উত্তম কুমার আচার্য্য : আজ আস্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস। ১৯৬৬ সালে ইউনেস্কো সিদ্ধান্ত করে এবং ১৯৬৭ সাল থেকে প্রতিবছর ৮ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক স্বাক্ষরতা দিবস হিসেবে পালন শুরু হয়। প্রতিবছর একটি করে প্রতিপাদ্য নির্ধারিত হয়। এ বছর অর্থাৎ ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য হলো “Literacy for people, the planet and prosperity”. “মানুষ, পৃথিবী ও সমৃদ্ধির জন্য সাক্ষরতা”। ২০২৬ সালের বৈশ্বিক আয়োজন ৮–৯ সেপ্টেম্বর মেক্সিকোর চিয়াপাসে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যেখানে UNESCO-এর আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা পুরস্কারও প্রদান করা হবে। ২০২৬ সালকে UNESCO আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসের ৬০তম বার্ষিকী হিসেবে উল্লেখ করছে। বিশ্বের প্রায় ৮০টি দেশ এ দিবস যথাযোগ্য গুরুত্বে ও আঙ্গিকে উদযাপন করছে। একজন শিক্ষাব্রতী হিসেব এবারের প্রতিপাদ্যটি আমার কাছে সময়ের প্রেক্ষাপটে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে বিধায় এর উপর আলোকসম্পাতের তাগিদ অনুভব করেছি।

সাক্ষরতা মানুষের মৌলিক অধিকার এবং মানবিক মর্যাদা ও ক্ষমতায়নের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। সাধারণ অর্থে সাক্ষরতা বলতে পড়তে, লিখতে ও দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় তথ্য বুঝতে পারার সক্ষমতাকে বোঝায়। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে সাক্ষরতার ধারণা আরও বিস্তৃত হয়েছে। এখন শুধু অক্ষরজ্ঞান নয়—ডিজিটাল জ্ঞান, আর্থিক জ্ঞান, স্বাস্থ্যজ্ঞান, পরিবেশ-সচেতনতা, তথ্য যাচাই এবং পরিবর্তিত পৃথিবীর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার দক্ষতাও সাক্ষরতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
“মানুষ, পৃথিবী ও সমৃদ্ধির জন্য সাক্ষরতা”—এই প্রতিপাদ্য তাই সাক্ষরতাকে ব্যক্তিগত উন্নয়ন থেকে বৃহত্তর মানবিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত অগ্রগতির সঙ্গে যুক্ত করে।
সাক্ষরতা মানুষের আত্মবিশ্বাস ও আত্মনির্ভরতা বাড়ায়। একজন মানুষ পড়তে ও লিখতে পারলে নিজের অধিকার সম্পর্কে জানতে পারেন, সরকারি সেবা গ্রহণ করতে পারেন, প্রয়োজনীয় তথ্য বুঝতে পারেন এবং নিজের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে আরও সচেতনভাবে অংশ নিতে পারেন।
বিশেষ করে নারী, শিশু, দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়নে সাক্ষরতার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন শিক্ষিত মা তাঁর সন্তানের স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও শিক্ষার বিষয়ে অধিক সচেতন হতে পারেন। একজন কৃষক আবহাওয়া, কৃষি প্রযুক্তি ও বাজারসংক্রান্ত তথ্য বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। একজন শ্রমিক তাঁর কর্মসংস্থান ও অধিকার সম্পর্কে জানতে পারেন। অর্থাৎ সাক্ষরতা মানুষকে শুধু জ্ঞানী করে না, তাকে অধিকতর সক্ষম ও স্বাধীন করে।
আজ পৃথিবী জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশদূষণ, জীববৈচিত্র্য হ্রাস, পানির সংকট ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এসব মোকাবিলায় মানুষের মধ্যে পরিবেশগত সাক্ষরতা তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। একজন পরিবেশ-সচেতন মানুষ বুঝতে পারেন কেন প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো প্রয়োজন, কেন পানি ও বিদ্যুৎ অপচয় করা উচিত নয়, কেন গাছ লাগানো ও সংরক্ষণ করা জরুরি এবং কেন নদী, জলাভূমি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে হবে।
সুতরাং সাক্ষরতা মানুষকে শুধু পৃথিবীতে বসবাস করতে শেখায় না; পৃথিবীকে কীভাবে রক্ষা করতে হবে, সেই দায়িত্ববোধও তৈরি করে।
ব্যক্তি ও জাতির অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি হলো জ্ঞান ও দক্ষতা। সাক্ষর মানুষ নতুন জ্ঞান অর্জন করতে পারেন, প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারেন এবং কর্মক্ষেত্রের পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেন। বর্তমান ডিজিটাল যুগে ডিজিটাল সাক্ষরতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ইন্টারনেট ব্যবহার, অনলাইন শিক্ষা, ডিজিটাল লেনদেন, সরকারি অনলাইন সেবা গ্রহণ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাওয়া তথ্যের সত্যতা যাচাই—এসব দক্ষতা এখন দৈনন্দিন জীবনের অংশ।
একই সঙ্গে আর্থিক সাক্ষরতা মানুষকে আয়-ব্যয়ের পরিকল্পনা, সঞ্চয়, ঋণ ও বিনিয়োগ সম্পর্কে সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। ফলে সাক্ষরতা ব্যক্তির অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ায় এবং সামগ্রিকভাবে একটি উৎপাদনশীল সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখে।
এভাবে ব্যক্তি ও সমাজের সমৃদ্ধির মধ্য দিয়ে বৈশ্বিক সমৃদ্ধি অর্জিত হয়।
বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষার বিস্তার ও নিরক্ষরতা হ্রাসে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু শুধু বিদ্যালয়ে ভর্তি হলেই প্রকৃত সাক্ষরতা অর্জিত হয় না। শিক্ষার্থী যা শিখছে, তা বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে পারছে কি না—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমানে বাংলাদেশের সামনে রয়েছে শিক্ষার মান, ঝরে পড়া, ডিজিটাল বৈষম্য, প্রাপ্তবয়স্কদের নিরক্ষরতা, শিক্ষার সঙ্গে কর্মদক্ষতার অসামঞ্জস্য এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলার মতো চ্যালেঞ্জ। তাই সাক্ষরতা কর্মসূচিকে শুধু অক্ষরজ্ঞান প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে জীবনমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক করতে হবে।
সাক্ষরতার সুফলকে মানুষ, পৃথিবী ও সমৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত করতে হলে—১. সবার জন্য মানসম্মত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
২. প্রাপ্তবয়স্ক ও ঝরে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য কার্যকর সাক্ষরতা কর্মসূচি চালু রাখতে হবে। ৩. ডিজিটাল ও তথ্য সাক্ষরতাকে শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ করতে হবে। ৪. পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ে সচেতনতা শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। ৫. শিক্ষাকে কর্মদক্ষতা ও বাস্তব জীবনের প্রয়োজনের সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে। ৬. নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিক্ষার সুযোগ আরও সম্প্রসারিত করতে হবে।
৭. পরিবার, বিদ্যালয়, সমাজ ও রাষ্ট্র—সব পক্ষকে সাক্ষরতা আন্দোলনে সম্পৃক্ত করতে হবে।
সর্বোপরি, দেশের আইন শৃংখলার উন্নতি নিশ্চিত করে সামাজিক শান্তি প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
৮. শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকের প্রচলিত আইন-নির্ধারিত নিয়মে চলতে দিতে হবে।
৯. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সার্বিক কার্যক্রম নিরপেক্ষভাবে পরিবীক্ষণ করে যেতে হবে।
পরিশেষে বলি, সাক্ষরতা জাতির উন্নয়নের ভিত্তি। সাক্ষর মানুষই সচেতন নাগরিক, দক্ষ কর্মী, দায়িত্বশীল ভোক্তা এবং পরিবেশবান্ধব সমাজের নির্মাতা হতে পারেন। তাই সাক্ষরতার লক্ষ্য শুধু কতজন মানুষ পড়তে ও লিখতে পারেন—এটি দিয়ে পরিমাপ করা যথেষ্ট নয়; বরং মানুষ সেই জ্ঞান দিয়ে কতটা ভালোভাবে জীবন পরিচালনা করতে পারছেন, সমাজ ও অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন এবং পৃথিবীকে রক্ষায় দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করছেন—সেটিও বিবেচনা করতে হবে। তাঁরা যেন এ প্রতীজ্ঞায় এগিয়ে যান –
“চলে যাবো— তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ, প্রাণপণে পৃথিবীর সরাবো জঞ্জাল, এ বিশ্বকে এ-শিশুর বাসযােগ্য করে যাবো আমি নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।”
অতএব, “মানুষ, পৃথিবী ও সমৃদ্ধির জন্য সাক্ষরতা” কেবল একটি প্রতিপাদ্য নয়; এটি এমন একটি ভবিষ্যতের আহ্বান, যেখানে জ্ঞানী ও দক্ষ মানুষ, সুরক্ষিত পৃথিবী এবং ন্যায়ভিত্তিক সমৃদ্ধ সমাজ পরস্পরের পরিপূরক হয়ে উঠবে।
লেখক : শিক্ষাব্রতী, পরিবেশ সংগঠক ও সাব এডিটর – দৈনিক পূর্বদেশ।


