মঙ্গলবার, অক্টোবর ২৭, ২০২৬
spot_img

আধুনিকতার ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে সদাচার, ফিরুক মানবিক মূল্যবোধ

 মোহাম্মদ হাসান : বাঙালির সামাজিক পরিচয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল পারস্পরিক সৌহার্দ্য, অতিথিপরায়ণতা, প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্ববোধ এবং বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা। গ্রামবাংলার উঠান, পাড়া-মহল্লার আড্ডা, সামাজিক অনুষ্ঠান কিংবা ধর্মীয় উৎসব—সবখানেই মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের গভীর বন্ধন ছিল। সেই বন্ধনের ভিত্তি ছিল মানবিকতা, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে জীবনযাত্রা আধুনিক হলেও সামাজিক আচরণে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে মূল্যবোধের অবক্ষয়।
নগরায়ণ, প্রযুক্তিনির্ভরতা, ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা, প্রতিযোগিতা ও ভোগবাদ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করছে। মানুষ উন্নত জীবন চায়, নিজের অবস্থান পরিবর্তন করতে চায়—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই অগ্রযাত্রায় যদি সৌজন্য, সহনশীলতা ও মানবিকতা হারিয়ে যায়, তাহলে বস্তুগত উন্নয়ন সত্ত্বেও সমাজে তৈরি হয় এক গভীর শূন্যতা।
সদাচার শুধু ভদ্রতা নয়, সামাজিক দায়িত্বও
সদাচার মানে শুধু সুন্দর করে কথা বলা কিংবা আনুষ্ঠানিক সৌজন্য প্রকাশ করা নয়। অন্যের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, ভিন্নমতকে সম্মান করা, প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা, দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং জনপরিসরে নিয়মশৃঙ্খলা মেনে চলাও সদাচারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একজন মানুষ কতটা শিক্ষিত, ধনী কিংবা ক্ষমতাবান—তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তিনি অন্য মানুষের সঙ্গে কেমন আচরণ করেন।
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এর অভাব প্রায়ই চোখে পড়ে। রাস্তায় সামান্য কারণে বাগ্‌বিতণ্ডা, যানজটে নিয়ম না মানা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপমানজনক মন্তব্য, কর্মক্ষেত্রে অধস্তনদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার কিংবা ভিন্নমতের মানুষকে শত্রু মনে করার প্রবণতা সামাজিক সৌজন্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এসব আচরণ বিচ্ছিন্ন ঘটনা মনে হলেও দীর্ঘ মেয়াদে এগুলো সামাজিক সম্পর্কের ভিত দুর্বল করে।
ঐতিহ্যের ভালো দিকগুলো ফিরিয়ে আনতে হবে
বাঙালির সংস্কৃতিতে ধর্মীয় ও সামাজিক বৈচিত্র্যের মধ্যেও সহাবস্থান, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ঐতিহ্য রয়েছে। প্রতিবেশীর অসুস্থতায় খোঁজ নেওয়া, দুর্যোগে সাহায্যের হাত বাড়ানো, সামাজিক অনুষ্ঠানে একে অন্যের পাশে থাকা এবং বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবে শুভেচ্ছা বিনিময়—এসব চর্চা সমাজে সম্প্রীতি ও ঐক্য প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
তবে অতীতের সবকিছুকে আদর্শ মনে করার সুযোগ নেই। অতীতে সমাজে বৈষম্য, কুসংস্কার, নারীর প্রতি অবিচার এবং প্রভাবশালীদের অন্যায় সিদ্ধান্তের মতো সমস্যাও ছিল। তাই শিকড়ে ফেরার অর্থ পুরোনো অন্যায় ব্যবস্থাকে ফিরিয়ে আনা নয়; বরং ঐতিহ্যের মানবিক, ইতিবাচক ও কল্যাণকর দিকগুলোকে আধুনিক সমাজে প্রতিষ্ঠা করা।
পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হোক মূল্যবোধের ভিত্তি
সদাচার চর্চার প্রথম পাঠশালা পরিবার। শিশুরা বড়দের উপদেশের চেয়ে তাঁদের আচরণ থেকে বেশি শেখে। পরিবারের সদস্যরা যদি পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হন, বয়োজ্যেষ্ঠদের মর্যাদা দেন এবং গৃহকর্মী, শ্রমজীবী ও নিম্নআয়ের মানুষের সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করেন, তাহলে শিশুর মধ্যেও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে ওঠে। অন্যদিকে, পরিবারে অপমান, অসহিষ্ণুতা ও বৈষম্যের চর্চা থাকলে সদাচারের শিক্ষা বাস্তব ভিত্তি হারায়।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেও শুধু পরীক্ষার ফলাফল ও সনদ অর্জনের কেন্দ্র হিসেবে দেখলে চলবে না। সাহিত্যপাঠ, বিতর্ক, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং স্বেচ্ছাসেবামূলক উদ্যোগের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ ও দলগত মনোভাব গড়ে তুলতে হবে। একজন শিক্ষার্থী কতটা ভালো ফল করল, তার পাশাপাশি সে কতটা দায়িত্বশীল ও মানবিক নাগরিক হয়ে উঠল, সেটিও শিক্ষার সাফল্যের মাপকাঠি হওয়া উচিত।
প্রযুক্তি হোক সম্প্রীতির সেতুবন্ধ
প্রযুক্তি মানুষের যোগাযোগ সহজ করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে গুজব, বিদ্বেষ, অপমান ও ব্যক্তিগত আক্রমণ ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগও তৈরি করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার রয়েছে; তবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মানে অন্যকে অপমান করার স্বাধীনতা নয়। তথ্য যাচাই না করে কিছু প্রচার করা কিংবা কাউকে হেয় করে সামাজিক স্বীকৃতি অর্জনের চেষ্টা দায়িত্বশীল আচরণ হতে পারে না।
প্রযুক্তিকে মানবিক সম্পর্কের বিকল্প না বানিয়ে সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইতিবাচক উদ্যোগ, সাংস্কৃতিক চর্চা, জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর দৃষ্টান্ত ছড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে পাড়া-মহল্লার পাঠাগার, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগগুলোকে সক্রিয় করা প্রয়োজন।
রাষ্ট্র ও সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব
মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠা শুধু ব্যক্তির সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে না। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোকেও দায়িত্বশীল আচরণের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। বৈষম্য, বিদ্বেষ, উসকানি ও হয়রানির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নাগরিকদের মর্যাদা ও অধিকার রক্ষা করতে হবে। ধর্ম, বর্ণ, পেশা কিংবা সামাজিক অবস্থান যেন কোনো মানুষের সম্মান নির্ধারণের মাপকাঠি না হয়।
আধুনিকতা মানে শুধু উন্নত সড়ক, বড় ভবন, দ্রুতগতির ইন্টারনেট কিংবা প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ নয়। প্রকৃত উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন মানুষ নিরাপদ বোধ করে, পরস্পরকে সম্মান করে এবং বিপদে একে অন্যের পাশে দাঁড়ায়।
বাঙালির ঐতিহ্যের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ কোনো নির্দিষ্ট পোশাক, খাবার কিংবা উৎসব নয়; বরং মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্ববোধ। পরিবার, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রীয় জীবনে এই মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই গড়ে উঠবে সহনশীল, সম্প্রীতিপূর্ণ ও মানবিক সমাজ। অতীতের ভালোকে ধারণ করে অন্যায় ও সংকীর্ণতাকে পরিহার করাই হোক আমাদের অঙ্গীকার। কারণ, সভ্যতার প্রকৃত পরিচয় উন্নয়নের চাকচিক্যে নয়, মানুষের আচরণে।

লেখক:সাংবাদিক ও কলামিস্ট

 

সর্বশেষ

পাঠ্যপুস্তক

রতন চন্দ্র পাল, অতিথি লেখক: মানব সভ্যতার শ্রেষ্ঠ প্রকাশ...

ইজারাদারদের দাবি, সাতকানিয়া দেওয়ানহাট বাজার পরিচালনায় সুশাসন নিশ্চিতকরণের

অনলাইন ডেস্ক: সাতকানিয়ার দেওয়ানহাট বাজার পরিচালনায় সুশাসন নিশ্চিতকরণের দাবী...

সাতকানিয়ার কেরানীহাটে আশ্-শেফা স্কুল এন্ড কলেজে নাতে রাসুল (সাঃ) প্রতিযোগিতা সম্পন্ন

এস এম আনোয়ার হোসেন, দক্ষিণ চট্টগ্রাম: পবিত্র রবিউল আউয়াল...

যুক্তরাষ্ট্র আ.লীগের কৃষি বিষয়ক সম্পাদক নিযুক্ত সঞ্জয় কুমার সাহা

পূর্বকাল ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের কৃষি বিষয়ক সম্পাদক...

আ.লীগের কেন্দ্রীয় তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক উপকমিটির সদস্য হলেন বিধান রক্ষিত

নিজস্ব প্রতিবেদক: আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক...
spot_img