বুধবার, অক্টোবর ২১, ২০২৬
spot_img

সংকটের মুখে বাংলাদেশের অর্থনীতি

মোহাম্মদ হাসান : বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংকট এখন আর শুধু প্রবৃদ্ধি, রপ্তানি আয় কিংবা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর গভীরতা স্পষ্ট হচ্ছে শিক্ষিত তরুণদের বেকারত্ব, অর্জিত যোগ্যতার যথাযথ ব্যবহার না হওয়া, পরিবারের ক্রমবর্ধমান ঋণ এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের মধ্য দিয়ে। একদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি নিয়েও তরুণেরা উপযুক্ত কাজ পাচ্ছেন না, অন্যদিকে কর্মজীবী মানুষের একটি বড় অংশের আয় দিয়ে সংসারের ন্যূনতম ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়ছে। অর্থাৎ অর্থনীতির দুর্বলতা এখন সরাসরি মানুষের জীবনযাত্রা ও সামাজিক স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ১৫ অক্টোবর প্রকাশিত রিজিওনাল ইকোনমিক আউটলুক: এশিয়া অ্যান্ড প্যাসিফিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বেকারত্ব ও যোগ্যতার যথাযথ ব্যবহার না হওয়ার চিত্র উঠে এসেছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) লিভিং স্ট্যান্ডার্ড সার্ভে ২০২৫ অনুযায়ী, দেশের ৪৭ দশমিক ৪২ শতাংশ পরিবার গত এক বছরে নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে ঋণ করেছে। এই দুটি তথ্য কর্মসংস্থানের ঘাটতি ও পারিবারিক আর্থিক অনিশ্চয়তার গভীরতা তুলে ধরে।
ডিগ্রি আছে, কাজ নেই; কাজ থাকলেও যোগ্যতার মূল্য নেই :
আইএমএফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষিত তরুণদের প্রায় ২৯ শতাংশ বেকার। একই সঙ্গে উচ্চশিক্ষিত কর্মীদের প্রায় অর্ধেক এমন পেশায় নিয়োজিত, যেখানে তাঁদের অর্জিত যোগ্যতা পুরোপুরি কাজে লাগছে না। এটি শুধু শ্রমবাজারের সমস্যা নয়; জাতীয় সম্পদ ও সম্ভাবনারও অপচয়। একজন শিক্ষার্থীকে উচ্চশিক্ষিত করে তুলতে পরিবারকে বছরের পর বছর অর্থ, শ্রম ও সময় বিনিয়োগ করতে হয়। অথচ পড়াশোনা শেষে উপযুক্ত কর্মসংস্থান না পেলে সেই বিনিয়োগ প্রত্যাশিত সুফল দেয় না। অন্যদিকে, যোগ্যতার তুলনায় নিম্নস্তরের কাজে নিয়োজিত থাকলে ব্যক্তির দক্ষতা ও সৃজনশীলতার পূর্ণ ব্যবহার হয় না, কমে অর্থনীতির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির সুযোগও।এ সংকটের পেছনে শিক্ষাব্যবস্থা ও শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে অসংগতি রয়েছে। তবে বেকারত্বের দায় শুধু তরুণদের দক্ষতার ঘাটতির ওপর চাপানো যায় না। দক্ষ জনশক্তি তৈরির পাশাপাশি তাঁদের জন্য মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। শিল্প, প্রযুক্তি, কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সেবা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো ছাড়া এ সমস্যার টেকসই সমাধান সম্ভব নয়।
আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি, ঋণে বাড়ছে পারিবারিক চাপ:
বিবিএসের জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে পরিবারপ্রতি গড় মাসিক আয় ৩৩ হাজার ৫১৩ টাকা, বিপরীতে গড় ব্যয় ৩৫ হাজার ৩১১ টাকা। অর্থাৎ জাতীয় গড় হিসাবে প্রতি মাসে ব্যয় আয়ের চেয়ে ১ হাজার ৭৯৮ টাকা বেশি।
জরিপে দেখা গেছে, গ্রামীণ এলাকার ৫১ দশমিক ৯১ শতাংশ পরিবার গত এক বছরে প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে ঋণ করেছে। শহরাঞ্চলে এ হার ৪০ দশমিক ১৯ শতাংশ এবং সিটি করপোরেশন এলাকায় ৩২ দশমিক ১১ শতাংশ।
আয়-ব্যয়ের এই ব্যবধান পূরণ করতে অনেক পরিবার সঞ্চয় ভাঙছে, আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার নিচ্ছে কিংবা ঋণের ওপর নির্ভর করছে। দীর্ঘদিন এমন পরিস্থিতি চললে ঋণের কিস্তি ও সুদের চাপের সঙ্গে খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা এবং বাসস্থানের ব্যয় সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে পরিবারগুলো পুষ্টি, চিকিৎসা কিংবা সন্তানের শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যয় কমাতে বাধ্য হয়।
অবশ্য ঋণ নেওয়া মানেই আর্থিক দুর্দশা নয়। উৎপাদনশীল বিনিয়োগের জন্য ঋণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে বিপুলসংখ্যক পরিবার নিয়মিত ঋণ নিতে বাধ্য হলে তা আয় ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে গভীর অসামঞ্জস্যের ইঙ্গিত দেয়।
মূল্যস্ফীতি ও মন্থর প্রবৃদ্ধির দ্বিমুখী চাপ:
পরিবারের আর্থিক সংকটের অন্যতম কারণ দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি। চাল, ডাল, তেল, জ্বালানি, পরিবহন, বাড়িভাড়া ও চিকিৎসার ব্যয় বাড়লেও আয় একই হারে না বাড়লে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। ফলে বেতনের অঙ্ক অপরিবর্তিত থাকুক কিংবা কিছুটা বাড়ুক, আগের মতো জীবনযাপন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ২ শতাংশ হতে পারে। প্রবৃদ্ধির গতি কমে গেলে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর চাপ বাড়তে পারে। জ্বালানি সংকট ও ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ব্যাহত করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে।
অন্যদিকে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার শ্রমবাজারে নতুন পরিবর্তন আনছে। কিছু প্রচলিত পেশায় কর্মীর চাহিদা কমতে পারে, আবার প্রযুক্তিনির্ভর নতুন কাজের সুযোগও তৈরি হতে পারে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যবহারিক দক্ষতা, প্রযুক্তিজ্ঞান ও কর্মমুখী প্রশিক্ষণের গুরুত্ব বাড়ানো জরুরি।
সমাধান কোথায়?
বর্তমান পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক নীতির সাফল্য শুধু প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানে বিচার করলে চলবে না। দেখতে হবে, সেই প্রবৃদ্ধি কতটা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে, মানুষের প্রকৃত আয় বাড়াচ্ছে এবং পরিবারকে আর্থিক নিরাপত্তা দিচ্ছে।
প্রথমত, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ, উৎপাদনশীল শিল্প এবং কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় করে শিক্ষাকে শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। তৃতীয়ত, বাজার তদারকি, সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়ন ও কার্যকর সামাজিক সুরক্ষার মাধ্যমে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা করতে হবে। পাশাপাশি গ্রামীণ এলাকায় বিকল্প কর্মসংস্থান এবং উৎপাদনশীল কাজে সহজ অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা যাচাইয়ে কর্মসংস্থান, প্রকৃত মজুরি, পারিবারিক ঋণ ও জীবনযাত্রার ব্যয়সংক্রান্ত নির্ভরযোগ্য তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করাও জরুরি।
শেষ কথা:
উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বেকারত্ব এবং পরিবারের ঋণনির্ভরতা বিচ্ছিন্ন কোনো সমস্যা নয়। উপযুক্ত কর্মসংস্থানের অভাব মানুষের আয় সীমিত করছে, আর মূল্যস্ফীতি সেই আয়ের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা ও প্রবৃদ্ধির মন্থর গতি।বাংলাদেশের সামনে তাই চ্যালেঞ্জ শুধু অর্থনীতির আকার বাড়ানো নয়; বরং অর্থনীতির সুফল সাধারণ মানুষের জীবনে পৌঁছে দেওয়া। একজন শিক্ষিত তরুণ তাঁর যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পাচ্ছেন কি না, একজন শ্রমজীবী মানুষ তাঁর আয়ে পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে পারছেন কি না এবং একটি পরিবার ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করতে পারছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তরেই অর্থনৈতিক সাফল্যের প্রকৃত মূল্যায়ন নিহিত।প্রবৃদ্ধি তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা কর্মসংস্থান, ন্যায্য আয় ও পারিবারিক নিরাপত্তায় প্রতিফলিত হবে। অন্যথায় অর্থনীতির পরিসংখ্যান যতই আশাব্যঞ্জক হোক, সাধারণ মানুষের জীবনে স্বস্তি ফিরবে না।

তথ্যসূত্র:আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), Regional Economic Outlook: Asia and Pacific (১৫ অক্টোবর ২০২৬); বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস), Living Standard Survey 2025; দ্য ডেইলি স্টার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬; বিশ্বব্যাংক, Bangladesh Development Update (৬ অক্টোবর ২০২৬)। লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

সর্বশেষ

পাঠ্যপুস্তক

রতন চন্দ্র পাল, অতিথি লেখক: মানব সভ্যতার শ্রেষ্ঠ প্রকাশ...

ইজারাদারদের দাবি, সাতকানিয়া দেওয়ানহাট বাজার পরিচালনায় সুশাসন নিশ্চিতকরণের

অনলাইন ডেস্ক: সাতকানিয়ার দেওয়ানহাট বাজার পরিচালনায় সুশাসন নিশ্চিতকরণের দাবী...

সাতকানিয়ার কেরানীহাটে আশ্-শেফা স্কুল এন্ড কলেজে নাতে রাসুল (সাঃ) প্রতিযোগিতা সম্পন্ন

এস এম আনোয়ার হোসেন, দক্ষিণ চট্টগ্রাম: পবিত্র রবিউল আউয়াল...

যুক্তরাষ্ট্র আ.লীগের কৃষি বিষয়ক সম্পাদক নিযুক্ত সঞ্জয় কুমার সাহা

পূর্বকাল ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের কৃষি বিষয়ক সম্পাদক...

আ.লীগের কেন্দ্রীয় তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক উপকমিটির সদস্য হলেন বিধান রক্ষিত

নিজস্ব প্রতিবেদক: আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক...
spot_img