অনলাইন ডেস্ক: ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে সংখ্যালঘু-সংখ্যাগুরু বিভাজনের পরিবর্তে জাতীয় পরিচয়কে সামনে রেখে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, রাষ্ট্রের কাছে নাগরিকের ধর্মীয় পরিচয় নয়, তার বাংলাদেশি পরিচয়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দেশের প্রতিটি মানুষের অধিকার সমান এবং নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকারও সবার রয়েছে।
শুভ জন্মাষ্টমী উপলক্ষে গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে সনাতন ধর্মাবলম্বী বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় এবং পুরোহিত ও সেবাইতদের মধ্যে সম্মানী বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
তারেক রহমান বলেন, বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় কাউকে শুধু সংখ্যালঘু কিংবা সংখ্যাগুরু হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার বিষয়টি মুখ্য নয়। দেশের বাইরে গেলে একটি দেশের সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠীর মানুষও অন্য দেশে সংখ্যালঘু হিসেবে বিবেচিত হতে পারেন। তাই বিভাজনের এই পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে প্রত্যেককে নিজের সবচেয়ে গর্বের পরিচয় হিসেবে বাংলাদেশিকে ধারণ করতে হবে।
শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাবের প্রসঙ্গ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে মথুরায় শ্রীকৃষ্ণের জন্ম হয়। প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার বছর আগে তার আবির্ভাবের সময় মথুরার শাসক ছিলেন অত্যাচারী ও স্বৈরাচারী কংস। শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাবের পর কংসের পতন ঘটে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস অনুযায়ী, অন্যায়ের বিনাশ এবং ন্যায় ও সত্যের প্রতিষ্ঠাই ছিল শ্রীকৃষ্ণের অন্যতম আদর্শ।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে এই প্রসঙ্গের তুলনা করে তারেক রহমান বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে দেশের গণতন্ত্রকামী মানুষের অধিকার কেড়ে নিয়ে একটি নিষ্ঠুর ও স্বৈরাচারী শাসন জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পরে দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে গণতন্ত্রকামী মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সেই শাসনের অবসান ঘটিয়েছে। হাজারো মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে দেশে আবারও গণতন্ত্রের পথচলা শুরু হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, গণতন্ত্রের নতুন যাত্রার পাশাপাশি এখন রাষ্ট্র পুনর্গঠনের কাজ এগিয়ে নিতে হবে। ভঙ্গুর অর্থনীতি, প্রশাসনের বিভাজন এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করে একটি স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলাই সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।
ধর্মীয় সম্প্রীতির গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, একটি রাষ্ট্রে নানা ধর্ম, মত ও বিশ্বাসের মানুষের সহাবস্থানই সমাজের বৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করে। আবহমানকাল থেকেই বাংলাদেশের মানুষ পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্প্রীতির সঙ্গে নিজ নিজ ধর্ম পালন করে আসছে। তবে বিভিন্ন সময়ে কিছু স্বার্থান্বেষী ও সমাজবিরোধী গোষ্ঠী মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি এবং বিরোধ উসকে দেওয়ার চেষ্টা করেছে।
এ ধরনের অপশক্তি যাতে ফের মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে একটি মহল গুজব ও উসকানি ছড়িয়ে মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ও উত্তেজনা তৈরির চেষ্টা করছে। কোনো ধরনের সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ বা উসকানি যাতে দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে না পারে, সেদিকে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।
প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে সরকারের অঙ্গীকারের কথা জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ধর্মীয় পরিচয় বা মতের ভিন্নতার কারণে কোনো নাগরিক যেন বৈষম্যের শিকার না হন, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
নাগরিকদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সার্বভৌমত্ব সুসংহত রেখে স্বনির্ভর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে জনগণের ক্ষমতায়ন অপরিহার্য। এ লক্ষ্যেই সরকার ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও স্পোর্টস কার্ডসহ বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন ধর্মের গুরুদের জন্য সম্মানী ভাতার ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, সরকার এমন একটি কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়, যেখানে দল, মত, ধর্ম ও বর্ণের পার্থক্য না করে নাগরিকদের প্রয়োজন অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় সহায়তা নিশ্চিত করা হবে। এর পাশাপাশি নাগরিকদেরও রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ব পালন করতে হবে। সরকার ও জনগণের পারস্পরিক আস্থা, দায়িত্ববোধ ও সহযোগিতার ভিত্তিতেই একটি কার্যকর কল্যাণরাষ্ট্র গড়ে উঠবে।
‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’—এই নীতির কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় গোষ্ঠীর নয়; এ দেশ সব নাগরিকের। সংবিধান অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার সমান। নিজ নিজ ধর্মীয় বিশ্বাস ও সংস্কৃতি অনুযায়ী জীবনযাপন করার অধিকার যেমন সবার রয়েছে, তেমনি নিরাপদে বসবাসের অধিকারও সবার।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শুভ জন্মাষ্টমীর শুভেচ্ছা জানান। একই সঙ্গে আসন্ন দুর্গাপূজা উপলক্ষে হিন্দু সম্প্রদায়ের সবাইকে আগাম শুভেচ্ছা জানান তিনি।


