে ফ্রান্স। তাদের ডিফেন্ডারদের মোট বাজারমূল্য প্রায় ৪৭৩ মিলিয়ন ডলার, স্পেনের ৩৩৭ মিলিয়ন ডলারের বিপরীতে।
মিডফিল্ডে স্পেনের শক্তি বেশি। স্প্যানিশ মিডফিল্ডারদের সম্মিলিত বাজারমূল্য প্রায় ৪৯১ মিলিয়ন ডলার, যেখানে ফ্রান্সের ৩৬৫ মিলিয়ন ডলার।
তবে আক্রমণভাগে বড় ব্যবধানে এগিয়ে ফ্রান্স। তাদের ফরোয়ার্ড ও উইঙ্গারদের মোট বাজারমূল্য প্রায় ৮৭৭ মিলিয়ন ডলার, যা দুই দলের সবচেয়ে বড় পার্থক্য তৈরি করেছে।
হাইভোল্টেজ এই সেমিফাইনাল পরিচালনা করবেন এল সালভাদরের অভিজ্ঞ রেফারি ইভান বার্টন। ৪৪ বছর বয়সী এই রেফারি চলতি বিশ্বকাপে ইতোমধ্যে তিনটি ম্যাচ পরিচালনা করেছেন।
গ্রুপ পর্বে প্যারাগুয়ে-তুরস্ক ম্যাচে মুখ ঢেকে প্রতিপক্ষকে কথা বলার ঘটনায় মিগুয়েল আলমিরনকে সরাসরি লাল কার্ড দেখিয়ে আলোচনায় আসেন বার্টন। বিশ্বকাপে নতুন নিয়মে এটিই ছিল প্রথম লাল কার্ডের ঘটনা।
বার্টনের সহকারী হিসেবে থাকবেন ডেভিড মোরান ও আন্তোনিও পুপিরো। চতুর্থ কর্মকর্তা গ্লেন নাইবার্গ এবং রিজার্ভ রেফারির দায়িত্বে থাকবেন মাহবোদ বেগি।
সব মিলিয়ে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম আকর্ষণীয় ও ব্যয়বহুল এই সেমিফাইনালে একদিকে এমবাপ্পের অভিজ্ঞতা, অন্যদিকে ইয়ামালের দুর্দান্ত ফর্ম—দুই পরাশক্তির লড়াইয়ে ফুটবল বিশ্ব অপেক্ষা করছে নতুন এক ক্লাসিক ম্যাচের।


