বৃহস্পতিবার, জুলাই ১৬, ২০২৬
spot_img

সময়ের কথন : অপরাধের ভয়াবহ চিত্র

ডা. কিউ.এম. অহিদুল আলম : সৌদি আরবে উমরাহ পালনকালে এক আত্মীয়কে ইন্দোনেশীয় এক ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করেছিল – বাংলাদেশ কি সত্যিই মুসলিমপ্রধান দেশ? মুসলিম দেশ হলে এত হত্যা, চুরি, ঘুষ, অবিচার হয় কি ভাবে? একই প্রশ্ন অনেক দেশী মানুষেরও। পত্রিকা খুলে যে সব অপরাধ দেখা যায়- তা আমাদের পরিবেশে এক যুগ আগেও ছিল না। ইতিহাস থেকে আইয়ামে জাহেলিয়াত বা বর্বর যুগের যে অপরাধ চিত্র পাওয়া যায় বর্তমানে বাংলাদেশের অপরাধ তার থেকেও বেশী।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা জানায়, দেশে সংঘবদ্ধ অপরাধের প্রবনতা বাড়ছে এবং ক্রমেই তা ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। বিভিন্ন দেশের অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত বৈশ্বিক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশে অপরাধ সূচক বেড়েছে। এ ধরনের অপরাধ সাধারণতঃ শক্তিশালী চক্রের মাধ্যমে সংঘটিত হয়। এসব চক্র বড়ধরনের অপরাধ ঘটানোর জন্য নিজেদের পক্ষে বিশেষ পরিবেশ তৈরী করে কখনো অর্থ ঘাটায়ে, কখনো রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব ঘাটিয়ে, এক অপরাধীর বদলে অন্য জন সাজা খাটা ভয়া মামলায় গ্রেফতারী পরোয়ানা-এগুলো প্রতিরোধ করার উপায় ও জানা নাই। ২০২৬ সালের পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য মতে খুন, ডাকাতি, ছিনতাই, জিম্মি করে চাঁদা আদায়ের মতো অপরাধের হার ৬.১৬ শতাংশ বেড়েছে, রাজনৈতিক পরিবর্তন, আইনশৃংখলাবাহিনীর মধ্যে বিভিন্ন বাহিনীর থেকে অনৈতিক প্রভাব, অবৈধ অস্ত্রের সহজলভ্যতা অপরাধ বৃদ্ধির কয়েকটি কারণ। অপরাধের বিচিত্র ধরন আরো উদ্বেগের কারণ। হত্যার পর টুকরো করে ফেলা, শিশুদের আছাড় মেরে হত্যা, ফুটবল খেলা নিয়ে তর্কাতর্কি, জমি- জমা নিয়ে বিরোধ, বড় ভাই ছোট ভাই খুনাখুনি চাচা-ভাতিজা খুন, সম্পত্তির জন্য নিজ মা-বাবাকে হত্যা এসব পৃথিবীর অন্যকোন দেশে আছে কিনা বলা মুশকিল। সাইবার ক্রাইম এর সাথে নারীজনিত সহিংসতা ও অপরাধ এর ঘনিষ্ঠ যোগসূত্র রয়েছে। নারী সম্পর্কিত অপরাধ মোবাইল প্রযুক্তির অসদ্ব্যবহার এর সাথে সম্পর্কিত, মাদক, সোনা চালান, অর্থপাচার ইত্যাদি আবার সামাজের তথাকথিত উচ্চ বিত্তের মানুষের মাঝে ব্যাপৃত। সমাজ বিজ্ঞানীরা বলবেন নৈতিন অবক্ষয়, প্রশাসন বলবে জনবলের কমতি, ধর্মীয় নেতারা বলবেন ধর্মীয় অনুশাসন না মানা, সরকার বলবে বিরোধী দলের প্রচারনা, হয়তো সবই সত্যি। অপরাধ বৃদ্ধির মধ্যে সবচেয়ে উদ্বোগ জনক হল হত্যাকন্ড। সাম্প্রীতিক তিন মাসের পরিসংখ্যান থেকে বুঝা যায় যে, প্রতিদিন গড়ে ১০টি হত্যাকান্ড ঘটে। রিপোর্ট হয় না এসব পরিসংখ্যানে নিলে এক ভয়াবহ চিত্র আসে।


অপরাধ বৃদ্ধির কারণগুলোর মধ্যে কয়েকটা :

১) মাদকের ব্যবসা বিস্তার এবং অবৈধ অস্ত্রের সহজলভ্যতা। ২) একবার অপরাধ করে আইন এর ফাক ফোকরে ছাড়া পেয়ে পরবর্তীতে আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠা। ৩) অপহরণ বা অপহরন নাটক করে টাকা লাভ একটা ভাল আয় মনে করা হয়। ৪) রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড: যেন তেন প্রকারে প্রতিপক্ষকে পরাজিক করে প্রভাব ও ক্ষমতা বিস্তার এবং রাজনৈতিক ছত্র ছায়ায় প্রশ্রয় পাওয়া খুন-খারাবি বৃদ্ধির বড় কারন। ৫) কিশোর গ্যাং ও চাঁদাবাজি; অনেক পরিবারের সন্তানরা বাবার থেকে দেদার টাকা পেয়ে বন্ধু বান্ধবদের সাথে ছোট ছোট ক্রামই থেকে ফ্রাস্কেন স্টাইন এ পরিনত হয়। এরা অস্বাভাবিক জীবন যাপন করে। হাই স্পীডে অসময়ে গাড়ী চালানো, রেস্তোরায় হৈ চৈ ইত্যাদি এই সব অপরাদের উত্থান ক্ষেত্র। ৬) সাইবার ক্রাইম: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পরিচয় অবৈধ সম্পর্ক, পরকীয়া এই ধরনের অপরাধের চারণভূমি। আইনগত ক্রাইম ইনডেক্স ২০২৫ অনুযায়ী বিশ্বের ১৯৩টি দেশের মধ্যে ৫.৩০ স্কোর নিয়ে বাংলাদেশে ৮৩তম স্থানে আছে। ২০২৩ সালে আমরা ৮৯ তম স্থানে ছিলাম ৫.১২ স্কোর নিয়ে। তার মানে সংঘবদ্ধ অপরাধ বেড়েছে। আমাদের চেয়ে খারাপ দেশ গুলো সব আফ্রিকা ও দক্ষিন আমেরকিার মাদক বেল্টে। বাংলাদেশে অপরাধের বিচার পেতে সময় নির্ভর করে মামলার ধরন, সাক্ষ্য প্রমান, আদালতের ব্যস্ততা ইত্যাদির উপর চিবার প্রক্রিয়া কায়েক মাস থেকে ১০ ১৫ বছর বা তারও বেশি লাগতে পারে। আইনী জড়িলতা এবং উচ্চ আদালতে আপিল হলে মেয়াদ আরো দীর্ঘ হতে পারে। পৃথিবীর উন্নত ও সভ্য দেশগুলোতে অপরাধ নেই বলেলই চলে। যেমন-জাপান, ফিনল্যান্ড, নরওয়ে, সুইজারল্যান্ড, নেদারল্যান্ড ইত্যাদি। নেদারল্যান্ডে অপরাধীর সংখ্যা শূণ্যের কোঠায় পৌছাতে ২০১৩ সালে ১৯টি ও ২০১৫ সালে ৫টি কারাগার বন্ধ করে দেওয়া হয়। আমাদের দেশে কয়েদীতে উপচেপড়ার কারনে এশিয়ার বৃহত্তম কারাগার নির্মিত হয়েছে।
নেদারল্যান্ডে অপরাধীকে জেলে বসিয়ে জনগনের ট্যাক্সের টাকায় বসায়ে বসায়ে না খাওয়ায়ে পুর্নবাসনের উপর জোর দেওয়া হয়। তাদেরকে বাইরে ছেড়ে দেওয়া হয় পায়ে ‘টেকার’ লাগিয়ে তাদের অবস্থান সনাক্ত করা হয়। যে যে কাজে উপর্যুক্ত সেই রকম কাজে নিয়োজিত করা হয়। নিজের উপার্জন দিয়ে খেয়ে পড়ে সাজার মেয়াদ পার করা হয়। আমাদের দেশে কারাগারে হরেক রকম আমানবিক আচরণ করা হয়। অপরাধীরা জেলে বসেই অপরাধ কার্য চালাই। অপরাধীরা বের হয়ে বা জামিন নিয়ে আরো ক্ষীপ্ত হয়ে উঠে। কারাগার কে সংশোধনাগার হিসেবে গণ্য করতে হবে। এদেরকে এমন ভাবে ধর্মীয়, সাইকোলজিকেল, শিক্ষা ও কাজ শিক্ষা দিতে হবে যেন বের হয়ে আর অপরাধ না করে আর্থিক দূর্নীতি, অর্থ পাচারের শাস্তির মাঝে প্রতি মাসে অপরাধ অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় কোষাগারে নূন্যতম হারে টাকা জমা দেওয়ার রীতি চালু করতে হবে।
সামাজিক অবক্ষয়, মধ্যবিত্তের সম্পদের দ্রুত উত্থান, মোবাইল সংস্কৃতির বিস্তৃতি যদি অপরাধ বিস্তারের কারণ হয় তবে এসবের যুক্তিপূর্ণ ব্যবহারে আইন প্রনয়ন প্রয়োজন। কোন মানুষই গরীব ধনী বা অপরাধী হয়ে জন্মায় না। পরিবেশ-ঘরে-বাইরে পরিবেশ তাকে অপরাধী বানায়। সমাজ, পরিবার, রাষ্ট্র, নাগরিক বিকাশে সম্মিলিত প্রয়াসই অপরাধ নির্মূল করতে পারে। নেদারল্যান্ডস একটি বাস্তব উদাহরণ হতে পারে।- ডা. কিউ এম অহিদুল আলম বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, কলামিস্ট ।

 

 

সর্বশেষ

পাঠ্যপুস্তক

রতন চন্দ্র পাল, অতিথি লেখক: মানব সভ্যতার শ্রেষ্ঠ প্রকাশ...

ইজারাদারদের দাবি, সাতকানিয়া দেওয়ানহাট বাজার পরিচালনায় সুশাসন নিশ্চিতকরণের

অনলাইন ডেস্ক: সাতকানিয়ার দেওয়ানহাট বাজার পরিচালনায় সুশাসন নিশ্চিতকরণের দাবী...

যুক্তরাষ্ট্র আ.লীগের কৃষি বিষয়ক সম্পাদক নিযুক্ত সঞ্জয় কুমার সাহা

পূর্বকাল ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের কৃষি বিষয়ক সম্পাদক...

আ.লীগের কেন্দ্রীয় তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক উপকমিটির সদস্য হলেন বিধান রক্ষিত

নিজস্ব প্রতিবেদক: আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক...

সাতকানিয়ার কেরানীহাটে আশ্-শেফা স্কুল এন্ড কলেজে নাতে রাসুল (সাঃ) প্রতিযোগিতা সম্পন্ন

এস এম আনোয়ার হোসেন, দক্ষিণ চট্টগ্রাম: পবিত্র রবিউল আউয়াল...
spot_img