ডা. কিউ.এম. অহিদুল আলম: রাহাত কোরেশী এক পাকিস্তানী ছাত্র বিলাতে পড়ে। ছাত্র হিসেবে পার্টটাইম কাজ করে লন্ডনের এক ক্যাসিনোতে। তার অধঃস্তন ১০/১২ জন বাংলাদেশি, ভারতীয় এবং শ্রীলংকান ছাত্র। রাহাত কোরেশী ম্যানেজার। মাথায় টুপি ও দাড়ি। তরুণ স্মার্ট মুসলিম। তার অধঃস্তনদের সাথে অন্তরঙ্গ পরিবেশে কাজ করে। ভারত-পাকিস্তান বা ভারত- বাংলাদেশ বা শ্রীলঙ্কা ভারত এর দ্বন্দ্বের কোন প্রভাব এই উপমহাদেশীয় তরুণদের মাঝে নেই। সবাই একটা টিমের মত কাজ করে। রাহাতের টুপি দাড়ি মেনে নিতে সুনীল, লিঙ্কন বা অনিরুদ্ধ প্যাটেলের কোন সমস্যা নেই। সবাই ম্যানেজারকে ‘রাহাত ছাব’ বলে। ফ্যাসাদ লাগে যখন গভীর রাতে ক্যাসিনো বন্ধ হয়, তখন সাদা খদ্দেররা মাতাল, অর্ধমাতাল অবস্থায় রাহাতকে ইচ্ছেমত গালিগালাজ করে। আল-কায়দা, তালেবান, কালো ভারতীয়- সব মিলে অকথ্য গালিগালাজ চলে ম্যানেজার রাহাতের উপর। তাকে রক্ষা করতে আসে ভারতীয়, বাংলাদেশি, শ্রীলঙ্কান হিন্দু, মুসলিম- খ্রীষ্টান সবাই। এটা প্রতিদিনের ঘটনা। মাঝেমধ্যে সাদা মাতালদের ধরে রাহাতের এশীয় বন্ধুরা পুলিশে সোপর্দ করে। একদিন রাহাত একটা গেঞ্জী পরে আসে। গেঞ্জীতে লেখা, ‘ডোন্ট প্যানিক আই এম ইসলামিক’ অর্থাৎ ‘ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমি মুসলমান।’ এই ক্যাসিনোর ভারতীয় হিন্দু শ্রীলঙ্কান খ্রীষ্টান ও বাংলাদেশের মুসলমান সবাই পাকিস্তানী ম্যানেজার রাহাতের লেখা গেঞ্জী পরা শুরু করে। ক্যাসিনোর খদ্দেররাও ভদ্র হয়ে যায়। ভাবে এই মুসলমান তো আল কায়দাও নয়, তালিবান ও নয়। রাহাতের অধঃস্তন উপমহাদেশের সবারও এই মুসলমানের অধীনে চাকরি করতে অসুবিধা হয় না । অতএব এই স্লোগান ঢালাও ব্যবহার হতে থাকে- ‘ডোন্ট প্যানিক আইএম ইসলামিক’। ইউরোপে এখন ইসলাম দ্বিতীয় ধর্ম। এত বেশি মুসলমান উচ্চশিক্ষিত লোকজন দেখে ইউরোপীয়ানদের মধ্যে মুসলমান ও ইসলাম সম্বন্ধে নতুন জিজ্ঞাসা শুরু হয়েছে। গ্রানাডা ও কর্ডোভা সভ্যতা থেকে ইউরোপে ইসলামের প্রবেশ ঘটে। বর্তমানে ইসলামের দ্রুত প্রসার ঘটছে ইংল্যান্ডে। ইংল্যান্ডের ১৫% নাগরিক ইসলাম ধর্মাবলম্বী। প্রায় বারশত মসজিদে ইসলামিক শিক্ষা ও সংস্কৃতি চর্চা হয়। ‘ও’ এবং ‘এ’ লেভেল এর বোর্ডিং স্কুলে কুরআন, হাদিস তরজমাসহ প্রচুর কুরআনে হাফেজ প্রস্তুত হচ্ছে। এসব ইসলামিক মিশনের উদ্যোক্তা মূলত: ভারতীয় গুজরাটী মুসলমানরা। বিলাতের মসজিদের ইতিহাস চমকপ্রদ। প্রথম মসজিদ স্থাপন করেন ইহুদি বংশোদ্ভূত এক প্রাচ্যবিশারদ। তার নাম গটলিব লিটনার। তার মা লন্ডন থেকে ইস্তাম্বুলে চলে যান ও খ্রিষ্টানধর্ম গ্রহণ করেন। লিটনার ইস্তাম্বুলে মাদ্রাসায় আরবি ও ফার্সী ভাষা অধ্যয়ন করেন। তিনি ২৪ বছর বয়সে আবার লন্ডন ফেরৎ আসেন ও লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাচ্যশাস্ত্রের প্রফেসর হন। এরপর তিনি ভারত এসে লাহোরে সরকারি কলেজের অধ্যাপক হন। দীর্ঘ ১২ বছর ভারতে কাটিয়ে তিনি আবার বিলাত ফিরে একটা ইসলামিক মিশন ও প্রাচ্য শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপন করেন লন্ডনের অদূরে সারে অঞ্চলের ‘ওকিং শহরে। এখানে ১৮৮৯ সালে লিটনার শাজাহান মসজিদ’ নামে এক মসজিদ স্থাপন করেন ও ইসলামী সভ্যতা ও কৃষ্টির কেন্দ্র ও শিক্ষালয় গড়ে তোলেন। তবে তিনি নিজে ইসলামধর্ম গ্রহণ করেছিলেন কিনা সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না। ভারত থেকে গণ্যমান্য লোক ইংল্যান্ডে আসলে তারা ওকিং এর শাজাহান মসজিদে নামাজ পড়তেন। মজার ব্যাপার হল সবাই মনে করে যে এই মসজিদ সম্রাট শাজাহানের সাথে সম্পর্কিত। এটা বিভ্রান্তি মাত্র। ভারতের মধ্যপ্রদেশের ভূপালের নবাব শাজাহান বেগম লিটনাকে এই ইসলামিক কেন্দ্র গড়তে প্রচুর আর্থিক সহায়তা দেন বলে তার নামানুসারে মসজিদের নাম শাজাহান মসজিদ রাখা হয়। লিটনার মৃত্যুর পর তার ছেলে এই মসজিদসহ পুরো কেন্দ্র বিক্রি করার উদ্যোগ নেয়। তখন খাজা কামালউদ্দিন নামে এক ভারতীয় দীর্ঘ নয় বছর লন্ডনের উচ্চ আদালতে মামলা করেন এবং এই সম্পত্তি বিক্রির বিরুদ্ধে মামলায় জিতেন তখন থেকে এখানে ইসলামিক মিশন প্রতিষ্ঠিত হয় ও সাদা ইউরোপীয়ানরাও ইসলামধর্ম গ্রহণ শুরু করে। বিখ্যাত বৃটিশদের মধ্যে পার্লামেন্ট সদস্য লর্ড হেডলি এবং বৃটিশ সেনাবাহিনীর ডেপুটি সার্জন জেনারেল ও এক মার্কিন প্রেসিডেন্টের ভাইপো ডা. উইলিয়াম হ্যামিলটন ইসলাম গ্রহণ করে এই মসজিদের মিশন কার্যক্রমকে বৃটেনে ছড়িয়ে দেয়। বর্তমানে বৃটেনে মসজিদ বৃদ্ধির কারণ হল-গীর্জায় মানুষ যাওয়া কমে যাচ্ছে। ফলে চার্চের আয় কমে যাচ্ছে। ফলে বহু গীর্জা বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। গীর্জা বিক্রি হয় এই শর্তে যে সেখানে ‘ঈশ্বরের কার্যক্রম চলবে (Activities of Faith) গান, বাদ্য, মদ, জুয়া ইত্যাদি চলবে না। এই শর্তে মুসলমান ক্রেতা ছাড়া আর কাউকে পাওয়া যায় না। এমনিভাবে মুসলমনরা গীর্জা কিনে মসজিদ, মক্তব ও স্কুল পরিচালনা করছেন। এমনি একটি গীর্জা দশ কোটি টাকায় খরিদ করে মসজিদ ও ইসলামিক সেন্টার করেছেন একক উদ্যোগে মৌলভীবাজারের প্রখ্যাত ব্যবসায়ী মজনুর রশিদ। তার মসজিদের নাম নর্থ ইষ্ট কেন্ট মুসলিম সেন্টার। এটি অত্যন্ত অভিজাত গ্রীন লির কাছে ক্রেফোর্ড এলাকায়। এই মসজিদের খতিব মজনু সাহেবেরই জামাতা হাফেজ আতিকুর রহমান চৌধুরী। ইংরেজিতে অনর্গল বক্তৃতা দানকারী এই তরুণ ইসলামী চিন্তাবিদ মজনু সাহেবের স্বপ্ন বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছেন। দূর- দুরান্ত থেকে বাচ্চারা বিকেলে ইসলামি তালিম নিতে ক্রেফোর্ডের এই ইসলামিক সেন্টার ও মসজিদে আসেন। রিজেন্ট পার্ক মসজিদ ও ইস্ট লন্ডন ইসলামিক সেন্টার বর্তমানে ইসলামকে সাদা মানুষদের বোধগম্য ও ইসলামভীতি দূরীকরণে এক অগ্রণী ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। বৃটিশদের মাঝেও ইসলামভীতি কমছে এবং শিক্ষিত খ্রিষ্টানদের মাঝে ইসলামকে বোঝার আগ্রহ বাড়ছে। ‘ইসলামিক’ সবকিছু সত্যিই আর ‘প্যানিক’ নয়। ১/১১ এর পর মুসলিমভীতির কারণ বর্তমানে প্রকাশ পেতে শুরু করেছে। খোদ আমেরিকানরাই মিডিয়া কর্তৃক চরম হীনভাবে সারাবিশ্বে মসলিমদেরকে চিত্রিত করার অদ্ভুত কারসাজিতে অপরাধবোধ অনুভব করছে।
লেখক- বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, কলামিস্ট।


