বৃহস্পতিবার, জুলাই ৩০, ২০২৬
spot_img

সময়ের কথন : লেখা পড়া করে যে, চাকরির খোঁজে ঘুরে সে

ডা. কিউ.এম. অহিদুল আলম: শিক্ষিত বেকার-শব্দটা কোন ভুক্তভোগী পরিবারের জন্য এটম বোমা থেকেও ভয়ংকর। গত ৫৩ বছর আমরা এ শব্দটা শুনতে অভ্যস্ত। কিন্তু ইদানীং পড়া- লেখা করে কি করব’- এই বাক্যটাও সমাজ জীবনে আলোচিত। ২৬ জুলাই ২০২৬-এ একটি প্রথম সারির দৈনিকে প্রকাশিত হয় যে, ৩৬% নিবন্ধিত এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার্থী পরীক্ষা দেয়নি। এ খবর প্রকাশিত হতেই মিডিয়া সরকার, সমাজবিদ, শিক্ষাবিদরা নড়াচড়া করে বসে। জাতীয় স্তরে এটা সমাজকে একটা বিরাট ঝাকুনি দেয়।
২০২৪-২০২৫ সালে এসএসসির পর একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া ও নিবন্ধনকৃত ১৫ লাখ শিক্ষার্থী ফরম পূরণ করে। ৫ লাখ পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়নি। এটা নতুন ঘটনা নয়। আগের বছরে ২৯% পরিক্ষার্থী ফরম পূরণ করে ও পরীক্ষায় অংশ নেয়নি। এক বছরে পরীক্ষায় অংশ না নেওয়ার সংখ্যা ৭% বেড়ে গিয়েছে। বাংলাদেশ কারিগরী শিক্ষাবোর্ডের পরীক্ষায় অংশ না নেওয়ার সংখ্যা আরো উদ্বোধজনক। মোট ছাত্রদের ৫৪% পরীক্ষা দেওয়ার নিবন্ধন ও ফরম পূরণ করেনি। মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ডে আলিম ১ম বর্ষে ২০২৪-২০১৫ সালে ১লাখ ৩৯ হাজার ৯২৯ জন নিবন্ধন করেছিল। ৭৮ হাজার ২৬৯জন ফরম পুরণ করে ৪৪.৭% পরীক্ষায় অংশ নেয়নি।
পরীক্ষায় অংশ না নেয়ার কারণ সম্বন্ধে যা জানা যায় তা হল- অর্থনৈতিক সংকট, দারিদ্র, লেখাপড়ার খরচ বহনে অক্ষম, শিশুশ্রম, বাল্যবিয়ে, প্রতিষ্ঠানের গাফি লতি, শিক্ষাব্যবস্থা ত্রুটি। প্রাথমিক পর্যায় থেকে আধু- নিকায়নের নামে, সৃজনশীল প্রশ্নের নামে একটি সিস্টেম চালু হয়েছে। সব ঠিক আছে। কিন্তু পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত বয়সী ছেলে-মেয়েরা কতটুকু পাঠ গ্রহণ করতে প্রস্তুত সে বিবেচনা একেবারেই নেয়া হয়নি। পড়ার ঠড়ষঁসব ও বেশী। আর কিছু অনুশীলনী দেয়া আছে, যা ৪র্থ-৫ম শ্রেণির বদলে ৬ষ্ঠ, ৭ম শ্রেণিতে পড়ানো যেত। যখন এই শিশুদের মানসিক বিকাশ হত এবং তাদের মস্তিস্ক তা গ্রহণ করতে প্রস্তুত হত। অনেকটা দাঁত উঠার আগে হাড্ডি চিবাতে দেওয়ার মত অবস্থা।
যুক্তি দেখানো হয়, পাশ্চাত্যে এরকম সিলেবাস। ভাল, ওখানে ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত কত? সবকিছু স্কুলেই শিখানো হয়। বাড়ীর কাজ তেমন থাকে না। যারা ক্লাসে পিছিয়ে থাকে তাদেরকে ছুটির পর ১ঘন্টা ঐ বিষয়ে আবার বুঝিয়ে দেবার বন্দোবস্ত থাকে (পুরা যুক্তরাজ্যে জার্মানী, ইউরোপ)। এই পিছিয়ে পড়া ছাত্ররা ৫ম শ্রেণি থেকেই বাড়তে থাকে। এসএসসি এবং ২০২৬ এর এসএসসি পর্যন্ত ৩৬% পরীক্ষার্থী পরীক্ষা না দেয়াটা একটা ‘চেইন’ ব্যর্থতা। নীতি নির্ধারকরা পশ্চাত্যের সিলেবাস চায়, কিন্তু পাশ্চাত্যের পাঠদান পদ্ধতি, ছাত্রদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার কথা বিবেচনায় রাখেনা। করনীয় কি? ১ম থেকে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত সিলেবাস এর আকার কমাতে হবে। বাচ্চারা আনন্দ নিয়ে ভীতি নিয়ে নয় যেন পাঠক্রম চালায়। পিছিয়ে পড়া ছাত্রদের স্কুলেই বিশেষ ক্লাস অংক, বিজ্ঞান, ইংরেজি প্রস্তুতি ও পাঠদান নিতে হবে।
ঝড়ে পড়ার অন্যতম কারণ দারিদ্র, খরচ চালাতে অক্ষম। ঢালাও ভাবে বিনামূল্যে বই না দিয়ে দরিদ্র ছাত্রদের আর্থিক সহায়তা অন্ততঃ দশ ক্লাস পর্যন্ত চালু হলে মা-বাবারা স্কুল থেকে বচ্চাদেরকে শিশুশ্রমে লাগাবে না। বাল্যবিবাহে, মেয়েদের স্কুলে যাওয়া আসার নিরাপত্তাহীনতার কারণে স্কুল ত্যাগ করার ও পরীক্ষা না দেওয়ার মাঝে ছাত্রীদের সংখ্যা বেশী। গ্রামে গঞ্জেও স্কুল ও কলেজ, মাদ্রাসা মহিলা মাদ্রাসা বেড়েছে। অনেক শিক্ষকের চাকরী হয়েছে। এমপিও ভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের খরচ সরকারী অর্থের সিংহ ভাগ। প্রতিটি উপজেলায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রচলিত অনেক বিষয়ে অনার্স খোলা হয়েছে। সরকারী খরচ, বিনিয়োগ প্রচুর। কিন্তু কিছু বিষয় যে গুলোর পাশ পরবর্তী সুযোগ কম তার ভর্তি, শিক্ষক সংকুচিত করে পিছিয়ে পড়া ছাত্রদের জন্য বিশেষ ক্লাস প্রোগ্রাম নেওয়া যেতে পারে ক্লাসেই। এজন্য শিক্ষকদের কিছু প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে।
কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়াদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি কেবলই হতাশার জন্ম দেয়। একটা উদাহরণ দেয়া যাক। যারা বেশি ভাল ছাত্র তারা সবাই বিসিএস চেষ্টা করে। বিসিএস এ ২৬টি ক্যাডার আছে। ১৪টি সাধারণ ১২টি কারিগরী। ৪৪তম বিসিএস এ ৩৫০৭১৬ জন প্রিলিমিনারী পাশ করে। চাকুরী হয় মাত্র ১৬৯০ জনের। কোন সময় ২ থেকে ৩ হাজার নিয়োগ পায়। বিপুলসংখ্যক শিক্ষিত ৪ থেকে ৮ বছরে ও না সরকারী না বেসরকারী চাকুরী পায়। অথচ পরিবারের কম বেশী খরচ ও প্রাপ্তি এক বিরাট হতাশা। স্কুল পাশ করেই অনেকে পারিবারিক কারনে অর্থ উপার্জনে লেগে যায়। ১১-১২ ক্লাসে নাম লেখায়। তত দিনে বাইরে ছোট খাট পরিবারিক ব্যবসা, চাকুরীতে লেগে যায়। কারিগরি বোর্ডেও বিপুল সংখ্যক ছাত্র পড়ার ফাঁকে জন্য টেকনিক্যাল জবে ঢুকে পড়ে। ফলে আর পরীক্ষা দেয়া হয়না।
করনীয় কি? যত্রতত্র স্কুল কলেজে এ যুগে চাকরীর সাথে কম সম্পৃক্ত বিষয়গুলোতে ভর্তি সীমিত করে সোজা ভোকেশনাল যে কোন সীমিত সময় উপার্জনের সুযোগ আছে তাতে বিনিয়োগ করতে হবে। সবচেয়ে নজর দিতে হবে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক, ছাত্রদের কে সিলেবাস ও হোমওয়ার্কের ওভার লোড থেকে মুক্তি দিয়ে আনন্দঘন পরিবেশ সৃজন করতে হবে। স্কুলের পিছিয়ে পড়া ছাত্রদের স্কুলেই ঘণ্টাদুয়েক বিশেষভাবে যত্ন নিতে হবে। মোট কথা কোচিং টিউশন ইত্যাদি কমায়ে স্কুলভিত্তিক পাঠদান ও গ্রহণ এ বিনিয়োগ করলে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক লেখাপড়ার ভিত্তি শক্ত হবে বলে মনে হয়।
লেখক- বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, কলামিস্ট।

সর্বশেষ

পাঠ্যপুস্তক

রতন চন্দ্র পাল, অতিথি লেখক: মানব সভ্যতার শ্রেষ্ঠ প্রকাশ...

ইজারাদারদের দাবি, সাতকানিয়া দেওয়ানহাট বাজার পরিচালনায় সুশাসন নিশ্চিতকরণের

অনলাইন ডেস্ক: সাতকানিয়ার দেওয়ানহাট বাজার পরিচালনায় সুশাসন নিশ্চিতকরণের দাবী...

যুক্তরাষ্ট্র আ.লীগের কৃষি বিষয়ক সম্পাদক নিযুক্ত সঞ্জয় কুমার সাহা

পূর্বকাল ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের কৃষি বিষয়ক সম্পাদক...

আ.লীগের কেন্দ্রীয় তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক উপকমিটির সদস্য হলেন বিধান রক্ষিত

নিজস্ব প্রতিবেদক: আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক...

সাতকানিয়ার কেরানীহাটে আশ্-শেফা স্কুল এন্ড কলেজে নাতে রাসুল (সাঃ) প্রতিযোগিতা সম্পন্ন

এস এম আনোয়ার হোসেন, দক্ষিণ চট্টগ্রাম: পবিত্র রবিউল আউয়াল...
spot_img