রবিবার, সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬
spot_img

অভিযাত্রামূলক নির্বান ও প্রত্ন নাটক ‘পন্ডিত বিহার বিশ্ববিদ্যালয়’

হামীম রায়হান : 
‘কাব্যেষু নাটকং রম্যম্’
সংস্কৃত আলঙ্কারিকগন নাট্য সাহিত্যে কাব্য সাহিত্যের স্থান দিয়েছেন। তাঁদের মতে নাটক মূলত দু’প্রকার। দৃশ্য কাব্য ও শ্রব্য কাব্য। নাটক মূলত শ্রব্য কাব্য। এটি দৃশ্য ও শ্রব্য কাব্যের সমন্বয়ে রঙমঞ্চে গতিমানব জীবনের প্রতিচ্ছবি আমাদের সম্মুখে  মুর্ত্ত করে তোলে। ঔপনিবেশীয় শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিস্তারে বাংলার অধিকাংশ মানুষের মনে একটি ধারনা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যে বাংলা নাটকের জন্ম অষ্টাদশ শতক। কিন্ত খ্রিষ্ট্রীয় অষ্টম থেকে দ্বাদশ খ্রিষ্টাব্দে  রচিত চর্যাপদের একটি চর্য্যায় বুদ্ধ নাটকের উল্লেখ পাই।
“নাচন্তি বাজিল গায়ন্তি দেবী
বুদ্ধ নাটক বিসমা হোহৗ’
তাহলে  বুদ্ধ নাটক সম্পর্কে আমরা ধারনা পাই বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নির্দশন চ্যারা থেকে। এই পদটি বাংলা নাটকের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে বেশ গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলার ইতিহাস হাজার বছরের ইতিহাস। পুরনো এই ইতিহাস ও সভ্যতার অনেক কিচু হারিয়ে গেছে কালের প্রবাহে। মাটি চাপা পড়েছে সভ্যতা। এই সভ্যতাই আমাদের শেকড়। এই শেকড় রক্ষাই নতুন ধারায় উপস্থাপন করা শুরু হয়েছে। এই ঐহিত্য সম্পদ রক্ষায় জনসচেতনা সৃষ্টিতে এই প্রথম বাঙ্গালীর সংস্কৃতির পথে বানানো হচ্ছে প্রত্ননাটক।
বাংলাদেশের হাজার বছরের ঐতিহ্যের যে প্রাচুর্যময় ভান্ডার রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হল আমাদের প্রত্ন প্রত্নতান্ত্রিক নির্দশন। এসব নির্দশন সংরক্ষনের জন্য বিভিন্ন প্রত্ন নাটক রচিত হচ্ছে। ইতোমধ্যে ঐতিহাসিক পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার ও উয়ারী বটেশ্বর স্থাপনা নিয়ে দুটি প্রত্ন নাটক রচিত ও প্রদর্শিত হয়েছে। পর্যায়ক্রমে দেশের সকল প্রত্ন এলাকার ইতিহাস নিয়ে এমন প্রত্ন নাটক তৈরী হবে। এই নাটকের বৈশিষ্ট্যহল প্রত্ন সম্পদ এলাকার মানুষের অভিনয়েই তা প্রদর্শিত হবে। এ জন্য কোন মঞ্চ নয়, প্রত্ন সাইটই মঞ্চ। এভাবেই দেশের প্রথম প্রত্ন নাটক “সোমপুর কথন” প্রদর্শিত হয় উত্তরাঞ্চলের পাহাড়পুরে। এই নাটকের মাধ্যমে বুঝানো হয়েছে, বিশ্বের কত বড় সম্পদ ধারণ করে আছে এই মাটি। এই সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব বর্তায় ঐ এলাকার মানুষেরই ওপর।
এমনি আরেকটি প্রত্ন নাটক “পন্ডিত বিহার বিশ্ববিদ্যালয়”। এটি মূলত চট্টগ্রামের আনোয়ারাই হতে যাওয়া আর্ন্তজাতিক পন্ডিত বিহার বিশ্ববিদ্যালয় ও অত্র এলাকার ইতিহাসকে কেন্দ্র করে। উল্লেখ্য যে, বাংলার পাল রাজাদের চারশত বছরের রাজত্বকালে ভারত-বাংলায় জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিক্ষা-সংস্কৃতি, সাহিত্য-দর্শন ও শিল্প-ভাস্কর্যের অভাবনীয় উন্নতি সাধিত হয়। পাল বংশের স্বর্ণযুগ স্রষ্টা দ্বিতীয় ধর্মপাল (৭৭০-৮১০) খ্রিষ্টীয়  অষ্টম শতাব্দীতে তাঁর সমগ্র সাম্রাজ্যে যে ৫০টি সংঘরাম প্রতিষ্ঠা করেন। তন্মধ্যে অন্যতম এই পন্ডিত বিহার। এটা ছিল নালন্দা, সোমপুর, তক্ষশীলা প্রভৃতি মহাবিহার বা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমপর্যায়ের। তিব্বতের বিশ্ব বিশ্রুত ঐতিহাসিক লামা তারানাথের (১৬০৮ খ্রিঃ) “হিস্ট্রি অব বুড্ডিজম” গ্রন্থে এই বিহার চট্টগ্রামে অবস্থিত ও সম্রাট ধর্মপালের অন্যতম মহৎর্কীতি বলে উল্লেখ করেন।
তিব্বতী সূত্র থেকে জানা যায় প্রাচীনকালে বৌদ্ধ শাস্ত্র অধ্যয়ন, রচনা, অনুবাদ ও চর্চা করা হতো এসব বিহারে। চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাং সপ্তক শতকে পুন্ড্রবর্ধনে বিশটি বিহার, সমতটে ত্রিশটি, তাম্রলিপিতে দশটি, কজঙ্গলে ছয়-সাতটি এবং কর্ণসুবর্ণে দশটি বিহার দেখতে পান। প্রখ্যাত বৌদ্ধ বিহারের মধ্যে ছিলো মগধ বা দক্ষিণ বিহারস্থিত নালন্দা, বিক্রমশীলা এবং তদন্তপুরা। সেই সময় পূর্ববঙ্গের আরো কয়েকটি বিহার বর্তমান ছিল। তাদের মধ্যে ঢাকার অদূরে বিক্রমপুরী বিহার, কুমিল্লার সন্নিকটে পট্টিকের কনকস্তুপ বিহার ও চট্টগ্রামের পন্ডিত বিহার উল্লেখযোগ্য (কর্ণফুলী বহমান- সম্পাদক, সরোজ রঞ্জন চৌং, কলি- ২০০৪, পৃ-৩১)। খ্রিষ্টীয় অষ্টম শতাব্দী থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত পাল, চন্দ্র, দেব, আরাকানি প্রভৃতি বৌদ্ধ রাজন্যবর্গের পৃষ্ঠপোষকতায় এই পন্ডিত বিহার সগৌরবে তার অস্তিত বজায় রেখেছিল।
বর্তমান পটিয়া থানার অন্তর্গত বড় উঠান ছিল এককালে বৌদ্ধ রাজা কান্তিদেবের রাজধানী। বড় উঠান এলাকায় দেয়াং পাহাড়ের একটি অংশের নাম বিশ্বমুড়া। এখানে আরকান রাজ বিক্রম রাজার বাড়ি ছিল। তাঁর নামানুসারে দেয়াং পাহাড়ের একটি অংশের নামকরণ করা হয় বিশ্বমুড়া। এখানে খনন কাজ করলে এখনো পাকা ইটের দেয়াল ও ছোট আকারের বুদ্ধমূর্তি পাওয়া যায়। বাংলাদেশ ডিসটিক গেজেটিয়া ১৯৭৫ অনুসারে দেয়াং পাহাড়েই ছিল সেই বিশ্ব বিখ্যাত পন্ডিত বিহার। এই বিহারের প্রথম উপাচার্য ছিলেন চট্টগ্রামের চক্রশালা গ্রামের কৃতি সন্তান মহাপন্ডিত প্রজ্ঞাভদ্র। যাঁর শিষ্য ছিলেন আরেক মহাপন্ডিত অতীশ দীপংকর। যাকে গৌতমবুদ্ধের পর সম্মান করে চীনের মানুষ।
দেশ-বিদেশ থেকে বিভিন্ন জ্ঞানী- গুণি, চুরাশি সিদ্দাচার্যগণ এই বিদ্যাপীঠে বসে চর্যাগীতি বা চর্যাপদ রচান করেন। এ চর্যাপদ বা চর্যাগীতি থেকে পরবর্তীকালে বাংলা ভাষার গোড়াপত্তন হয়। কাল প্রবাহে হারিয়ে যাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়টি পুনঃ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ লক্ষে বিগত ২০১০ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার সফরসঙ্গী হিসেবে চীন দেশে যান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচ্যভাষা (পলি-সংস্কৃত) বিভাগের চেয়ারম্যান ড. জিনবোধি ভিক্ষু। সেখানে বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং চীনের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর যৌথ সম্মতি এবং আন্তরিক সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি এবং আশ্বাসের প্ররিপ্রেক্ষিতে নতুন করে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার জন্য বিগত ১৫/০৬/২০১১ ইং তারিখে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বরাবরে আবেদন জানানো হয়।
এই আবেদনের প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য ২০১২ সালের ৪ আগষ্ট শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের সম্মানিত সচিব মহোদয়ের মতামত চেয়ে পত্র দেওয়া হয়। গত ২০/১১/২০১১ ইং তারিখে অত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয় এবং বিভিন্ন বৌদ্ধ দেশ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলাম সংগ্রহ করা হয়। ২০১৩  সালের ২৩ জানুয়ারী অত্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য একটি আইন মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর সভাপতিত্বে বিভিন্ন মন্ত্রানলয়ের প্রতিনিধি বর্গের উপস্থিতিতে ‘আইন ২০১২ইং’ নামে অনুমোদন করা হয়।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিতায় আপাতত পঞ্চাশ (৫০) একর জমি নির্দিষ্টকরণ করা হয় এবং সরকারিভাবে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বিদায় সরকারি খাস জমি ও কৃষি জমিতে স্থান নির্ধারন করা হয়। তাছাড়া ০৮/০৪/২০১৩ সালে এটির নির্মাণ ব্যয় ধরা হয় ৫৬০ কোটি টাকা।
সম্প্রতি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য এবং প্রত্ন সম্পদ পুনরুদ্ধারে জন্য সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রালয়ের মাননীয় মন্ত্রীর সভাকক্ষে এক সভা ২০১৭ সালের ১৫ জানুয়ারী অনুষ্ঠিত হয়। ওই বছরের ২৮ মার্চ ড. জিনবোধি ভিক্ষু মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিকট তাঁর প্রতিশ্রুতি ও আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে “আন্তজার্তিক পন্ডিত বিহার বিশ্ববিদ্যালয়” সরকারি ভাবে স্থাপন ও পরিচালনার অনুমতি প্রদানের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিকতা পূর্ণ হস্তক্ষেপ ও প্রয়োজনীয় নির্দেশনাসহ পদক্ষেপ গ্রহনের জন্য তাঁর সদয় সৃষ্টি কামনা করে আবেদন করেন।
সরকারি ভাবে নেওয়া এই উদ্যোগটি অনিশ্চয়তার মুখে পড়ার অন্যতম কারণ বরাদ্দকৃত ভূমিতে সরকারের আরেকটি মন্ত্রনালয় কর্তৃক গুচ্ছ গ্রাম প্রতিষ্ঠা এবং সড়ক ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয় কর্তৃক নদী গর্ভে নিমির্তব্য প্রস্তাবিত টানেল নদীর ঐ পাড়ে বরাদ্দকৃত স্থানে দিয়ে উঠতে পারে বলে শুনা যাচ্ছে। অর্থাৎ সরকারের আন্তঃমন্ত্রনালয় সমূহের মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে একটি মহতী কাজটি এখনো ফাইল বন্ধী হয়ে আছে।
এই প্রত্ন এলাকার কাজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ স্থবির হয়ে থাকায় এই প্রসঙ্গে সর্ব মহলের দৃষ্টি আর্কষনের লক্ষ্যে নাট্যকার আহাম্মদ কবির রচনা করেছেন- “পন্ডিত বিহার বিশ্ববিদ্যালয়” নামের মঞ্চ নাটকটি। লিখিত পান্ডুলিপি অবলম্বনে নাট্যকলা বিভাগের অতিথি শিক্ষক মোস্তফা কামাল যাত্রার তত্ত্বাবধানে ৩য় ব্যাচ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের বি.এ. (সম্মান) শ্রেণির ‘দেশজ নাট্য’ শিরোনামের ব্যবহারিক কোর্স প্রযোজনা হিসাবে বিগত ২৯ মার্চ ১৭, সকাল ১০ টায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় নাট্যকলা বিভাগস্থ জিয়া হায়দার থিয়েটার স্টুডিওতে নাটকটি মঞ্চায়িত হয়।
দেশজ নাট্যের অন্যতম প্রাচীন নাট্য আঙ্গিক “সভা নাটক” আঙ্গিকে নির্বান নাট্য রীতিতে অভিযাত্রামূলক পরিবেশ শৈলীতে এই নাটকটি পরিবেশিত হয়। দেশজ নাট্য বলতে এই রাষ্ট্রের সীমারেখায় বসবাসকারী জাতি-উপজাতি তথা নৃ-গোষ্ঠীসমূহের রচিত নাট্যশৈলী গুলোর একটি সমন্বিত রূপ। এই স্বরূপ নির্মাণে প্রাচনীকালে এতদ্ব অঞ্চলে জাত প্রথাভিত্তিতে যে সামাজিক বিভাজন সৃষ্টি হয়েছিল তাকে প্রাধান্য দিয়ে তাদের একক বৈশিষ্ট্যমন্ডিত নাট্য ঘরনার সংশ্লেষণে একটি সম্মিলিত নাট্য ধারার উদ্ভব ঘটায়। যাতে নব্যনাট্য এর প্রকৃতি জাতী সত্তার উর্ধে ওঠে দেশজ চরিত্র ধারণ করতে সামর্থ্য হয়।
‘পন্ডিত বিহার বিশ্ববিদ্যালয়’ নাটকটিতে অভিনয় করেছে ৪র্থ বর্ষ বি.এ. সম্মান শ্রেণির সকল  শিক্ষার্থী সহ এম.এ. স্নাতোকোত্তর বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী
নির্দেশকের বক্তব্যঃ 
বাংলা সাহিত্যের আদি নির্দশন চর্যাপদ রচয়িতাদের বিদ্যাপীঠ ছিল পন্ডিত বিহার বিশ্ববিদ্যালয়। যা ৭ম/৮ম শতকের দিকে আনোয়ারাতে প্রতিষ্ঠিত হয়। বিদেশি বিভিন্ন জাতি, ধর্ম গোষ্ঠির আক্রমনে বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাই এই বিহারটি। কিন্তু শিক্ষাবান্ধব বর্তমান সরকার চট্টগ্রামের  আনোয়ারাতে সেই বিশ্ববিদ্যালয় পূণঃস্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
২০১০ সালে ড. জিনবোধি ভিক্ষুর প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠিত হতে যাওয়া সেই শিক্ষা বান্ধব উদ্যোগটি স্থানীয়, জাতীয় এবং আর্ন্তজাতিক নানা টানাপোড়নে কাজটি ফাইল বন্ধী হয়ে আছে। বাংলা ভাষার আদি গ্রন্থ চর্যাগীতের বহুমাত্রিক পাঠ এবং সেই গীত রচয়িতাদর জীবনাচার ও জীবন দর্শনের পাশাপাশি তৎকালীন ভূ-প্রকৃতি, সমাজ, ব্যবস্থা ও রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের নানান গতি প্রকৃতি জানতে হলে প্রয়োজন চর্যা ভিত্তিক সৃজনশীল কর্মকান্ড বাড়ানো। এই কর্মকান্ড করতে গিয়ে ইতোমধ্যে রচিত হয়েছে বেশ কিছু প্রত্ননাটক যার ধারাবহিকতায় আলোচ্য নাট্য নিমার্ণের সুত্রপাত ঘটে।
কৃতজ্ঞ নাট্যকার আহাম্মদ কবির এবং নাট্য প্রযোজনার সুযোগ সৃষ্টিকারী প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের সকল সম্মানিত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের কাছে। যাদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফল আজকের এই অভিযাত্রামূলক  নাট্য প্রয়াস। বিদ্যায়তনিক পাঠ্যক্রমের বিবেচনায় নাটকটির উপস্থাপনায় খুবই সচেতন ভাবে বাংলা নাট্যের সু-প্রাচীন আঙ্গিক ‘সভা নাটক’ ধারনার সচেতন রূপায়ন যেমন ঘটিয়েছি তেমনি মধ্যযুগের পূর্বে যে বাংলা নাটকের বিশেষ একটি রীতির অনুশীলন ছিল তা দৃশ্যমান করার চেষ্টা করেছি। সেই নাট্য রীতির মৌলিক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ‘নির্বানত্ব’। যাকে আমি নির্বান নাট্য অভিধায় চিহ্নিত করতে আগ্রহী।
সমকালে অপর চিহ্নিত বুদ্ধ নাটক ধারণার সাথে যার কোন মিল নেই। বুদ্ধ নাটক বাংলা নাট্য ধারার প্রাচীনতম ধারা। এ ধরনের নাট্য ধারায় মূলত গৌতমবুদ্ধের জীবন, ধর্ম নিয়ে আলোকপাত হয়। কিন্তু ‘নির্বান নাট্য’ হলো চুড়ান্ত ‘নির্বান’ স্তরে পৌঁছাতে সৃজনশীল কৃত্যমূলক উপস্থাপনা।
যা বনর্ণাত্মক নয়, গীতাত্ত্বক ধারায় পরিবেশিত হয়। এত অংশগ্রহণকারী ও দর্শক উভয় পক্ষই ভোগ ও উপভোগের মধ্য দিয়ে স্ব-স্ব নির্বান প্রবণতায় প্রসার ঘটাতেন। নাটকটি নির্মাণে সচেতনভাবে সেই প্রয়াসকে দৃশ্যমান করার চেষ্টা করেছি।
নাট্যকারের মন্তব্যঃ 
নাট্যকলা বিভাগের ‘দেশজ নাট্য’ কোর্সের মাঠ পরিদর্শন প্রক্রিয়ার ২য় পরিভ্রমণের অংশ হয়েছিলাম বিভাগীয় অতিথি শিক্ষক মোস্তফা কামাল যাত্রার অনুরোধে। ব্যক্তিগত আগ্রহের কারণে শত ব্যবস্থার মাঝেও পন্ডিত বিহার নামের হারিয়ে যাওয়া শিক্ষালয়ের অনুসন্ধানে অভিযাত্রী দলের সঙ্গী হয়েছিলাম।
বাংলার শিক্ষার্থী হিসাবে চর্যাপদ পাঠ্য বিষয় হিসাবে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমাকে অধ্যায়ন করতে হয়েছিল। চর্যার অনেক পদকর্তা পন্ডিত বিহারে সিদ্ধাচার্য ছিলেন এটা জানতাম এবং বিভিন্ন দৃষ্টি ভঙ্গিতে চর্যা পঠন-পাঠনে আগ্রহ বরাবরই ছিল। কিন্তু এর অবস্থানে গড়ে উঠা ও ধ্বংস হওয়া সম্পর্কে তেমন কোন আগ্রহ ছিল না।
কিন্তু যখন নাট্যকলার শিক্ষার্থীদের সাথে অনুসন্ধান প্রক্রিয়ায় যুক্ত হলাম এবং দেয়াং অঞ্চলের নানান স্থানে ঘুরে বেড়াতে গিয়ে এ প্রসংগে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি হয় এবং যাত্রা সাহেবের পক্ষ থেকে দেয়া চাহিদার কারণে ‘পন্ডিত বিহার বিশ্ববিদ্যালয়’ নাটকটি রচনা করি। অল্প সময়ে ইতিহাসের পাশাপাশি চর্যাপদ উপজীব্য করে নাট্য উপস্থাপনায় সংশ্লেষণ ঘটাতে গিয়ে আবিস্কার করি এক ভিন্নতর নাট্য ভাবনার। যার গ্রন্থীত রূপ হচ্ছে নাটক ‘পন্ডিত বিহার বিশ্ববিদ্যালয়’।
লেখকের বক্তব্যঃ 
নাট্যকার আহম্মদ কবীরের আমন্ত্রণে নাটকটি উপভোগ করতে গিয়ে নাটকীয় পরিবেশনা ও ব্যাঞ্জনা দৃশ্য গ্রাহ্য হয়েছে তা থেকে আমার ব্যক্তিগত উপলদ্ধি হলো অনতি বিলম্বে সরকারের যথাযথ কর্তৃপক্ষের মধ্যকার আন্তবিরোধ এবং শিক্ষাকে প্রাইভেটাইজেশন করার হীন চেষ্টায় লিপ্ত কর্তা ব্যক্তিদের দূরভীসন্ধিকে দুমড়ে মুছড়ে  দিয়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসাবে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি আন্তজার্তিক মানে করে প্রতিষ্ঠা করা। যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ ছাড়া সম্ভব নয়।
নাট্য প্রযোজনা ও নাট্য শৈলী নিয়ে মন্তব্য করার লোক আমি নয়। তবে বাংলা সাহিত্যের শিক্ষার্থী হিসাবে বলতে পারি নাটকটির ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যগত মূল্য অপরিসীম।
ধন্যবাদ নাট্যকার আহাম্মদ কবীরকে। কৃতজ্ঞতা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় নাট্যকলা বিভাগকে ব্যাতিক্রমি এই নাট্য প্রদর্শনীর সফল ও ফলপ্রসূ আয়োজনের জন্য। বিভিন্ন পর্যায়ে প্রত্ন নাটকটি প্রদর্শনীর ব্যবস্থা হলে নাট্য প্রসঙ্গে ব্যাপক ভাবে জনমত গঠন ও সচেতনতা সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।
প্রদর্শনী শেষে নাট্যকলা বিভাগের সভাপতি নাট্য পরিচালক অসীম দাশ, নাট্য শিক্ষক আরজানা আফরীন, নাট্যকার আহাম্মদ কবীর ও প্রাচ্য বিভাগের সভাপতি ড. জিনবোধি ভিক্ষুর বক্তব্যে সেই সুরই প্রতিধ্বনিত হয়েছে।
  লেখক: হামীম রায়হান, ছাত্র, বাংলা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।মোবাইল: ০১৮১৫-০২২৪৩৩, E-mail : hrkhan.patiya@gmail.com

সর্বশেষ

পাঠ্যপুস্তক

রতন চন্দ্র পাল, অতিথি লেখক: মানব সভ্যতার শ্রেষ্ঠ প্রকাশ...

ইজারাদারদের দাবি, সাতকানিয়া দেওয়ানহাট বাজার পরিচালনায় সুশাসন নিশ্চিতকরণের

অনলাইন ডেস্ক: সাতকানিয়ার দেওয়ানহাট বাজার পরিচালনায় সুশাসন নিশ্চিতকরণের দাবী...

যুক্তরাষ্ট্র আ.লীগের কৃষি বিষয়ক সম্পাদক নিযুক্ত সঞ্জয় কুমার সাহা

পূর্বকাল ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের কৃষি বিষয়ক সম্পাদক...

সাতকানিয়ার কেরানীহাটে আশ্-শেফা স্কুল এন্ড কলেজে নাতে রাসুল (সাঃ) প্রতিযোগিতা সম্পন্ন

এস এম আনোয়ার হোসেন, দক্ষিণ চট্টগ্রাম: পবিত্র রবিউল আউয়াল...

আ.লীগের কেন্দ্রীয় তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক উপকমিটির সদস্য হলেন বিধান রক্ষিত

নিজস্ব প্রতিবেদক: আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক...
spot_img