ডা. কিউ. এম. অহিদুল আলাম : এক ইন্দোনেশিয়ান নাগরিক হজের সময় এক বাংলাদেশীকে জিজ্ঞেস করেছিল- তোমরা কি আসলেই মুসলিমপ্রধান রাষ্ট্র? মুসলমান হলে তোমাদের দেশে এত ক্রাইম কেন? এই প্রশ্নটা আমিও বর্তমান ‘অপরাধ’ প্রেক্ষাপটে সবার মাঝে রাখলাম। দেশে এত সভা-সমিতি, ধর্মীয় মাহফিল- তারপরেও পুলিশ, র্যাব, রাজনীতিবিদ কেউ এই অপরাধ বৃদ্ধি থামাতে পারছে না- অপরাধ বাড়ছে তো বাড়ছেই, অপরাধের ধরনও রং বদলাচ্ছে, অপরাধ মফস্বল, শহর, রাজধানী, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস- আদালত, মাদ্রাসা, হাসপাতাল ক্লিনিক, পারিবারিক পরিমণ্ডল সর্বত্রই বিস্তৃত। সংবাদপত্রে গত ১৬ অক্টোবর ষষ্ঠ শ্রেণির মাদ্রাসা ছাত্রী ধর্ষণে অন্তঃসত্ত্বার সংবাদ দেখে এই বিষয়ে কিছু লেখার ঈমানী ও সামাজিক দায়িত্ব অনুভব করলাম ।
অপরাধীর সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পরিমণ্ডলও দিন দিন। বাড়ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, যুবসম্প্রদায়, ডাক্তার, শিক্ষক- সর্বস্তরের প্রতিনিধির অনেকেই মাদক ব্যবহার করছে, পাচারও করছে, সর্ববিধ অপরাধও করছে। খবরে দেখলাম। ‘ডোপ টেস্ট’ করতে বলায় এক কর্মচারী কর্মক্ষেত্র থেকেই পালিয়েছে। কিশোর অপরাধের চিত্র আরো ভয়াবহ। কুমিল্লা, রংপুর এর সাম্প্রতিক শিশুহত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত মাত্র ১২-১৪ বছরের কিশোর। সমাজ তত্ত্ববিদ, মানসিক বিশেষজ্ঞরা লম্বা বিবৃতি, ব্যাখ্যা হয়তো দিবেন, কিন্তু মানুষ চায় আশু প্রতিকার।
পৃথিবীর অনেক দেশেই ড্রাগ আসক্তি, ড্রাগ-বাণিজ্য, হত্যা-রাহাজানি, ছিনতাই ছিল বা আছে, কিন্তু আমাদের দেশে এসব বৃদ্ধি নিতান্ত সাম্প্রতিক সময়ের। ড্রাগবাণিজ্য, ড্রাগ সেবন, যৌনব্যবসা, হত্যা, জিম্মী, চাঁদাবাজি ইত্যাদি অপরাধ ১৯৬০-৭০ সাল থেকে চলে আসছে দক্ষিণ আমেরিকার প্রায় সব দেশে, এশিয়ার থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন ও ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জেও। এসব দেশে অপরাধ ও মাদকের বিরুদ্ধে এক দীর্ঘ লড়াই চলে। চমকপ্রদ এ যুদ্ধ। ইউরোপে ড্রাগ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়, কিন্তু কিছু যুবক- যুবতী নেহায়েত adventure এর জন্য ড্রাগ পাওয়া যায় তেমন দেশে ভ্রমণবিলাস করে।
৮০’র দশকে ছুটিকালীন জবস’ করতে থাকা এক ইউরোপীয়ান দশম শ্রেণির ছাত্রকে আমি (মেডিকেল ৩য় বর্ষ) জিজ্ঞেস করি- তোমরা বড় লোক, ‘সামার- জবস’ কর কেন? এই পোলা আমাকে বলল- সে ‘ক্যারিবিয়ান’ এ ‘হলিডে’ করবে। বললাম- পৃথিবীতে এত দেশ থাকতে ক্যারিবিয়ান যেতে চাও কেন। দশম শ্রেণিতে পড়ুয়া ইউরোপিয়ান ছাত্র বলল- ওখানে সস্তায় ‘গাঁজা’ পাওয়া যায়। কিছুদিন গাঁজা খাব। মাদকাসক্তি আমাদের দেশে একদিনে আজকের পর্যায়ে পৌঁছেনি।
আমরা আমেরিকান প্রেসিডেন্টদের ভাষা ‘War on Mass destruction’ ইরাক, ‘War on ISIS- আফ- গান, লেবানন, সর্বশেষ ‘War on Nuclear threat ‘ ইরান- এসব মিথ্যা অজুহাত এর কথা জানি, কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে সমস্ত দক্ষিণ আমেরিকা বিশেষতঃ মেক্সিকো, কলম্বিয়া, পানামা, পেরু ও ভেনেজুয়েলা আমেরিকাকে মাদক পাচারের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত করে। এই প্রেক্ষিতে ১৯৭১ সালে প্রেসিডেন্ট নিক্সন ‘War on Drug’ শুরু করেন। ২০২১ সালে ওয়াশিংটন পোস্টের সাংবাদিক গুমটাভোর প্রীতি এক দীর্ঘ প্রবন্ধে উপসংহার করেন মাদকের বিরুদ্ধে আমেরিকার ৫০-৫২ বছরের যুদ্ধ সফল হয়নি বরং আমেরিকা মাদক যুদ্ধে ‘ফেল’ করেছে।
২০২৬ সালে ইউ.এস. ফেডারেল বাজেট ছিল ৩৯ বিলিয়ন ডলার, বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ সালের বাজেট ৭৭ বিলিয়ন ডলার অর্থাৎ আমাদের দুই বার্ষিক বাজেটের অর্ধেক সমান বাজেট আমেরিকা মাদকবিরোধী যুদ্ধে বছরে খরচ করে। ১৯৭১ থেকে ২০২০ পর্যন্ত আমেরিকা ১ ট্রিলিয়ন ডলার মাদকযুদ্ধে খরচ করে। কিন্তু এই যুদ্ধে আমেরিকা জয়ী হয়নি। সাংবাদিক গুমটাভোর মতে- মাদকব্যবসায় রাজ- নীতিবিদ, আমলা, প্রান্তিক কৃষক, সাধারণ জনতার বিরাট অংশ জড়িত থাকায় এই যুদ্ধ Unstoppable বা বন্ধ করা দুরূহ। আমেরিকান সেনাবাহিনী মেক্সিকো, কলম্বিয়া, বলিভিয়া, পানামা, পেরুতে হাজার হাজার ‘ব্লক রেইড’ করে মানুষ হত্যা করে, মেক্সিকোতে এক রাতেই এক শহরতলীতে ১১ হাজার মানুষকে প্লেন থেকে ব্রাশ ফায়ার করে। মাদকবিরোধী অভিযানে মার্কিন গোয়েন্দা এজেন্ট এনরিককে কিকি কামারেনা এক অবিস্মরণীয় নাম। তিনি গোপন খবরের ভিত্তিতে ব্রুক রেইড করতেন। এমনি এক অপারেশন হয় ২৫০০ একর ব্যাপী মাদক চাষক্ষেত্র ‘রানবো বাফালো’ নামক স্থানে, এক রাতেই সব নিচ্ছিন্ন করা হয়। কিন্তু মাদক ব্যবসায়ীরা (ড্রাগ কার্টেল) কিকিকে অপহরণ করে নির্মমভাবে হত্যা করে। তার শরীর টুকরো টুকরো করে কেটে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেয়। পরবর্তীতে নেটফ্লিক্স-এই ঘটনা ও এনরিকে কিকির জীবন নিয়ে এক ‘সিরিজ’- ‘নারকস মেক্সিকো’ তৈরি করে। প্রতি বছর অক্টোবরে আমেরিকায় কিকির স্মরণে মাদক সচেতনতা সৃষ্টির জন্য সপ্তা ব্যাপী Red Ribbon Week পালন করে।
মাদক নির্মূলে আরেক যোদ্ধা ফিলিপাইনের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট রড্রিডো ডুটেটু, তিনি মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ দেখিয়ে প্রায় ৩০ হাজার ড্রাগ- ব্যবসায়ী ও ব্যবহারকারী হত্যা করেন। তিন লক্ষ পঞ্চাশ হাজার মানুষকে জেল পাঠান। আসলেই রড্রিডো ডুটেটু ফিলিপাইনকে মাদক মুক্ত করেন। কিন্তু পরবর্তী নির্বাচনে হেরে গেলে আন্তর্জাতিক অপরাধ কোর্ট তাকে বিচারবহির্ভূত হত্যার জন্য এরেস্ট করে নিয়ে যায় ও বর্তমানে নেদারল্যান্ডে বিচারাধীন আছেন। অপরাধী দমনে সরকার কি করবেন এটা সরকারের কাজ। পৃথিবীর কোন দেশ কিভাবে অপরাধী ও মাদকমুক্ত সংগ্রাম করেছে তার সংক্ষিপ্ত উপরে আলোচনা করলাম। তবে ১৯৫৮ সালে অবিভক্ত পাকিস্তানের সামরিক শাসক আইয়ুব খানের মজুতদার, ঘুষ, অপরাধীদের জন্য যে ‘স- ংক্ষিপ্ত সামরিক আদালত – Summary_military court করেছিলেন তার আবছা কিছু স্মৃতি উল্লেখ করব। লালদীঘির মাঠে বড় লম্বা ‘বর্গা বাঁশে দড়ি দিয়ে অপরাধীকে জনসমক্ষে শাস্তি দিত মিলিটারি কোর্ট। ফায়ারিং স্কোয়ার্ডে মৃত্যুদণ্ডও দেয়া হত। হাজার হাজার মানুষ বর্তমান বলি খেলারমত এই শাস্তি দেখত। সামরিক শাসন অবসানের পর দীর্ঘ এই লম্বা ‘বর্গা বাঁশ ও দড়ি বিদ্যমান ছিল ।
নাজিরহাট ট্রেনের যাত্রী কোর্ট বিল্ডিং, খাতুনগঞ্জ, আন্দরকিল্লা (তখন শহরের প্রাণকেন্দ্র) এই বাশগুলো ও দড়ি দেখে ভীত-সন্ত্রস্ত হতো। পাশ্চাত্যের মানবাধিকারের চিৎকার অনেক সময় আমাদের মত দেশের বাস্তব অবস্থার ফলপ্রসু সমাধানের পথে অন্তরায়। আমাদের দেশের বর্তমান অপরাধ ও মাদকচিত্র উল্লোখিত দেশসমূহের ৭০-৯০ দশকের সমপর্যায়ের। এ অবস্থা থেকে তাদের উত্তরণ ‘ক্রাশ প্রোগ্রামের’ মাধ্যমে হয়েছে- নরমাল পথে হয়নি। গোটা দেশ, সমাজ অপরাধপ্রবণ, এক নৈতিক বিপর্যয় বা Moral Bankruptcy এর মধ্যে পড়েছে। দারিদ্রের চিকিৎসা আছে, অনেক দরিদ্র দেশ ধনী হয়েছে পৃথিবীতে, কিন্তু Moral Bankruptcy এর কোন ঔষধ নাই। আমরা গোটা জাতিকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে এই বিপর্যয় উত্তরণে পথ কি হবে?
লেখক : বিশেষজ্ঞ চি কিৎসক, কলামিস্ট ।


