রবিবার, নভেম্বর ১, ২০২৬
spot_img

মঞ্চের আলোয় স্বপ্ন বুনে চলা একদল মানুষের গল্প “নাট্যাধার”

পায়েল বিশ্বাস :

একটি নাট্যদল মানে কি শুধুই কিছু মানুষের একসঙ্গে নাটক করা?

আমার কাছে মোটেও তা নয়। একটি নাট্যদল মানে অসংখ্য স্বপ্নের সম্মিলন, কিছু মানুষের নির্ঘুম রাত, মহড়াকক্ষের ঘাম, মঞ্চের পেছনের নীরব শ্রম আর দর্শকের চোখে একটুখানি আলো জ্বালানোর নিরন্তর চেষ্টা। একটি নাট্যদলের জন্ম হয়তো একটি নির্দিষ্ট দিনে, কিন্তু তার প্রকৃত বেড়ে ওঠা ঘটে সময়ের সঙ্গে, মানুষের ভালোবাসায় এবং শিল্পের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতায়। চট্টগ্রামের নাট্যাঙ্গনে এমনই একটি নাম “নাট্যাধার”। নামটির মধ্যেই যেন রয়েছে নাটককে ধারণ করার, শিল্পকে আগলে রাখার এবং মঞ্চের আলোকে বাঁচিয়ে রাখার এক প্রত্যয়।

যাত্রার সূচনালগ্ন
২০০৫ সালে কয়েকজন নাট্যপ্রেমী মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগে পথচলা শুরু হয় নাট্যাধারের। মঞ্চনাটকের প্রতি ভালোবাসা, শিল্পচর্চার তাগিদ এবং নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিসর গড়ে তোলার প্রত্যয় থেকেই জন্ম নেয় এই নাট্যদল।প্রতিষ্ঠার পর প্রস্তুতি ও সাংগঠনিক কার্যক্রম শেষে ২০০৬ সালের ৩০ অক্টোবর প্রথম মঞ্চায়নের মধ্য দিয়ে দর্শকের সামনে আত্মপ্রকাশ করে নাট্যাধার।

একটি নতুন নাট্যদলের যাত্রা শুরু করা যতটা আনন্দের, তাকে দীর্ঘদিন ধরে বাঁচিয়ে রাখা তার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন। সময়ের সঙ্গে বদলে যায় মানুষ, বদলে যায় বাস্তবতা, আসে নানা প্রতিকূলতা। কখনো অর্থনৈতিক সংকট, কখনো মঞ্চের অভাব, কখনো শিল্পীদের ব্যস্ততা—সবকিছুর মধ্যেও একটি দলকে এগিয়ে যেতে হয়।

নাট্যাধারের দীর্ঘ পথচলাকে তাই কেবল প্রতিষ্ঠার তারিখ দিয়ে বিচার করলে চলবে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য মানুষের সময়, শ্রম, ভালোবাসা ও আত্মনিবেদন।

প্রযোজনায়
সময়, ইতিহাস ও মানুষের গল্প
একটি নাট্যদলের প্রকৃত পরিচয় তার প্রযোজনায়। নাট্যাধারের প্রযোজনার তালিকাটি একটু মনোযোগ দিয়ে দেখলে বোঝা যায়, তারা কেবল নাটক মঞ্চস্থ করার মধ্যে নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখেনি। ইতিহাস, সমাজ, রাজনীতি, ভাষা, প্রান্তিক মানুষের জীবন, পরিবেশ এবং সমকালীন বাস্তবতার নানা বিষয়কে নাটকের ভাষায় তুলে ধরার চেষ্টা করেছে।তাদের প্রযোজনা গুলোর বিষয়-বৈচিত্র্য নিয়ে কথা বলতে গেলে প্রথমেই আসে ‘শিখণ্ডী কথা’।

মহাভারতের শিখণ্ডী চরিত্রকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই নাটকের মধ্য দিয়ে হিজড়া জনগোষ্ঠীর সামাজিক অবস্থান, পরিচয়, বৈষম্য ও অধিকারহীনতার প্রশ্ন উঠে আসে। সমাজের একটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে নিয়ে মঞ্চে কথা বলা নিছক নাট্যনির্মাণ নয়; বরং প্রচলিত সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির সামনে কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন ছুড়ে দেওয়া।নাট্যাধারের প্রযোজনার ইতিহাসে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয় ‘কাল বোধন’ নাটকটির কথা।

এটি ছিল নাট্যাধারের দ্বিতীয় প্রযোজনা। দুর্গাপূজার আগে দেবী দুর্গার আবাহন বা বোধনের ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গকে কেন্দ্র করে নাটকটির নামকরণ হলেও এর ভেতরে উঠে এসেছে একটি সামাজিক ইস্যু। অর্থাৎ পরিচিত একটি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আবহকে অবলম্বন করে সমাজের বাস্তব সমস্যাকে মঞ্চে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে নাট্যাধার।

আমার কাছে এই প্রযোজনার গুরুত্ব এখানেই—উৎসবের পরিচিত অনুষঙ্গের আড়ালে সমাজের এমন কিছু প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসা, যেগুলো নিয়ে আমাদের ভাবা প্রয়োজন। একটি নতুন নাট্যদলের দ্বিতীয় প্রযোজনাতেই সামাজিক বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেওয়ার এই প্রবণতা তাদের নাট্যভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নির্দেশ করে।

চট্টগ্রামের ইতিহাস ও ঐতিহ্যও নাট্যাধারের প্রযোজনায় গুরুত্বপূর্ণ জায়গা পেয়েছে। কর্ণফুলী নদী, বন্দর এবং নগরজীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ঐতিহাসিক ও সমকালীন বাস্তবতা তাদের নাট্যভাবনার অংশ হয়েছে।

একটি শহরের পরিচয় শুধু তার স্থাপনা কিংবা ভৌগোলিক অবস্থানে তৈরি হয় না; নদী, বন্দর, জনজীবন এবং ইতিহাসও সেই পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। নাটকের মাধ্যমে এসব বিষয় তুলে ধরার প্রয়াস নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ।পার্বত্য অঞ্চলের ইতিহাস ও বাস্তবতা নিয়েও কাজ করেছে নাট্যাধার।

বগালেকের ইতিহাস, কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের ফলে সৃষ্ট সামাজিক পরিবর্তন এবং আদিবাসী ও সমতলের মানুষের জীবনসংগ্রামের মতো বিষয় তাদের নাট্যভাবনায় এসেছে।উন্নয়ন, বাস্তুচ্যুতি, ভূমি ও পরিচয়ের প্রশ্নগুলো এখানে কেবল আঞ্চলিক বিষয় নয়; এগুলো আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজের বৃহত্তর বাস্তবতার অংশ।‘উন্মাদ সাক্ষাৎকার’ নাটকটির বিষয়বস্তুও আলাদা করে উল্লেখ করার মতো।

মানসিক স্বাস্থ্য ও মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত মানুষের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি, অবহেলা এবং মানবিক আচরণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে এই নাটকের ভাবনা তৈরি হয়েছে।মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে যেখানে এখনো নানা সামাজিক সংকোচ ও ভুল ধারণা রয়েছে, সেখানে থিয়েটারের মাধ্যমে বিষয়টি সামনে নিয়ে আসা একটি সচেতন সাংস্কৃতিক উদ্যোগ।

মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়েও নাট্যাধারের একাধিক প্রযোজনা রয়েছে। ‘বাংলার মহানায়ক’ নাটকের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরার প্রয়াস দেখা যায়। অন্যদিকে ‘ধানমন্ডি ৩২’ নাটকে মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার প্রসঙ্গ এসেছে। ‘আমাদের ৭১’ নাটকের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার পরবর্তী সময় এবং বাংলাদেশের পঞ্চাশ বছর পূর্তির প্রাক্কালে দেশের অর্জন, সংকট ও পরিবর্তনের বিষয়গুলো মঞ্চে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।এই প্রযোজনাগুলোর বিশেষত্ব হলো, ইতিহাসকে কেবল অতীতের ঘটনা হিসেবে দেখার পরিবর্তে বর্তমানের সঙ্গে তার সম্পর্ক অনুসন্ধান করা। কারণ ইতিহাসের কাজ শুধু স্মৃতিচারণ নয়, ইতিহাস থেকে বর্তমানকে বোঝার চেষ্টাও।

‘হিড়িম্বা’ নাটকটি মহাভারতের একটি উপেক্ষিত নারী চরিত্রকে নতুনভাবে দেখার সুযোগ তৈরি করে। হিড়িম্বার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে নারীর নিগৃহীত হওয়ার প্রশ্ন, ক্ষমতার সম্পর্ক এবং নারীর অবস্থানকে সমকালীন বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখার সুযোগ রয়েছে। পুরাণের একটি চরিত্রকে বর্তমান সময়ের সামাজিক প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করা নাট্যচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

নাট্যাধারের আরেকটি উল্লেখযোগ্য প্রযোজনা ‘পণ্ডিতবিহার বিশ্ববিদ্যালয়’।

চট্টগ্রামের আনোয়ারার বটতলী এলাকার প্রস্তাবিত পণ্ডিতবিহার বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে নাটকটির ভাবনা।

প্রয়াত নাট্যকার আহমদ কবীরের রচনা এবং মোস্তফা কামাল যাত্রার নির্দেশনায় নাট্যাধার ২০২২ সালে প্রযোজনাটি মঞ্চে আনে। স্থানীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং একটি অপূর্ণ সম্ভাবনাকে নাটকের ভাষায় তুলে ধরার এই উদ্যোগ আমার কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

কারণ নিজের শহরের ইতিহাসকে নিজেরাই ধারণ ও সংরক্ষণ করতে না পারলে একসময় সেই ইতিহাস বিস্মৃতির আড়ালে হারিয়ে যায়।

ভাষার ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়েও কাজ করেছে নাট্যাধার। ‘চর্যাচর্য বিনিশ্চয়’ প্রযোজনায় চর্যাপদ, বাংলা ভাষার আদি পরিচয় এবং চর্যাপদের ভাষাগত বৈশিষ্ট্য নিয়ে অনুসন্ধান করা হয়েছে।

চর্যাপদের ভাষা, ভারতীয় বিভিন্ন ভাষার সঙ্গে তার সম্পর্ক এবং ভাষার ইতিহাস নিয়ে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর গবেষণার প্রসঙ্গও নাট্যভাবনায় জায়গা পেয়েছে। ভাষার শিকড় অনুসন্ধানের এমন প্রয়াস থিয়েটারকে শুধু অভিনয়শিল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে না, বরং জ্ঞান ও গবেষণার একটি সাংস্কৃতিক পরিসরও তৈরি করে।

চট্টগ্রামের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে ‘ইউএসটিসি বধ্যভূমি’ প্রযোজনায়।

চট্টগ্রামের বধ্যভূমির জায়গা দখল হয়ে যাওয়ার প্রতিবাদ এবং সেই ঐতিহাসিক স্থান উদ্ধারের সচেতনতা তৈরির উদ্দেশ্যে নাটকটি নির্মিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত একটি স্থান যখন অবহেলা কিংবা দখলের শিকার হয়, তখন তার প্রতিবাদ জানানোও সাংস্কৃতিক দায়িত্বের অংশ।

নাট্যাধার সেই প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে থিয়েটারকে ব্যবহার করেছে।

পরিবেশ ও প্রকৃতি রক্ষার প্রশ্নও তাদের নাট্যভাবনার বাইরে নয়।

‘ক্ষুব্ধ স্বদেশীর গান’ প্রযোজনায় সিআরবি এর একটি এলাকার গাছ কেটে সেখানে হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী অবস্থান উঠে এসেছে।

প্রকৃতি, স্থানীয় মানুষের জীবন এবং নিজেদের পরিবেশ তথা প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষার আকাঙ্ক্ষাকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই নাটক আমাদের মনে করিয়ে দেয়, উন্নয়নের নামে প্রকৃতি ধ্বংসের প্রশ্নে নাগরিক সচেতনতা কতটা জরুরি।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাট্যরচনাও নাট্যাধারের সাম্প্রতিক প্রযোজনায় জায়গা পেয়েছে। ‘কর্ণ-কুন্তী সংবাদ’ এবং ‘গান্ধারীর আবেদন’ এর মতো কাব্যনাট্যের মঞ্চায়ন তাদের নাট্যচর্চায় ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে।

সমকালীন সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি ধ্রুপদি সাহিত্যকে নতুনভাবে মঞ্চে ফিরিয়ে আনার এই প্রচেষ্টাও প্রশংসার দাবি রাখে।

সব মিলিয়ে নাট্যাধারের প্রযোজনাগুলোর দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়—তারা সচেতনভাবেই চট্টগ্রামের ইতিহাস, সমাজ, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবন-সংগ্রামকে নিজেদের নাট্যভাবনার মধ্যে জায়গা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। আমার কাছে এই জায়গাটিই তাদের কাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।

জিয়া হায়দারের স্মৃতিতে শ্রদ্ধার এক আয়োজন
নাট্যাধারের সাংগঠনিক উদ্যোগের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো ‘জিয়া হায়দার স্মারক নাট্যপদক’।

প্রয়াত নাট্যব্যক্তিত্ব অধ্যাপক জিয়া হায়দারের স্মৃতিকে ধারণ করে এই পদক প্রবর্তন নিঃসন্দেহে একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ।

একজন শিল্পী চলে যান, কিন্তু তাঁর কাজ, চিন্তা ও শিল্পদর্শন থেকে যায়। সেই মানুষটিকে স্মরণ করার সবচেয়ে সুন্দর উপায় হলো তাঁর আদর্শকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া।

নাট্যাধারের এই উদ্যোগ চট্টগ্রামের নাট্যাঙ্গনের গুণী মানুষদের সম্মানিত করার পাশাপাশি নাট্যচর্চার ইতিহাস সংরক্ষণেরও একটি প্রয়াস।

একটি নাট্যদল যখন নিজের কাজের পাশাপাশি অন্য শিল্পীদের অবদানকেও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে, তখন তার সাংস্কৃতিক পরিসর আরও বড় হয়ে ওঠে।

মঞ্চের পেছনের মানুষগুলোও ইতিহাসের অংশ
নাট্যদলের ইতিহাস বলতে আমরা সাধারণত প্রতিষ্ঠাতা, নির্দেশক কিংবা প্রধান অভিনেতাদের নাম সামনে নিয়ে আসি। অথচ একটি নাটক মঞ্চে তুলে ধরার পেছনে কত মানুষের শ্রম থাকে, তার হিসাব কি আমরা রাখি?

মহড়াকক্ষে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় দেওয়া অভিনয়শিল্পী, মঞ্চসজ্জার কারিগর, আলোকসম্পাতের দায়িত্বে থাকা মানুষ, শব্দ পরিকল্পনাকারী, পোশাক ও প্রচারের সঙ্গে যুক্ত কর্মী—প্রত্যেকেই একটি প্রযোজনার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

কত মানুষ হয়তো জীবনের প্রয়োজনে থিয়েটার থেকে দূরে সরে গেছেন। কেউ হয়তো নেপথ্যে থেকে গেছেন, কেউ হারিয়ে গেছেন সময়ের স্রোতে। কিন্তু তাঁদের শ্রম মুছে যায় না। একটি নাট্যদলের ইতিহাসে তাঁদেরও জায়গা থাকা উচিত।

নাট্যাধারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আয়োজনে প্রয়াত সদস্যদের স্মরণ এবং চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমির দীর্ঘদিনের কর্মী মো. সফিকুর রহমানকে সম্মাননা জানানোর বিষয়টি তাই আমার কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

কারণ শিল্পের ইতিহাস শুধু মঞ্চে যাঁরা আলো পান তাঁদের দিয়ে তৈরি হয় না; যাঁরা নীরবে আলো জ্বালিয়ে রাখেন, তাঁরাও সেই ইতিহাসের সমান অংশীদার।

চট্টগ্রামের থিয়েটার: ভালোবাসা আছে, সংকটও আছে
চট্টগ্রামের নাট্যাঙ্গন নিয়ে লিখতে বসলে আবেগের পাশাপাশি কিছু অস্বস্তিকর বাস্তবতার কথাও বলতে হয়। এই শহরে নাট্যচর্চার ইতিহাস আছে, প্রতিভাবান শিল্পী আছেন, মেধাবী নির্দেশক ও নাট্যকর্মী আছেন। কিন্তু তাঁদের ধরে রাখার মতো পরিবেশ কতটা তৈরি হয়েছে?

কেন অনেক সম্ভাবনাময় শিল্পীকে একসময় ঢাকামুখী হতে হয়?

কেন চট্টগ্রামের নাট্যদল গুলোকে নিয়মিত মঞ্চায়ন, পৃষ্ঠপোষকতা ও দর্শক তৈরির ক্ষেত্রে এত প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়?

কেন একটি শহরের সমৃদ্ধ নাট্য-ঐতিহ্য থাকা সত্ত্বেও সেই শহরে থিয়েটারকে আরও শক্তিশালী সাংগঠনিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো যায় না?

এসব প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

চট্টগ্রামের নাট্যাঙ্গনকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে শুধু কয়েকটি নাট্যদলের আন্তরিকতা যথেষ্ট নয়।

প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ, পারস্পরিক সহযোগিতা, সুস্থ্য সাংগঠনিক সংস্কৃতি এবং শিল্পের প্রতি প্রকৃত দায়বদ্ধতা।

নাট্যাধারের মতো অভিজ্ঞ দলগুলোর কাছে প্রত্যাশা তাই আরও বেশি। তারা নতুনদের জন্য জায়গা তৈরি করবে, তরুণ নাট্যকর্মীদের উৎসাহিত করবে, নতুন নাট্যকার ও নির্দেশকদের কাজের সুযোগ দেবে। একই সঙ্গে চট্টগ্রামের নাট্যাঙ্গনের সংকট ও সম্ভাবনা নিয়ে নিজেদের অবস্থানও স্পষ্ট করবে।

সামনে আরও অনেক পথ
দুই দশকের বেশি সময়ের পথচলা একটি নাট্যদলের জন্য নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তবে আমি মনে করি, কোনো দলের সবচেয়ে বড় সাফল্য শুধু তার অতীতের অর্জনে নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য সে কতটা সম্ভাবনা তৈরি করতে পারছে, তার মধ্যেও নিহিত।

নাট্যাধার তাদের পুরোনো প্রযোজনাগুলো সংরক্ষণ করুক, নাট্যকর্মীদের স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা নথিবদ্ধ করুক, নতুন প্রজন্মের জন্য নিয়মিত কর্মশালা ও নাট্যচর্চার সুযোগ তৈরি করুক। সময়ের সঙ্গে নতুন নাট্যভাষা তৈরি করুক। সমকালীন সমাজ, মানুষের সংকট, অন্যায়, বৈষম্য ও মানবিকতার প্রশ্নগুলো মঞ্চে তুলে ধরুক।

কারণ থিয়েটার কেবল বিনোদন নয়। থিয়েটার মানুষকে ভাবায়, প্রশ্ন করতে শেখায়, কখনো প্রতিবাদের ভাষা হয়ে ওঠে।

যে মঞ্চ মানুষের কথা বলতে পারে না, সে মঞ্চের আলো যত উজ্জ্বলই হোক, তার শিল্প-সার্থকতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

শেষ কথায়…

নাট্যাধারের পথচলার দিকে তাকালে মনে হয়, একটি দলের পেছনে আসলে কতগুলো মানুষের জীবন জড়িয়ে থাকে! কত স্বপ্ন, কত স্মৃতি, কত আনন্দ-বেদনা, কত পাওয়া-না পাওয়ার গল্প।

কেউ হয়তো প্রথম দিন থেকে আছেন, কেউ মাঝপথে যুক্ত হয়েছেন, কেউ আবার জীবনের প্রয়োজনে দূরে সরে গেছেন। কিন্তু প্রত্যেকেরই কোনো না কোনোভাবে এই পথচলায় অংশ রয়েছে।

একটি দলকে ভালোবাসা মানে তার প্রতিটি কাজের প্রশংসা করা নয়; বরং তার আরও ভালো কাজের প্রত্যাশা করা, প্রয়োজন হলে প্রশ্ন করা, ভুলগুলো শুধরে নেওয়ার সাহস জোগানো। কারণ ভালোবাসার মধ্যেই সমালোচনা থাকে, আর সমালোচনার মধ্যেই এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা।

নাট্যাধারের কাছে আমার প্রত্যাশা, তারা শুধু নিজেদের ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে থাকবে না; নতুন ইতিহাস তৈরির সাহসও দেখাবে। চট্টগ্রামের মঞ্চনাটকের শেকড় আরও গভীরে ছড়িয়ে দেবে। নতুন প্রজন্মকে সঙ্গে নিয়ে এমন এক নাট্যপরিসর তৈরি করবে, যেখানে শিল্পের স্বাধীনতা থাকবে, থাকবে মানুষের কথা বলার সাহস।

পর্দা নামবে, আলো নিভবে, দর্শক ঘরে ফিরবে। কিন্তু একটি ভালো নাটকের রেশ থেকে যাবে মানুষের হৃদয়ে। সেই রেশটুকু বাঁচিয়ে রাখার নামই থিয়েটার।

নাট্যাধারের প্রতি ভালোবাসা ও শুভকামনা। মঞ্চের আলোয় জেগে থাকুক মানুষের গল্প, সময়ের সত্য, শিল্পের দায়বদ্ধতা আর একদল স্বপ্নবাজ মানুষের নিরন্তর পথচলা।

সর্বশেষ

পাঠ্যপুস্তক

রতন চন্দ্র পাল, অতিথি লেখক: মানব সভ্যতার শ্রেষ্ঠ প্রকাশ...

ইজারাদারদের দাবি, সাতকানিয়া দেওয়ানহাট বাজার পরিচালনায় সুশাসন নিশ্চিতকরণের

অনলাইন ডেস্ক: সাতকানিয়ার দেওয়ানহাট বাজার পরিচালনায় সুশাসন নিশ্চিতকরণের দাবী...

সাতকানিয়ার কেরানীহাটে আশ্-শেফা স্কুল এন্ড কলেজে নাতে রাসুল (সাঃ) প্রতিযোগিতা সম্পন্ন

এস এম আনোয়ার হোসেন, দক্ষিণ চট্টগ্রাম: পবিত্র রবিউল আউয়াল...

যুক্তরাষ্ট্র আ.লীগের কৃষি বিষয়ক সম্পাদক নিযুক্ত সঞ্জয় কুমার সাহা

পূর্বকাল ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের কৃষি বিষয়ক সম্পাদক...

আ.লীগের কেন্দ্রীয় তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক উপকমিটির সদস্য হলেন বিধান রক্ষিত

নিজস্ব প্রতিবেদক: আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক...
spot_img