সোমবার, আগস্ট ২৪, ২০২৬
spot_img

‘চারজনকে হত্যার পর গোসল করে খুনিরা, টেবিলে বসে খেয়েছিল খেজুর-শসা’

অনলাইন ডেস্ক : রংপুরে একই পরিবারের চারজনকে হত্যার পরও দীর্ঘ সময় ওই বাড়িতেই ছিলেন দুই যুবক। হত্যাকাণ্ড শেষে তারা বাসার বাথরুমে গোসল করেন। এরপর ডাইনিং টেবিলে বসে খেজুর ও শসা খান। সেখানেই ইয়াবা সেবন করেন। পরে জুমার নামাজের সময় রাস্তাঘাট ফাঁকা হলে বাড়ি থেকে স্বর্ণালংকার নিয়ে বেরিয়ে যান তারা।ররিবার (২৩ আগস্ট) এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা নিশ্চিত করেন রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ।


এর আগে, রংপুরে শিক্ষক পরিবারের চার জনকে হত্যার ঘটনায় মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ নামে দুই যুবককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। আজ ভোরে নগরের মাছুয়াপাড়া এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের বাড়িও একই এলাকায়। এর আগে, শনিবার রাত ১১টার দিকে নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকায় তালাবদ্ধ বাড়ি থেকে রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ভোলা (৫০), মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তী (২৫) এবং ছোট ছেলে প্রীয়ম চক্রবর্তী (১২) মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, রংপুরে একই পরিবারের চারজনকে হত্যার পরও দীর্ঘ সময় ওই বাড়িতেই ছিলেন দুই যুবক। হত্যাকাণ্ড শেষে তারা বাসার বাথরুমে গোসল করেন। এরপর ডাইনিং টেবিলে বসে খেজুর ও শসা খান। সেখানেই ইয়াবা সেবন করেন। পরে জুমার নামাজের সময় রাস্তাঘাট ফাঁকা হলে বাড়ি থেকে স্বর্ণালংকার নিয়ে বেরিয়ে যান তারা।
ডিআইজি মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ বলেন, রংপুর মহানগরের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের মাছুয়াপাড়া এলাকায় সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ওরফে ভোলা, মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তী ও ১২ বছর বয়সী শিশু প্রিয়মকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনার পর রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ, সিআইডি, ডিবিসহ পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট, গোয়েন্দা সংস্থা, গণমাধ্যমকর্মী ও সমাজকর্মীরা সম্মিলিতভাবে কাজ করেছেন। অল্প সময়ের মধ্যেই আমরা হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করতে সক্ষম হয়েছি।
তিনি বলেন, গণপতি চক্রবর্তী একজন সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন। তার পরিবারের সঙ্গে কারও কোনো কলহ বা বিরোধ ছিল না। পাশের একটি ভবনের ওপর দিয়ে দুই আসামি মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে যাতায়াত করত। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে তারা ওই ছাদে বসে ইয়াবা সেবন করছিল। এ সময় শব্দ শুনে গণপতি চক্রবর্তী ছাদে যান। তিনি খালি গায়ে ছিলেন এবং কাঁধে গামছা ছিল। ছাদে বসে আড্ডা দেওয়ার বিষয়ে তিনি তাদের জিজ্ঞাসা করেন। তখন নিজেদের পরিচয় যাতে প্রকাশ না পায়, সে জন্য দুই আসামি তার গলায় থাকা গামছা পেঁচিয়ে তাকে হত্যা করে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গণপতি চক্রবর্তীকে হত্যার সময় তার বাচার চেষ্টার শব্দ শুনে স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ওপরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। সিঁড়িতে তাকেও গলায় গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়। তার চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তী এগিয়ে আসেন। তাকেও গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়। আসামিদের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রার্থী চক্রবর্তী সহজে মারা যাচ্ছিলেন না। তার মৃত্যু নিশ্চিত করতে চার থেকে পাঁচ মিনিট সময় লাগে। একপর্যায়ে রশি দিয়ে তার গলা ও মুখ পেঁচিয়ে জোরে টান দেওয়া হয়। এতে তার চোয়াল ভেঙে যায় এবং চোখ বেরিয়ে আসে।
তিনি উল্লেখ করেন, এরপর নিচতলায় গিয়ে ঘুমিয়ে থাকা ১২ বছর বয়সী শিশু প্রিয়মকে হত্যা করা হয়। শিশুটির গলায় কাপড় পেঁচিয়ে হত্যার পর একপর্যায়ে বালিশ চাপা দেওয়া হয়। প্রিয়মের বয়স আমার ছোট সন্তানের সমান। এ হত্যাকাণ্ডের কথা বলতে গিয়ে আমি আবেগপ্রবণ হয়ে যাই। প্রিয়মকে হত্যার কারণও আমরা জানতে পেরেছি। সিদ্ধার্থের ছোট ভাই অপূর্বের সঙ্গে প্রিয়মের বন্ধুত্ব ছিল। তারা একসঙ্গে খেলাধুলা করত। প্রিয়ম আসামিদের চিনত। এ কারণে সিদ্ধার্থ সিদ্ধান্ত নেয়, প্রিয়মকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে হবে। এরপর সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ দুজন মিলে শিশুটিকে হত্যা করে।
তিনি বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের পরও আসামিরা ওই বাড়িতে অবস্থান করে। সকাল হলে তারা বাড়ির বাথরুমে গোসল করে। প্রথমে সিদ্ধার্থ এবং পরে মুগ্ধ গোসল করে। এরপর তারা ডাইনিং টেবিলে বসে খেজুর খায়। সেখানে থাকা এক পিস ইয়াবা তারা সেবন করে। ঘটনাস্থল থেকে ইয়াবা সেবনের আলামত পাওয়া গেছে। খুনের পর তারা শসাও খেয়েছিল। ফ্রিজ থেকে নেওয়া একটি শসার অর্ধেক অংশ পাওয়া গেছে। তাদের বক্তব্যের সঙ্গে এই আলামতও মিলে গেছে। খুনের পর তারা উত্তেজিত ছিল এবং শসা খেয়েছিল বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে।’
সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়, এরপর শুক্রবার জুমার নামাজের সময় তারা বাড়ি থেকে বের হয়। তখন মুসল্লিরা নামাজে ব্যস্ত থাকায় রাস্তাঘাট ফাঁকা ছিল। তারা ওই সুযোগে বাড়ি থেকে কিছু স্বর্ণালংকার নিয়ে যায়। পরে সেগুলো মন্দিরের পেছনের একটি পরিত্যক্ত জায়গায় রেখে দেয়। আসামিদের দেখানো মতে আজ এসব আলামত উদ্ধার করা হয়েছে। সিদ্ধার্থ একটি স্বর্ণের দোকানের কারিগর। সে পিকে পাল জুয়েলার্সে প্রায় আট বছর ধরে স্বর্ণের কাজ করে। ফলে কোনটি স্বর্ণ আর কোনটি ইমিটেশন, তা সে চেনে। ঘটনাস্থলে একটি চুরি আগুন দিয়ে পরীক্ষা করার আলামত পাওয়া যায়। তখন আমাদের ধারণা হয়, স্বর্ণের কাজে অভিজ্ঞ কেউ এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে। পরে সেই ধারণা সঠিক প্রমাণিত হয়।
এতে বলা হয়, ঘটনাটিকে ডাকাতি হিসেবে দেখাতে এবং তদন্ত ভিন্ন খাতে নিতে আসামিরা ইচ্ছাকৃতভাবে বাড়ির জিনিসপত্র এলোমেলো করে। বাড়িতে থাকা দুটি মোবাইল ফোনও তারা ডিটারজেন্ট মেশানো পানিতে বালতির মধ্যে ভিজিয়ে রাখে। তাদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, ফোনে যেন কোনো ফিঙ্গারপ্রিন্ট না থাকে, সে জন্য তারা এ কাজ করে। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত থেকে শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত পুরো ঘটনাটি ঘটে। বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে তারা কিছু স্বর্ণালংকার নিয়ে যায়। পরে সেগুলো পরিত্যক্ত জায়গায় রেখে দেয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ পরস্পরের আত্মীয়। তারা মামাতো ভাই। ঘটনার আগে সীমান্ত নামে একজনের বাসায় বসেও তারা ইয়াবা সেবন করে। সীমান্ত এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নয়। এরপর তারা গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে গিয়ে ইয়াবা সেবন করে। মুগ্ধ সিটি বাজারের রামনাথের মাছের দোকানে কাজ করে। তার বাসার সামনে প্রশান্ত নামে এক ইয়াবা ব্যবসায়ী রয়েছে। তার কাছ থেকেই তারা ইয়াবা কিনত। প্রতি পিস ইয়াবার দাম ছিল ৩৫০ টাকা।
আসামিরা যে ভবনের ওপর দিয়ে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়িতে যাতায়াত করত, সেটি দেবুদের ভবন। তারা ওই ভবনের ওপর দিয়ে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে যেত। গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রীকে তারা ‘কাকি’ বলে ডাকত। গণপতি চক্রবর্তীকে ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করত। তাঁর মেয়ের সঙ্গে তাদের খুব একটা কথা হতো না। তবে ছোট শিশু প্রিয়মের সঙ্গে তাদের পরিচয় ছিল এবং খেলাধুলার সম্পর্ক ছিল।
পুলিশ জানান, দুই আসামিকেই আমরা গ্রেপ্তার করেছি। আজ ভোরে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার দুজন হলেন শ্রীমুগ্ধ ওরফে মুগ্ধ, বয়স ২৩ বছর, পিতা কানুদাস ও মাতা সেনারী দাস এবং সিদ্ধার্থ দাস, বয়স ১৯ বছর, পিতা বিনয়চন্দ্র দাস ও মাতা পাপড়ি দাস। দুজনেরই বাড়ি মাছুয়াপাড়া এলাকায়। চারজনকে একের পর এক হত্যা করা হয়েছে।
ঘটনার তদন্তে আমরা বিভিন্ন আলামত পেয়েছি। খেজুরের বিচি ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। অর্ধেক খাওয়া শসা পাওয়া গেছে। একটি চুরি আগুন দিয়ে পরীক্ষা করার আলামত পাওয়া গেছে। এসব তথ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ করেই আমরা তদন্তে অগ্রগতি পেয়েছি এবং আসামিদের গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছি। ঘটনার শুরু থেকেই এটি হত্যা নাকি ডাকাতি—তা নিয়ে আমাদের মধ্যে দ্বিধা ছিল। সে কারণে আসামি শনাক্ত ও গ্রেপ্তার এবং তাদের জিজ্ঞাসাবাদের ক্ষেত্রে আমরা সতর্কতার সঙ্গে এগিয়েছি। এত দ্রুত সময়ে আসামিদের শনাক্ত করতে পারা আমাদের তদন্ত দলের বড় সাফল্য।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ বলেন, এ ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় মামলা হয়েছে। মামলার নম্বর ৪৩। দণ্ডবিধির ৩০২ ও ৩৪ ধারায় মামলাটি করা হয়েছে। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে পুলিশের পক্ষ থেকে চার্জশিট দেওয়ার চেষ্টা করা হবে। প্রকৃত আসামিদের বিচারের আওতায় আনা হবে। ঘটনাটি অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর হওয়ায় আসামি গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে আমরা যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করেছি। তদন্তের স্বার্থে প্রতিটি পদক্ষেপ বিবেচনা করে নিতে হয়েছে। তাই সব তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে গণমাধ্যমকে জানানো সম্ভব হয়নি। হত্যাকাণ্ডে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। এ ধরনের কোনো তথ্যও আমাদের তদন্তে আসেনি।

সর্বশেষ

পাঠ্যপুস্তক

রতন চন্দ্র পাল, অতিথি লেখক: মানব সভ্যতার শ্রেষ্ঠ প্রকাশ...

ইজারাদারদের দাবি, সাতকানিয়া দেওয়ানহাট বাজার পরিচালনায় সুশাসন নিশ্চিতকরণের

অনলাইন ডেস্ক: সাতকানিয়ার দেওয়ানহাট বাজার পরিচালনায় সুশাসন নিশ্চিতকরণের দাবী...

যুক্তরাষ্ট্র আ.লীগের কৃষি বিষয়ক সম্পাদক নিযুক্ত সঞ্জয় কুমার সাহা

পূর্বকাল ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের কৃষি বিষয়ক সম্পাদক...

আ.লীগের কেন্দ্রীয় তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক উপকমিটির সদস্য হলেন বিধান রক্ষিত

নিজস্ব প্রতিবেদক: আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক...

সাতকানিয়ার কেরানীহাটে আশ্-শেফা স্কুল এন্ড কলেজে নাতে রাসুল (সাঃ) প্রতিযোগিতা সম্পন্ন

এস এম আনোয়ার হোসেন, দক্ষিণ চট্টগ্রাম: পবিত্র রবিউল আউয়াল...
spot_img