অনলাইন ডেস্ক : হাইতির রাজধানী পোর্ট-অ-প্রিন্সের কাছে কেন্সকফ এলাকায় রাতভর সশস্ত্র গ্যাংয়ের হামলায় অন্তত ৪৭ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরো ২২ জন।স্থানীয় সময় সোমবার জাতিসংঘ এ তথ্য জানিয়েছে।জাতিসংঘের হাইতিবিষয়ক সমন্বিত কার্যালয় জানিয়েছে, হামলায় নিহত ও আহত মানুষের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে। কারণ, ঘটনার পুরো হিসাব এখনো পাওয়া যায়নি। কেন্সকফ একটি পাহাড়ি এলাকা।
এটি হাইতির রাজধানীর দিকে যাওয়ার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পথের কাছে অবস্থিত। গত বছর থেকে এলাকাটিতে সশস্ত্র গ্যাং প্রায় এক ডজন হামলা চালিয়েছে। এসব হামলার কারণে হাজারো মানুষ নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন। হাইতিতে কয়েক বছর ধরে শক্তিশালী গ্যাংগুলো রাজধানী পোর্ট-অ-প্রিন্সের বড় একটি অংশে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়েছে।
এখন তারা রাজধানীর আশপাশের এলাকাতেও প্রভাব বিস্তার করছে। গ্যাংগুলোর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে হাইতির দুর্বল পুলিশকে সহায়তা করতে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে এসব উদ্যোগের পরও গ্যাংগুলোর নিয়ন্ত্রণ কমেনি।
হাইতির মানবাধিকার সংগঠন আরএনডিডিএইচ জানিয়েছে, কেন্সকফের হামলায় ৩০ থেকে ৪০ জন নিহত এবং ১৫ থেকে ২০ জন আহত হয়েছেন। সংগঠনটির মতে, স্থানীয় সময় রাত সাড়ে ১০টার দিকে হামলা শুরু হয়।
তবে হামলায় হতাহত মানুষের সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন বলে জানিয়েছে সংগঠনটি। হাইতি সরকার এই হামলাকে ‘জঘন্য’ বলে নিন্দা জানিয়েছে। একই সঙ্গে কেন্সকফে নিরাপত্তা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে তারা। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেছে, কেন্সকফকে পরিত্যক্ত অবস্থায় রাখা হবে না। কোনো ধরনের দেরি বা দুর্বলতা ছাড়াই সেখানে সরকারের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনা হবে। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের ক্ষোভ আরো বেড়েছে। তারা পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং পুলিশ প্রধানের পদত্যাগ দাবি করেছেন। বাসিন্দাদের অভিযোগ, একটি পুলিশ স্টেশন থেকে মাত্র কয়েক মিনিটের দূরত্বে হামলা চালিয়ে মানুষকে হত্যা করা হলেও পুলিশ তাদের রক্ষা করতে পারেনি।
জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শুরুর দিকে মাত্র দুই মাসে কেন্সকফে গ্যাংয়ের হামলায় ২৬০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন। এ সময় প্রায় ২০০টি বাড়ি ধ্বংস করা হয় বা আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। হামলার কারণে প্রায় ৩ হাজার মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। এরপরও কেন্সকফে গ্যাংয়ের হামলা বন্ধ হয়নি। গত এক বছরে সেখানে আরো প্রায় এক ডজন হামলার খবর পাওয়া গেছে। এসব হামলায় হত্যা ছাড়াও ধর্ষণ, অপহরণ, অগ্নিসংযোগ এবং গবাদি পশু চুরির মতো ঘটনা ঘটেছে। হামলায় নিজের এক চাচাতো ভাইকে হারিয়েছেন কোরিওলান কেন্ডি। নিহত স্বজনের মরদেহের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, তার পরিবারও গ্যাংয়ের হামলার শিকার হয়েছে। কেন্সকফের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে কষ্টের মধ্যে আছে এবং এর জন্য তিনি সরকারকে দায়ী করেন।
আরেক বাসিন্দা ওরিসমে বলেন, এলাকার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে অপমান, ভয় ও কষ্টের মধ্যে বসবাস করছে। তিনি সরকারের কাছে তাদের সহায়তায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, হামলার সময় রাতে কয়েক ডজন পুলিশ সদস্য সশস্ত্র গ্যাং সদস্যদের ঠেকানোর চেষ্টা করেন। এ সময় কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন। তবে হামলায় নিহতদের মধ্যে গ্যাং সদস্য কতজন ছিলেন, তা তারা নিশ্চিত করতে পারেননি। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, হামলার সময় বেশ কয়েকটি বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। এসব বাড়ির মধ্যে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ জ্যঁ উইলিয়াম পাপের বাড়িও রয়েছে।
হাইতির জাতীয় পুলিশ প্রধান ভ্লাদিমির প্যারাজোঁ পরে কেন্সকফ পরিদর্শনে যান। সেখানে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, পুলিশ কখনো হাল ছেড়ে দেয়নি। কেন্সকফ থেকে পেতিওঁ-ভিলের দিকে যাওয়ার পথগুলো দেখা যায়। পেতিওঁ-ভিলে কয়েকটি দূতাবাস, বিলাসবহুল হোটেল এবং সরকারের অস্থায়ী কার্যালয় রয়েছে। এ ছাড়া কেন্সকফের পাশ দিয়ে রাজধানী পোর্ট-অ-প্রিন্স থেকে দক্ষিণ হাইতির দিকে যাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক রয়েছে। ফলে এলাকাটি নিরাপত্তা ও যোগাযোগ- দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। কেন্সকফে নতুন করে এই সহিংসতা হাইতিতে নির্বাচন আয়োজন নিয়েও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। আগামী ডিসেম্বর মাসে দেশটিতে নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। এক দশকের মধ্যে এটি হতে পারে হাইতির প্রথম জাতীয় নির্বাচন। তবে গ্যাংগুলোর প্রভাব বাড়তে থাকায় গত কয়েকটি সরকার নির্বাচন আয়োজন করতে পারেনি এবং ভোট বারবার পিছিয়েছে।
হাইতিতে গ্যাং দমনে জাতিসংঘের সমর্থনে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী কাজ করছে। এর লক্ষ্য হলো চলতি বছরের শরৎকালের মধ্যে বাহিনীর সদস্যসংখ্যা ৫ হাজার ৫০০-এর বেশি করা। এই বাহিনীর মূল দায়িত্ব হলো হাইতির পুলিশকে গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সহায়তা করা। তবে কেন্সকফের নিরাপত্তা জোরদার করতে এই বাহিনীর সদস্যদের সেখানে পাঠানো হচ্ছে কি না, তাৎক্ষণিকভাবে তা জানা যায়নি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাহিনীর এক মুখপাত্র কোনো মন্তব্য করেননি।


