মোহাম্মদ হাসান : বাজারে গেলে সাধারণ মানুষের প্রথম দুশ্চিন্তা এখন—সীমিত আয়ে মাসের প্রয়োজনীয় খরচ মেটানো যাবে তো? চাল, ডাল, তেল, মাছ, মাংস, সবজি থেকে শুরু করে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও যাতায়াত—প্রায় প্রতিটি খাতেই ব্যয়ের চাপ। আয় যে হারে বাড়ছে, জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক ক্ষেত্রে তার চেয়ে দ্রুত বাড়ছে। ফলে সংসারের হিসাব মেলাতে গিয়ে নিম্নবিত্তের পাশাপাশি মধ্যবিত্ত পরিবারকেও সঞ্চয় ভাঙতে হচ্ছে, ঋণ নিতে হচ্ছে কিংবা প্রয়োজনীয় ব্যয় সংকুচিত করতে হচ্ছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি তাই কেবল অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানের বিষয় নয়; এটি মানুষের জীবনযাত্রা, খাদ্যনিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
মূল্যস্ফীতি কমলেই কি স্বস্তি ফেরে?
মূল্যস্ফীতি বলতে পণ্য ও সেবার সাধারণ মূল্যস্তরের ধারাবাহিক বৃদ্ধিকে বোঝায়। কোনো একটি পণ্যের দাম বাড়া আর সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি এক বিষয় নয়। একইভাবে মূল্যস্ফীতির হার কমে যাওয়ার অর্থও এই নয় যে পণ্যের দাম আগের অবস্থায় ফিরে এসেছে। বরং দাম বাড়ার গতি কিছুটা কমলেও উচ্চ মূল্যস্তর মানুষের ব্যয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকে।
বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক উপাত্ত অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি ছিল প্রায় ৯.৮৮ শতাংশ, ২০২৪ সালে ১০.৪৭ শতাংশ এবং ২০২৫ সালে ৮.৭৭ শতাংশ। অন্যদিকে, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৩৪ শতাংশ। অর্থাৎ, মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমলেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এখনো উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে মূল্যস্ফীতি বেশি থাকলে পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায় এবং একই আয়ে আগের তুলনায় কম পণ্য ও সেবা কেনা সম্ভব হয়।
কেন বাড়ছে দ্রব্যমূল্য?
দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ কাজ করে। আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্য ও জ্বালানির দাম, টাকার অবমূল্যায়ন, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, পরিবহন খরচ, উৎপাদন ঘাটতি এবং সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা এর অন্যতম। এর সঙ্গে বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব, অস্বচ্ছ মূল্যনির্ধারণ, মজুতদারি এবং অসাধু ব্যবসায়িক যোগসাজশ যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়।
২০২৬ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) একটি গবেষণায় নির্বাচিত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহব্যবস্থা বিশ্লেষণ করে সরবরাহের ঘাটতিকে উচ্চমূল্যের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পাশাপাশি যোগসাজশ ও মজুতদারির বিষয়ও উঠে আসে। তবে সব মূল্যবৃদ্ধির জন্য ব্যবসায়ীদের দায়ী করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি বাজারের অনিয়ম উপেক্ষা করাও গ্রহণযোগ্য নয়। সমস্যার প্রকৃত কারণ শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়াই জরুরি।
সবচেয়ে বেশি চাপে কারা?
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির অভিঘাত সবচেয়ে বেশি পড়ে দরিদ্র, দিনমজুর, অনানুষ্ঠানিক শ্রমিক এবং নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের ওপর। কারণ তাঁদের আয়ের বড় অংশই খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার পেছনে ব্যয় হয়। ধনী পরিবারের বাজেটে খাদ্যের দাম বৃদ্ধি তুলনামূলক কম প্রভাব ফেললেও দরিদ্র পরিবারের ক্ষেত্রে তা সরাসরি পুষ্টি, চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যয় সংকুচিত করতে পারে।
সিপিডির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দরিদ্রতম ৫ শতাংশ মানুষের ভোগব্যয়ের ৫৯.৮ শতাংশ খাদ্যে ব্যয় হয়। ধনীতম ৫ শতাংশের ক্ষেত্রে এই হার ২৮.৯ শতাংশ। এ ব্যবধানই বোঝায়, খাদ্যমূল্য বৃদ্ধি সবার ওপর সমান চাপ সৃষ্টি করে না।
বিবিএসের ২০২৫ সালের জীবনযাত্রার মান জরিপে পরিবারের গড় মাসিক আয় ছিল ৩৩ হাজার ৫১৩ টাকা, বিপরীতে ব্যয় ছিল ৩৫ হাজার ৩১১ টাকা। জরিপে অংশ নেওয়া ৪৭.৪২ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে, গত এক বছরে মৌলিক ব্যয় মেটাতে তাদের ঋণ নিতে হয়েছে। এ চিত্র পরিবারের আর্থিক চাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেয়।
আয় ও মজুরির ব্যবধান
বিবিএসের সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ শ্রমজীবীদের মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৭.৯০ শতাংশ, যেখানে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৩৪ শতাংশ। অর্থাৎ, মজুরি বৃদ্ধির তুলনায় মূল্যস্ফীতি বেশি থাকায় তাঁদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের আশঙ্কা রয়েছে। এই মজুরি সূচক অবশ্য দেশের সব চাকরিজীবীর বেতন বৃদ্ধির প্রতিনিধিত্ব করে না; এটি নির্দিষ্ট কিছু পেশার শ্রমিকদের পরিস্থিতি তুলে ধরে।
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতনকাঠামো আয় বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করলেও বর্ধিত বেতন ধাপে ধাপে কার্যকর হওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে, বেসরকারি খাতে বেতন বৃদ্ধি প্রতিষ্ঠানভেদে ভিন্ন। নিম্ন আয়ের কর্মচারী, ছোট ব্যবসায়ী, অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি এবং অনিয়মিত আয়ের মানুষের জন্য মূল্যস্ফীতির চাপ সামাল দেওয়া আরও কঠিন। ফলে শুধু বেতন বাড়ানো নয়, প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কতটা বাড়ছে, সেটিই হওয়া উচিত মূল্যায়নের প্রধান মানদণ্ড।
সমাধান কোথায়?
দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে প্রথমেই প্রয়োজন উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা। কৃষকের উৎপাদন খরচ কমানো, কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ ও পরিবহনব্যবস্থা উন্নত করা এবং আমদানি প্রক্রিয়ায় অপ্রয়োজনীয় জটিলতা দূর করা জরুরি। একই সঙ্গে বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। উৎপাদক থেকে খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত পণ্যের মূল্য ও মুনাফার ব্যবধান পর্যবেক্ষণ এবং প্রমাণিত মজুতদারি ও যোগসাজশের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি এবং সরকারের রাজস্ব ও ব্যয় ব্যবস্থাপনার মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। পাশাপাশি দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক নগদ সহায়তা, ন্যায্যমূল্যে খাদ্য সরবরাহ এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা বাড়াতে হবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নিয়মিত মজুরি বৃদ্ধি এবং বাড়িভাড়া, শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যয় সহনীয় করার দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ।
শেষ কথা
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি মোকাবিলায় সাময়িক বাজার অভিযান কিংবা বিচ্ছিন্নভাবে বেতন বাড়ানো যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন উৎপাদন, আমদানি, বাজার তদারকি, মুদ্রানীতি ও সামাজিক সুরক্ষার সমন্বিত কার্যক্রম। কারণ অর্থনীতির সাফল্য শুধু প্রবৃদ্ধি কিংবা মূল্যস্ফীতির হার দিয়ে বিচার করা যায় না; দেখতে হবে সাধারণ মানুষ কতটা স্বচ্ছন্দে খাদ্য কিনতে পারছে, চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যয় মেটাতে পারছে এবং মাস শেষে কিছু সঞ্চয় করতে পারছে কি না। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত অর্থনৈতিক নীতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট


