নিজস্ব প্রতিবেদক: জাপান থেকে ‘ইউজড স্পেয়ার পার্টস’ বা পুরোনো গাড়ির যন্ত্রাংশের ঘোষণা দিয়ে আনা হয়েছিল একটি কন্টেইনার। চট্টগ্রাম বন্দরে এক মাসের বেশি সময় পড়ে থাকার পরও আমদানিকারক বিল অব এন্ট্রি দাখিল না করায় সন্দেহ হয় কাস্টমস গোয়েন্দাদের। পরে কন্টেইনার খুলতেই মিলেছে লেক্সাস ও বিএমডব্লিউসহ বিলাসবহুল গাড়ির গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন যন্ত্রাংশ।কাস্টমসের প্রাথমিক মূল্যায়নে পুরো চালানটির সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ৯ কোটি ৫০ লাখ থেকে ১২ কোটি টাকা।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) চট্টগ্রাম বন্দরে অভিযান চালিয়ে এসব যন্ত্রাংশ জব্দ করেছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর (সিআইআইডি)। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
পুরোনো স্পেয়ার পার্টসের ঘোষণা, মিলল বিলাসবহুল গাড়ির অংশ
কাস্টমস গোয়েন্দা সূত্র জানায়, জাপান থেকে আসা চালানটির কাগজপত্রে পণ্য হিসেবে ‘ব্যবহৃত স্পেয়ার পার্টস’ উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে কন্টেইনার বন্দরে পৌঁছানোর পর এক মাসেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও আমদানিকারকের পক্ষ থেকে কোনো বিল অব এন্ট্রি দাখিল করা হয়নি।
বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় গোপন তথ্যের ভিত্তিতে কন্টেইনারটির ওপর নজরদারি শুরু করেন কাস্টমস গোয়েন্দারা। পরে কন্টেইনারের সিল খুলে কায়িক পরীক্ষা চালানো হলে ঘোষণার সঙ্গে পণ্যের ব্যাপক অসঙ্গতি ধরা পড়ে।
কন্টেইনারে সাধারণ ব্যবহৃত যন্ত্রাংশের বদলে পাওয়া যায় লেক্সাস এলএক্স ৬০০, লেক্সাস এসসি ৪৩০ ও বিএমডব্লিউ এম৫ মডেলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ।এ ছাড়া হোন্ডা বি১৮সি টাইপ-আর ইঞ্জিন, ফ্রন্ট হাফ বা হাফ-কাট, ব্যবহৃত টায়ারসহ বিপুল পরিমাণ মেকানিক্যাল পার্টস উদ্ধার করা হয়েছে।
যন্ত্রাংশ জোড়া দিলে তৈরি হতে পারে গাড়ি?
কাস্টমস কর্মকর্তারা বলছেন, বিচ্ছিন্ন অবস্থায় এসব যন্ত্রাংশ আমদানি করা হলেও সেগুলো একত্র করলে পূর্ণাঙ্গ গাড়ির বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায় কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এ জন্য উদ্ধার করা যন্ত্রাংশের মেকানিক্যাল নম্বর, চেসিসের কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য ও অরিজিনাল মার্কিং পরীক্ষা করা হচ্ছে। যানবাহন বিশেষজ্ঞ ও অটোমোবাইল প্রকৌশলীদের সহায়তায় এসব অংশে পূর্ণাঙ্গ গাড়ির ‘এসেনশিয়াল ক্যারেক্টার’ বা আবশ্যকীয় বৈশিষ্ট্য রয়েছে কি না, তাও যাচাই করা হচ্ছে।
নিলামের সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল?
চালানটি দীর্ঘ সময় বন্দরে ফেলে রেখে বিল অব এন্ট্রি দাখিল না করার পেছনে কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য ছিল কি না, তা তদন্ত করছে কাস্টমস গোয়েন্দারা।
প্রাথমিক অনুসন্ধানে কর্মকর্তাদের ধারণা, নিয়মিত আমদানি প্রক্রিয়ায় শুল্ক-কর পরিশোধ এড়িয়ে চালানটিকে পরিত্যক্ত দেখিয়ে পরবর্তী নিলাম প্রক্রিয়ার সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা হয়ে থাকতে পারে।
তবে তদন্ত এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। চূড়ান্ত তদন্তের আগে এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
১২ কোটি টাকার চালান, খতিয়ে দেখা হচ্ছে অর্থের উৎসও
জব্দ করা পণ্যগুলোর প্রকৃত মূল্য নির্ধারণের পাশাপাশি চালানটির আমদানি মূল্য, ইনভয়েস, ব্যাংক পেমেন্ট ও বাণিজ্যিক নথিপত্র যাচাই করছে কাস্টমস।
এত বড় মূল্যের চালান কীভাবে আমদানি করা হয়েছে, এর অর্থের উৎস কী এবং বিদেশি সরবরাহকারীর সঙ্গে আমদানিকারকের সম্পর্ক কী—এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে।
একই সঙ্গে চালানটির সঙ্গে অবৈধ অর্থ পাচার বা মানি লন্ডারিংয়ের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তদন্ত শেষে ব্যবস্থা
বর্তমানে জব্দ করা পণ্যের প্রকৃত পরিচয়, সঠিক এইচএস কোড ও প্রযোজ্য শুল্ক-কর নির্ধারণের কাজ চলছে।তদন্তে পণ্যের প্রকৃত পরিচয় গোপন, ভুল ঘোষণা, শুল্ক ফাঁকি বা অন্য কোনো আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট আমদানিকারক ও জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চট্টগ্রাম বন্দরের এই চালান ঘিরে এখন কাস্টমসের সামনে বড় প্রশ্ন—পুরোনো গাড়ির পার্টসের ঘোষণার আড়ালে কি কোটি টাকার বিলাসবহুল গাড়ির যন্ত্রাংশ কম শুল্কে বা নিলামের মাধ্যমে খালাসের চেষ্টা হয়েছিল? তদন্তেই মিলবে সেই উত্তর।


