বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ৩, ২০২৬
spot_img

সময়ের কথন :: আমার দেশ-আমার গর্ব : কৃষক ও কৃষিবিদ

ডা. কিউ.এম. অহিদুল আলম: ৯০ এর দশকে সমাজতান্ত্রিকবিশ্বের পতনের অনেক কারণের মধ্যে একটা কারণ ছিল শিল্প ও কৃষির অসম উন্নয়ন। বুলগেরিয়া ও হাংগেরী ছাড়া রাশিয়াসহ সব দেশে শিল্পে অভাবণীয় উন্নতির পাশাপাশি কৃষি- উৎপাদন ছিল কম। ফলে খাদ্যঘাটতি গণ-অসন্তোষে রূপ নেয়। কিন্তু বুলগেরিয়া ও হাংগেরিতে শিল্প ও কৃষি সমান তালে এগিয়ে ছিল বলে খাদ্য-অসন্তোষ কম ছিল। এ কথা শুনানোর কারণ হচ্ছে ৭২ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে ট্রেডিং সেবা ও শিল্পে বিনিয়োগ হলেও কৃষিতে কম বিনিয়োগ ছিল। কিন্তু দেশর পেশাজীবীদের মধ্যে কৃ ষিবিদরা গবেষণালব্দ বিভিন্ন উৎপাদনমুখী উদ্ভাবনীর বিস্তার ও প্রয়োগের ফলে বাংলাদেশ অতি অল্পসময়ে কৃষিতে এক ঈর্ষণীয় সাফল্য তৈরি করে। বাংলাদেশে মোট শ্রমশক্তির ৪৫% অর্থাৎ ৩ কোটি ১৯ লাখ ২০ হাজার মানুষ কৃষিকাজে নিয়োহিত। ৩৮% মানুষ সেবাখাতে নিয়োহিত। কিন্তু শিল্পখাতে ২৩-২৪% প্রবৃদ্ধি হয়েছে, ৩.৫১% সেবাখাতে প্রবৃদ্ধি ২৪-২৫ সালে কৃষিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৩.৩৭% । তাহলে দেখা যাচ্ছে, বিনিয়োগ কম হয়ছে কৃষিতে। তারপর ও কৃষিতে যত সাফল্য এসেছে শিল্প ও সেবাখাতে তত সাফল্য আসেনি। কৃষিখাতে সাফল্যের মূল কারিগর কৃষিবিদ গবেষক ও মাঠের কৃষকরা।
কৃষির উপখাতগুলো হচ্ছে ধান ও খাদ্য চাষ, সবজি, মাছ, পশুপালন। আমাদের বিজ্ঞানীরা ধান উৎপাদনে প্রধান প্রতিকূলতা চিহ্নিত করে সেই প্রতিকূল অবস্থার সহনশীল গম ধান উদ্ভাবন করে, আবার উচ্চফলনশীল জাত ও তাদের টার্গেট ছিল। তাই বন্যা, খরা, লবণাক্ততা সহনশীল নতুন জাতের ধান বীজ কৃষকদের মাঝে বিতরণ করা হচ্ছে এবং প্রত্যক্ষ ফল ও দৃশ্যমান। কৃষিতে অভাবনীয় সাফ্যলের কৃতিত্ব সরকারেরও, যেমন দুই মেয়াদে চার দফায় সারের দাম কমানো, ২) ১০ টাকা দিয়ে প্রায় দুই কোটি কৃষককে ব্যাংক একাউন্ট খোলা, ৩) কার্ডধারী কৃষকদের মাঝে কমমূল্যে কৃষিবীজ ও উপকরণ বিক্রি, ৪) দেশের ৩৫টি জেলায় ২৫% ভর্তুকি দিয়ে ট্রাক্টর, পাউয়ার টিনার, হারভেস্টার, সার, উন্নত বীজ প্রদান। স্বাধীনতার পর ধান উৎপদান বেড়েছে ৩ গুন, সবজি ৫ গুন ভুট্টা ১০ গুন । এই সাফল্য মেধাবি ও গবেষক কৃষিবিদ ও গরিশ্রমী কৃষকের কারণে এবং সরকারের কৃষিবান্ধব কিছু নীতির ফলে ।
ভুট্টা উৎপদানের বিশ্বে গড় ৫.১২ টন প্রতি হেক্টরে। বাংলাদেশের গড় ৬.৯৮ টন। প্রধান খাদ্যশস্য উৎপাদনকারী দেশের তালিকার এখন বাংলাদেশ ও যুক্ত, খাদ্যশস্য উৎপদনে বাংলাদেশর প্রতি হেক্টরে গড় ১০.৩৪ টন । আমাদের উপরে কেবল যুক্তরাষ্ট্র, আমাদের পরে ২ নং এ ব্রাজিল। সবজি উৎপদনে বংলাাদেশ পৃথিবীতে তৃতীয়। এক সময় সবজি উৎপাদনের কেন্দ্র ছিল মধ্য ও উত্তর বঙ্গ, যশোর, কুমিল্লা । এখন সারা দেশে সবজিবিপ্লব হয়ে গেছে। দেশে ৬০ ধরনের ও ২০০ প্রজাতির সবজি উৎপাদিত হচ্ছে। ১৯৯৪ সালে মাথাপিচু সবজি খাওয়া হত দৈনিক ৪২ গ্রাম। ২০১৫ সালে তা ৭০ গ্রাম, ২০২৩ সালে তা ৭৮ গ্রাম এ এসে দাড়িয়েছে। মাছে-ভাতে বাঙালি আসলেই সত্য। মোট ৭৩৫ প্রজাতির মাছ লিপিবদ্ধ আছে। ১৬০ প্রজাতির সুস্বাদু পানির, ৪৭৫ প্রজাতির সামুদ্রিক, সুস্বাদু পানির মাছ উৎপদানে বাংলাদেশ পৃথিবীতে ২য়। ৬৮ পদের মাছ বিপন্ন বা বিলুপ্ত। ৪১ পদের মাছ মৎস্যবিজ্ঞানীরা পুনরুদ্ধার করেছে। ১২ প্রজাতির বিদেশি মাছ বিজ্ঞানীরা সফলভাবে চাষ ও উৎপদান করে শিখিয়েছে বংলাদেশে। ২০২২ সালে বিশ্ব খাদ্য সংস্থা পূর্বাভাস দিয়েছিল ২০৩০ সালে নগদ ৪টি দেশী মাছ উৎপদানে বিপুল সাফল্য পাবে। বর্তমান স্বাদু পানির মাছ উৎপদানে আমরা ১ম। আর মোট উৎপদানে আমরা ৫ম। স্বাধীনতার পর মাছ রপ্তানি বেড়েছে ১৩৫ গুন। গবাদি ও প্রাণীসম্পদে সাফল্য এদেশের উদ্যোক্তাদের এক অনন্যসাফ্যল্যের কাহিনী। ভারতীয় গরু ছাড়া বংলাদেশের মানুষকে গোমাংস খাওয়া ভুলে যাবে-ভারতীয় রাষ্ট্রীয় নেতাদের এমন দম্ভোক্তি আজ এক হাসির উক্তিতে পরিণত হয়ছে। বাংলাদেশে গরুশুমারি হয় ১০ বছর পর পর। ২০১৯ সালে সর্বশেষ শুমারি হয়। বছর ওয়ারী গোখামার বৃদ্ধি অনুসারে ২০২৪ সালের গরু উৎপাদন দ্বিগুন হয়ে গেছে। ৭-৮ বছর আগে ভারত-মিয়ানমার থেকে বছরে ২৫-৩০ লাখ গরু আসত। বছরদশকে গরু উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে ১৪২%। ১০ বছর আগে মাংস উৎপাদন হত ৪৫ লাখ টন। এখন উৎপদান হয় ৮৭ লাখ টন, দুধ উৎপদান ১০ বছর আগের তুলনায় ৪- সাড়ে ৪ গুন বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্ল্যাক গোট বা কালোছাগল উৎপাদনে বাংলাদেশের বিশ্বে ৪র্থ। আর গরুর সংখ্যায় আমরা ১২তম। আম, রেড ড্রাগন, কেসুনাট, ষ্ট্রবেরি, কমলা, উৎপাদনে প্রশংসনীয় অগ্রগতি হচ্ছে। ২০২৬ সালে পুরো আমের মৌসুমে রাজশাহী, সাতক্ষীরার আম চট্টগ্রামের বাজারে খুবই কম ছিল। পুরো চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামে কৃষি কর্মকর্তাদের তত্বাবধনে ব্যাপক আমচাষ ও ফলন হয়। মৌসুমের শুরু থেকে এখন অবদি আম্রপালি, রূপালি, বারী-৪, কাটিমন জাতের আম এখনও বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। দাম ও সাধারণের, নাগালের ভিতর, রাজশাহি, চাপাইনবাবগঞ্জ ও সাতক্ষীরার আম বর্তমান চট্টগ্রামে উৎপাদিত আমের তিনগুন বেশি দাম। বিশ্বখ্যাত চেইন সপ ওয়ালমাট ২০১৫ সাল থেকে বাংলাদেশী আম বাজারজাত করে আসছে।
আগে ২০টি দেশ থেকে আলু আমদানি হত। এখন মালেশিয়া, নেপাল, শ্রীলংক্ষা, সিংগাপুর, ভিয়েতনাম, সৌদি আরব, দুবাই, বাহারাইন ও রাশিয়ায় আলু রপ্তানি হয়। বাংলাদেশের কৃষকরা আধুনিক প্রযুক্তি কৃ ষিতে ব্যবহারে মাঠপর্যায়ে ট্রেনিং পাচ্ছে। মোবাইল ডিভাইসের মাধ্যমে ফসলের রোগ নির্ণয়, বাজারদর, আবাহাওয়া ইত্যাদি শিখছে। এখন ড্রোন ইমেজিং, স্যাটেলাইট মনিটরিং, রিমোট সেনসিং জমিতে কোন ধরনের ফসল, কোন সময় লাগাবে তাও কৃষকদের অবহিত করছে। অও এর মাধ্যমে কৃষিবিদরা জেনে মাঠপর্যায়ের কৃষকদের জানাচ্ছে। বাংলাদেশের কৃষিবিদদের ক্লাইমেট এগ্রিকালচারেল মডেল, ডিপ সেচ ব্যবস্থা ও সোলার বা সৌরকৃষি ব্যবস্থাপনা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। এদেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে গর্ব করার বিষয় কম, কিন্তু কৃষক ও কৃ ষিবিদরা যে অভাবনীয় কাজ করে দেশে খাদ্য উৎপদান বৃদ্ধি করে যাচ্ছে তা আমাদের গর্ব। স্যালুট টু কৃষক ও কৃষিবিদ।
ডা. কিউ.এম অহিদুল আলম বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, কলামিস্ট।

সর্বশেষ

পাঠ্যপুস্তক

রতন চন্দ্র পাল, অতিথি লেখক: মানব সভ্যতার শ্রেষ্ঠ প্রকাশ...

ইজারাদারদের দাবি, সাতকানিয়া দেওয়ানহাট বাজার পরিচালনায় সুশাসন নিশ্চিতকরণের

অনলাইন ডেস্ক: সাতকানিয়ার দেওয়ানহাট বাজার পরিচালনায় সুশাসন নিশ্চিতকরণের দাবী...

যুক্তরাষ্ট্র আ.লীগের কৃষি বিষয়ক সম্পাদক নিযুক্ত সঞ্জয় কুমার সাহা

পূর্বকাল ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের কৃষি বিষয়ক সম্পাদক...

আ.লীগের কেন্দ্রীয় তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক উপকমিটির সদস্য হলেন বিধান রক্ষিত

নিজস্ব প্রতিবেদক: আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক...

সাতকানিয়ার কেরানীহাটে আশ্-শেফা স্কুল এন্ড কলেজে নাতে রাসুল (সাঃ) প্রতিযোগিতা সম্পন্ন

এস এম আনোয়ার হোসেন, দক্ষিণ চট্টগ্রাম: পবিত্র রবিউল আউয়াল...
spot_img