রবিবার, নভেম্বর ৮, ২০২৬
spot_img

মুসলমান এখন দুর্দশাগ্রস্ত অভিভাবকহীন জাতি

ড. মুহম্মদ মাসুম চৌধুরী : আল্লামা ইকবাল বলেছেন ‘মুসলমানদের ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞানের সম্রাজ‍্য, আজ তারা পেঁচা। মুসলমানের ঘরে জিয়াফত মুসলমান ক্ষুধার্ত।’ কেনইবা এমন হলো! এমন তো হওয়ার কথা ছিল না। হবে না কেন? আমরা উন্নয়নের পালে ফু দিই, যত গাল ফুলে, তত পাল ফুলে না। ন্যায় নীতি আদর্শের আপ্ত বাণী আমরা উচ্চারণ করি কিন্তু জীবনে প্রতিফল ঘটাই না। নসিহতের সাথে খাসিয়তের সংযোগ ঘটাতে না পারলে কোন আদর্শই সমাজে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না। স্বার্থপরতার পরিচয় দিতে প্রতিযোগিতায় নেমেছি। ধর্ম কর্মে কোথাও বাদ যাচ্ছে না। নামাজ, রোজা, হজ্ব, যাকাতের উদ্দেশ্য বেহেস্তের লোভ আর দোজখের ভয়। পীর আউলিয়ার দরবারে মাজারে ছেলে, সন্তান ধন-সম্পদ অর্জন, বৈষয়িক উন্নতিই প্রধান হয়ে উঠছে আমাদের মাঝে। আল্লাহ ও তাঁর কামিল বান্দার সন্তুষ্টি অর্জন করার মানসিকতা সৃষ্টি করতে পারিনি অথচ এটাই হওয়া উচিৎ। গজনীর বাদশাহ সুলতান মাহমুদের এক কুৎসিত বাঁদী ছিল। বাদশাহ তাকে পছন্দ করতেন বেশী। বাদশাহর নিকট একযোগে সকল বাঁদী-দাসীর জিজ্ঞাসা, কেন ক্ষুৎসিত বাঁদীকে বেশী পছন্দ? বাদশাহ বললেন, জবাব পাবে দুইদিন পর। বাদশাহ তাঁর ঘরে দুইদিনে সোনা, রূপা, ছান্দি টাকা সংগ্রহ করে পৃথক পৃথক রাখলেন এবং সকলকে ডেকে বললেন, এখন আমি ঘোষণা করছি, এ ঘরের সম্পদ যে যেটা স্পর্শ করবে সেটি মালিক সে-ই হয়ে যাবে । এক এক বাঁদী এক এক সম্পদ স্পর্শ করে তার মালিক হয়ে গেলো।কিন্তু কুৎসিত বাঁদী কোন সম্পদ স্পর্শ না করে হাত ধরলেন বাদশাহর। বাদশাহ বললেন, তোমার কি সম্পদের প্রয়োজন নেই? বাঁদী বলল, জাহাপনা আপনি কোন দিন মিথ্যা বলেননি, আজও বলছেন না, যে যা স্পর্শ করবে সেটি তার হলে, আমি বাদশাহ স্পর্শ করেছি ফলে বাদশাহ আমার হবে। বাদশাহ আমার হলে রাজ্য আমারই। আজ আমাদেরকে ক্ষুৎসিত বাঁদীর মত ক্ষুদ্র স্বার্থ পরিত্যাগ করে বৃহৎ স্বার্থ অর্জনের চিন্তা-চেষ্টা করতে হবে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের ‘গীতাঞ্জলি’র প্রথম কবিতার পংক্তি:
‘আপনারে শুধু ঘিরিয়া ঘিরিয়া ঘুরে মরি পলে পলে / সকল অহংকার হে আমার ডুবাও চোখের জলে’। আমরা নিজকে শুধু ঘিরে ঘিরে রাখছি, বিকাশ করছি না। মানুষ হলে তার মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটাতে হবে। তা না হলে পশু আর মধ্যে মানুষের পার্থক্য থাকে না। সমাজে যে ব্যবিচার অন্যায় নির্যাতন চলছে তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। ব্যবিচার যদি শিক্ষিত লোক কর্তৃক হয়ে থাকে তা হৃদয় অধিক পীড়া দেয়। হতে হয় মর্মাহত। কিছুদিন পূর্বে মেহেরপুর সদর উপজেলার বি এস সি পাস যৌতুকলোভী বর বাজারে দাম তুলে কয়েক লক্ষ টাকা। এ বর ‘মহাশয়’ বিয়ের অনুষ্ঠানেই নগদ প্রদানের দাবি করে বসে। অন্যথায় বিয়ে ভঙ্গের হুংকার। এতে দু’পক্ষের কথা কাটাকাটি। এক পর্যায়ে ঝগড়াঝাটি-হাতাহাতির ফলে বর বিয়ের আসর ত্যাগ করে। বাংলাদেশে এধরনের লজ্জাজনক ঘটনা অনেক। সারাদেশে নারী নির্যাতনের প্রধান কারণ যৌতুক।যৌতুকের কারণে এক বছরের মধ্যে কত নারী নির্যাতন ও হত্যা হয় তার হিসেব নির্নয় করা কঠিন। যৌতুকলোভীদের হাত দিন দিন প্রসারিত হচ্ছে। যৌতুকের অপমানে বহু নারী আত্মহত্যা করেছে। দেশে যৌতুক বিরোধী কঠোর আইন থাকলেও প্রয়োগ কম হওয়ায় সমাজে এই ব্যাধির বিস্তার হচ্ছে। আইনের প্রয়োগ না থাকলে এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থা সৎ না হলে কোন সামাজিক ব্যাধিই উপড়ে ফেলা সম্ভব নয়।
যৌতুকের মত সকল সামাজিক ব্যাধির মূলোৎপাটন করতে হলে আলেম সমাজকে সর্বপ্রথম সামাজিক আন্দোলনে এগিয়ে আসতে হবে। মসজিদে মসজিদে জুমাবারের খোৎবায় অবিচার অনাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে হবে। আলেম সমাজ যদি ঐক্যবদ্ধ হয়ে ঘোষণা করেন আজ থেকে কোন বর যৌতুক নিলে সে বিয়ে আমরা পড়াবো না। এই একটি সিদ্ধান্তের কারণে সকল বিয়ে যৌতুক বিহীন হতে বাধ্য। তাঁরা তো ঐক্যবদ্ধ হবে না। মাহাথির মোহাম্মদের মতো প্রশ্ন করতে চাই, ‘আল্লাহর আইন মানুষের ব্যাখ্যার কারণে কি এতো বিভক্তি? পাকিস্তানের এক সময়কার প্রধান বিচারপতি মুনির বিখ্যাত এগার জন আলেম ডেকে পৃথক পৃথক ভাবে সকলেরই নিকট একটি প্রশ্ন করেছিলেন। প্রশ্নটি হল ইসলামের সংজ্ঞা কি? প্রশ্ন একটি হলেও এগার আলেম এগার সংজ্ঞা দিয়েছিলেন।
আল্লাহ পাক পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন, ‘ওয়াতাসিমু বিহাবলিল্লাহে জামিয়া ওয়ালা তাফারবাকু’, অর্থাৎ-তোমরা আল্লাহ রুজ্জুকে আকরিয়ে ধর পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। অর্থাৎ ঐক‍্য না হয়ে যারা বিচ্চিন্ন থাকবে তারা আল্লাহর পথে থাকবে না। ভ, ই, লেনিন বলেছেন, ‘ঐক্যবদ্ধ জনতা এটম বোমার চেয়ে শক্তিশালী।
কবি হেলাল হাফিজ তাঁর ‘যে জলে আগুন জলে’ বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থের ছোট একটি কবিতার ছোট্ট পংক্তি: ‘নিউট্রন বোমা বুঝো / মানুষ বুঝো না’ / মানুষের আছে প্রচণ্ড শক্তি, তার বিকাশ ঘঠানোর এখন মুসলমানদের শ্রেষ্ঠ সময়। আল্লামা ইকবাল বলেছেন, ‘এটম বোম ছে নাডর হামকো হামারে নারায়ে তাকবির, যাঁহা যাঁউ ওয়াহা ছুউনু হামারে নারায়ে তাব্বির।’ আমর তো এটম বোমাকে ভয় না পাওয়ার জাতি। আমাদের মাঝে বিভক্তির কারণেই এতো ভয়। ধর্মীয় একদল আরেক দলকে কাফির বলছি। যদি একদল সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে বাকীরা যদি কাফিরই হয়, তাহলে বাংলাদেশ মুসলিম রাষ্ট্র হয় কি ভাবে?
সম্মুখে দেয়াল আর দেয়াল, বিভক্তির পর বিভক্তির কারণে সারা বিশ্বের মুসলমান সমাজ নির্যাতিত নিষ্পেচিত নিপীড়িত। বিশ্বের জনসংখ্যার একচতুর্থাংশ মুসলমান। সকলে একযোগ দাঁড়িয়ে ইজরাইল ইহুদীদের ওপর প্রেস্রাব করলে ইহুদীরা ভেসে যেত। আমাদের বিচ্ছিন্নতার সুযোগ তো তারা নিবেই। ঐক্যবদ্ধ হতে আমরা অক্ষম। তাদের শুধু গালমন্দ করে গাল নষ্ট করছি।
ডাঃ মাহাথির মোহাম্মদ এক সময় মুসলিম বিশ্বে অবিচার বন্ধ না করলে একযোগে তেল অবরোধের আহবান জানিয়ে ছিলেন। ক্ষমতার অন্ধলোভে কেউ তাঁর আহবানে কর্ণপাত করেননি। সঠিক সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হলে বহু যুগ, বহু শতক ক্ষেসারত দিতে হবে। ফিলিস্তিন, ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়া, ইয়েমেন, সিরিয়ার নবজাতক শিশুদের মত আরো অনেক মুসলিম রাষ্ট্রের অনাগত শিশুরাও বুলেট বোমার শব্দ শুনে পৃথিবীতে চক্ষু উম্মোচোন করবে। যুদ্ধের সাথে বসবাস করে যদি শান্তির সাক্ষাৎ না মিলে তাহলে হিটলারের মত বলবে ‘যুদ্ধই শান্তি।’এখানে আমি ‘কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদারের ‘দুঃখের তুলনা’ কবিতাটির কয়েক চরণ উচ্চারণের লোভ সামলাতে পারছি না।
‘একদা ছিল না জুতো চরণ যুগলে / দহিল হৃদয় মোর সেই ক্ষোভানলে,/ ধীরে ধীরে চুপি চুপি দুঃখাকুল মনে / গেলাম ভজনালয়ে ভজন কারণে / সেথা দেখি একজন পদ নাহি তার / অমনি জুতোর খেদ ঘুচিল আমার / পরের অভাব করিলে চিন্তন / আপন অভাব ক্রহে এতক্ষণ? বিশ্বের মুসলমানদের চেয়ে বর্তমান খারাপ অবস্থায় কোন জাতি আছে কি, যাদের দেখে আমাদের খেদ ও ক্ষোভ নিবারণ হবে?
লেখক: কলাম লেখক, রাজনীতিক

সর্বশেষ

পাঠ্যপুস্তক

রতন চন্দ্র পাল, অতিথি লেখক: মানব সভ্যতার শ্রেষ্ঠ প্রকাশ...

ইজারাদারদের দাবি, সাতকানিয়া দেওয়ানহাট বাজার পরিচালনায় সুশাসন নিশ্চিতকরণের

অনলাইন ডেস্ক: সাতকানিয়ার দেওয়ানহাট বাজার পরিচালনায় সুশাসন নিশ্চিতকরণের দাবী...

সাতকানিয়ার কেরানীহাটে আশ্-শেফা স্কুল এন্ড কলেজে নাতে রাসুল (সাঃ) প্রতিযোগিতা সম্পন্ন

এস এম আনোয়ার হোসেন, দক্ষিণ চট্টগ্রাম: পবিত্র রবিউল আউয়াল...

যুক্তরাষ্ট্র আ.লীগের কৃষি বিষয়ক সম্পাদক নিযুক্ত সঞ্জয় কুমার সাহা

পূর্বকাল ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের কৃষি বিষয়ক সম্পাদক...

আ.লীগের কেন্দ্রীয় তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক উপকমিটির সদস্য হলেন বিধান রক্ষিত

নিজস্ব প্রতিবেদক: আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক...
spot_img