শনিবার, অক্টোবর ৩, ২০২৬
spot_img

বিশ্ব পর্যটন দিবস ২০২৬: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে পর্যটনের নতুন রূপ

উত্তম কুমার আচার্য্য : বিশ্ব পর্যটন দিবসে এবারের প্রতিপাদ্য: “Digital Agenda and Artificial Intelligence to Redesign Tourism” বাংলা ভাবানুবাদ করলে হয়, “ডিজিটাল এজেন্ডা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে পর্যটনকে নতুনভাবে বিনির্মাণ।” প্রতি বছর ২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ব পর্যটন দিবস পালিত হয়। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য পর্যটন খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে—প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কীভাবে পর্যটনের অভিজ্ঞতা, ব্যবস্থাপনা এবং অর্থনৈতিক কাঠামোকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে পারে? জাতিসংঘের মহাসচিবের ২০২৬ সালের বার্তাতেও এই রূপান্তরের পাশাপাশি প্রযুক্তির সুফল যেন মানুষ, স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও পর্যটনকর্মীদের কাছে পৌঁছায়—তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
জাতিসংঘ এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘পর্যটন শুধু ভ্রমণ নয়।’ পর্যটন এখন আর কেবল এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়া কিংবা অবকাশযাপনের বিষয় নয়। এটি কর্মসংস্থান, স্থানীয় অর্থনীতি, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং মানুষের পারস্পরিক পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রতি ১০ জনের একজনের কর্মসংস্থানের সঙ্গে পর্যটন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পর্কিত এবং কোটি কোটি মানুষের জীবিকার সঙ্গে এ খাত জড়িত।
একটি পর্যটনকেন্দ্রে একজন পর্যটক অর্থ ব্যয় করলে তার প্রভাব শুধু হোটেল বা পরিবহন ব্যবসায় সীমাবদ্ধ থাকে না; রেস্তোরাঁ, হস্তশিল্প, কৃষিপণ্য, স্থানীয় গাইড, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও তার অর্থনৈতিক প্রভাব পড়ে। ফলে সঠিকভাবে পরিচালিত পর্যটন একটি অঞ্চলের সামগ্রিক উন্নয়নের চালিকাশক্তি হতে পারে।
এখন পর্যটনের সাথে ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও নিবিড়ভাবে জড়িত হয়ে পড়েছে। তবে
পর্যটনের সঙ্গে ডিজিটাল প্রযুক্তির সম্পর্ক নতুন নয়। অনলাইনে টিকিট ও হোটেল বুকিং, ডিজিটাল মানচিত্র, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভার্চুয়াল ট্যুর—ইতোমধ্যেই পর্যটনের ধরন বদলে দিয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এই পরিবর্তনকে আরও দ্রুত ও গভীর করতে পারে।
এআই-এর মাধ্যমে পর্যটকের পছন্দ ও প্রয়োজন অনুযায়ী ভ্রমণ পরিকল্পনা তৈরি, বিভিন্ন গন্তব্য সম্পর্কে তথ্য প্রদান, ভাষাগত যোগাযোগ সহজ করা, পর্যটনকেন্দ্রে ভিড় ব্যবস্থাপনা এবং পর্যটনসেবার মান উন্নয়নে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে পর্যটন কর্তৃপক্ষ পর্যটকের গতিবিধি ও চাহিদার তথ্য বিশ্লেষণ করে অবকাঠামো ও সেবা পরিকল্পনা আরও কার্যকরভাবে করতে পারে।
তবে ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্যের তাৎপর্য কেবল “পর্যটনে এআই ব্যবহার” নয়; বরং ডিজিটাল প্রযুক্তির সাহায্যে পর্যটনকে নতুনভাবে নকশা করা। অর্থাৎ প্রযুক্তি যেন পর্যটনের উদ্দেশ্যকে প্রতিস্থাপন না করে, বরং পর্যটনকে আরও মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই করে।
প্রসঙ্গত বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনার দিকে দৃষ্টি ফেরাতে পারি। বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনা অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। সমুদ্রসৈকত, পাহাড়, নদী, বন, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, গ্রামীণ জীবন, লোকসংস্কৃতি ও ধর্মীয়-ঐতিহাসিক ঐতিহ্য—সব মিলিয়ে এখানে নানা ধরনের পর্যটনের সুযোগ রয়েছে।
কিন্তু অনেক সম্ভাবনাময় স্থান এখনো আন্তর্জাতিক তো বটেই, দেশের পর্যটকদের কাছেও যথেষ্ট পরিচিত নয়। ডিজিটাল প্রযুক্তি এই ব্যবধান কমাতে পারে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটি দর্শনীয় স্থানকে উচ্চমানের ছবি, ভিডিও, মানচিত্র, বহুভাষিক তথ্য ও ডিজিটাল গল্প বলার মাধ্যমে বিশ্বের মানুষের কাছে তুলে ধরা সম্ভব। এখন সম্ভাবনাময় কন্টেন্ট ক্রিয়েটররা বেশ কিছু কাজ করছে যা’ এদেশের অনালোকিত পর্যটন স্থানগুলোকে তুলে ধরছে।
বাংলাদেশে ২০২৬ সালের বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে ৩ অক্টোবর পর্যন্ত সপ্তাহব্যাপী কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এসব কর্মসূচির মধ্যে AI ও পর্যটন নিয়ে সেমিনারসহ বিভিন্ন কার্যক্রম রয়েছে।
পর্যটন খাতে চট্টগ্রাম ও দক্ষিণ চট্টগ্রামের সম্ভাবনা বিপুল। প্রকৃতিগত কারণে পর্যটন সম্ভাবনায় চট্টগ্রাম অঞ্চল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পাহাড়, সমুদ্র, নদী, বন, ঝরনা, ঐতিহাসিক স্থান এবং বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি—সবকিছু মিলিয়ে চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সম্ভাবনাময় পর্যটন অঞ্চল।
চন্দনাইশ, সাতকানিয়া, আনোয়ারা, বাঁশখালী, পটিয়া কিংবা দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিভিন্ন গ্রামীণ ও পাহাড়ি এলাকায় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি লোকসংস্কৃতি, নদীকেন্দ্রিক জীবন, ঐতিহ্যবাহী খাদ্য ও স্থানীয় ইতিহাসকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে। কিন্তু এর জন্য শুধু রাস্তা বা অবকাঠামো নির্মাণ যথেষ্ট নয়; দরকার ডিজিটাল ডকুমেন্টেশন ও সঠিকভাবে তথ্য উপস্থাপন।
একটি স্থানীয় নদী, পাহাড় বা ঐতিহাসিক স্থানের জন্য ডিজিটাল আর্কাইভ তৈরি করা যেতে পারে। পর্যটক মোবাইল ফোনে QR কোড স্ক্যান করে সেই স্থানের ইতিহাস, লোককথা, পরিবেশ, সংস্কৃতি ও স্থানীয় মানুষের জীবন সম্পর্কে জানতে পারেন। AI-ভিত্তিক বহুভাষিক গাইড বিদেশি পর্যটকের কাছেও এসব তথ্য সহজলভ্য করতে পারে।

প্রযুক্তির সঙ্গে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা জরুরী। পর্যটনের বিকাশের সঙ্গে পরিবেশের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পর্যটকের সংখ্যা বাড়লেই যে উন্নয়ন হবে—এমন ধারণা টেকসই নয়। অপরিকল্পিত পর্যটন পাহাড় কাটা, বন ধ্বংস, নদী-সমুদ্র দূষণ, বর্জ্য বৃদ্ধি এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষতির কারণ হতে পারে।
তাই AI ব্যবহার করে পর্যটনকেন্দ্রে সম্ভাব্য অতিরিক্ত চাপ শনাক্ত করা, পর্যটকের প্রবাহ ব্যবস্থাপনা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশগত তথ্য বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। জাতিসংঘও পর্যটনকে টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে এবং পর্যটনকে বিশেষ করে SDG 8, 12 ও 14-এর সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে উল্লেখ করেছে।

তবে প্রযুক্তিনির্ভর পর্যটনের সামনে একটি বড় প্রশ্নও রয়েছে—এই প্রযুক্তির সুবিধা কারা পাবে?
যদি কেবল বড় হোটেল, বড় অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও বড় ব্যবসা AI-এর সুবিধা পায়, তাহলে স্থানীয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা পিছিয়ে পড়তে পারেন। একইভাবে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইন্টারনেট ও ডিজিটাল দক্ষতার অভাব থাকলে প্রযুক্তিনির্ভর পর্যটনের সুফল সবার কাছে পৌঁছাবে না।
তাই ডিজিটাল পর্যটনের সঙ্গে স্থানীয় পর্যটন উদ্যোক্তা, গাইড, কারুশিল্পী, পরিবহনকর্মী এবং তরুণদের ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়ন জরুরি। জাতিসংঘের ২০২৬ সালের বার্তাতেও ডিজিটাল দক্ষতা বাড়ানো এবং প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার বিস্তারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

পর্যটনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার মানুষের সহায়ক হতে পারে, বিকল্প নয়। AI যত শক্তিশালীই হোক, পর্যটনের মূল আকর্ষণ মানুষের অভিজ্ঞতা। একজন স্থানীয় গাইডের মুখে শোনা কোনো লোককথা, কোনো গ্রামের মানুষের আতিথেয়তা কিংবা কোনো ঐতিহাসিক স্থানের সঙ্গে স্থানীয় মানুষের আবেগ—এসবকে কোনো অ্যালগরিদম পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করতে পারে না।
সুতরাং ভবিষ্যতের পর্যটনে AI-এর ভূমিকা হওয়া উচিত মানুষকে প্রতিস্থাপন করা নয়, মানুষের সক্ষমতা বাড়ানো। প্রযুক্তি তথ্য দেবে, পথ দেখাবে, বিশ্লেষণ করবে; কিন্তু পর্যটনের মানবিক অভিজ্ঞতা তৈরি করবে মানুষই।

বিশ্ব পর্যটন দিবস ২০২৬-এর প্রতিপাদ্য তাই কেবল একটি প্রযুক্তিগত স্লোগান নয়; এটি পর্যটনের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি নীতিগত ভাবনার আহ্বান। ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পর্যটনকে আরও সহজ, তথ্যসমৃদ্ধ, নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও পরিবেশবান্ধব করার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে তৈরি করেছে ডিজিটাল বৈষম্য, তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা, গোপনীয়তা এবং প্রযুক্তিনির্ভরতার মতো নতুন চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশের জন্য মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত—আমরা শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার করব, নাকি প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে আমাদের নিজস্ব প্রকৃতি, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও মানুষের জীবনকে বিশ্বের সামনে নতুনভাবে তুলে ধরব?
বিশ্ব পর্যটন দিবস ২০২৬ আমাদের সেই দ্বিতীয় পথটিই ভাবতে শেখায়—যেখানে ডিজিটাল উদ্ভাবন হবে উপায়, মানুষ ও প্রকৃতির কল্যাণ হবে লক্ষ্য এবং টেকসই পর্যটন হবে ভবিষ্যতের ভিত্তি।

লেখক: পরিবেশ সংগঠক; শিক্ষাব্রতী; সংস্কৃতিজন ও সাব-এডিটর: দৈনিক পূর্বকাল।

সর্বশেষ

পাঠ্যপুস্তক

রতন চন্দ্র পাল, অতিথি লেখক: মানব সভ্যতার শ্রেষ্ঠ প্রকাশ...

ইজারাদারদের দাবি, সাতকানিয়া দেওয়ানহাট বাজার পরিচালনায় সুশাসন নিশ্চিতকরণের

অনলাইন ডেস্ক: সাতকানিয়ার দেওয়ানহাট বাজার পরিচালনায় সুশাসন নিশ্চিতকরণের দাবী...

সাতকানিয়ার কেরানীহাটে আশ্-শেফা স্কুল এন্ড কলেজে নাতে রাসুল (সাঃ) প্রতিযোগিতা সম্পন্ন

এস এম আনোয়ার হোসেন, দক্ষিণ চট্টগ্রাম: পবিত্র রবিউল আউয়াল...

যুক্তরাষ্ট্র আ.লীগের কৃষি বিষয়ক সম্পাদক নিযুক্ত সঞ্জয় কুমার সাহা

পূর্বকাল ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের কৃষি বিষয়ক সম্পাদক...

আ.লীগের কেন্দ্রীয় তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক উপকমিটির সদস্য হলেন বিধান রক্ষিত

নিজস্ব প্রতিবেদক: আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক...
spot_img