সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬
spot_img

প্রতিবাদের নামে মব সংস্কৃতি: গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত

 মোহাম্মদ হাসান : গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে অন্যায়, অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার অধিকার প্রতিটি নাগরিকের রয়েছে। বরং প্রশ্ন তোলা, সমালোচনা করা এবং রাষ্ট্রের কাছে জবাবদিহি দাবি করার মধ্য দিয়েই গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়। কিন্তু প্রতিবাদের অধিকার কাউকে অপমান, শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার হুমকি কিংবা অশালীন ভাষায় আক্রমণ করার অনুমতি দেয় না। দুঃখজনকভাবে, সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের জনপরিসরে প্রতিবাদের নামে হুমকি, অপমান ও দলবদ্ধ চাপ প্রয়োগের যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও আইনের শাসনের জন্য উদ্বেগজনক।

প্রশ্ন হচ্ছে, কোনো সরকারি কর্মকর্তা অনিয়ম বা দুর্নীতিতে জড়িত থাকলে তাঁর জবাবদিহি নিশ্চিত হবে কীভাবে? এর উত্তর স্পষ্ট—আইন, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়িত্বশীল প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার মাধ্যমে। অভিযোগের ভিত্তিতে বিভাগীয় তদন্ত, প্রশাসনিক ব্যবস্থা, আদালত কিংবা দুর্নীতি দমন কমিশনের শরণাপন্ন হওয়ার সুযোগ রয়েছে। গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজও অনিয়ম তুলে ধরে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু এসব প্রক্রিয়া পাশ কাটিয়ে জনসমক্ষে হুমকি, অপমান কিংবা দলবদ্ধ চাপের মাধ্যমে কাউকে নতিস্বীকারে বাধ্য করা ন্যায়বিচারের পথ নয়।

প্রতিবাদ ও মব সংস্কৃতি এক নয়

প্রতিবাদ হলো অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুক্তিনির্ভর, শান্তিপূর্ণ ও সংগঠিত নাগরিক অবস্থান। অন্যদিকে, মব সংস্কৃতি হলো দলগত উত্তেজনা, ভয়ভীতি, অপমান কিংবা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা। এ দুইয়ের পার্থক্য মৌলিক। প্রতিবাদ অধিকার প্রতিষ্ঠা করে, আর মবের দৌরাত্ম্য অনেক সময় অন্যের অধিকার ও মর্যাদা কেড়ে নেয়।
একজন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে তার সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া উচিত। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু তদন্তের আগেই কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা, জনসমক্ষে অপদস্থ করা কিংবা শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার হুমকি দেওয়া আইনের শাসনের পরিপন্থী। কারণ অভিযোগ আর অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়।
ব্রিটিশ আইনবিদ এ. ভি. ডাইসির আইনের শাসন-তত্ত্বের অন্যতম মূল কথা হলো, কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। এই নীতি সরকারি কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতা কিংবা সাধারণ নাগরিক—সবার ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য। একজন কর্মকর্তা অপরাধ করলে তাঁকে জবাবদিহির আওতায় আসতে হবে; একইভাবে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগকারী কেউ আইন লঙ্ঘন করলে তিনিও দায়মুক্তি পেতে পারেন না। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার নামে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কারও নেই।

ক্ষোভের কারণ আছে, সমাধান মব নয়

প্রশাসনিক হয়রানি, দুর্নীতি, সেবাবঞ্চনা, দীর্ঘসূত্রতা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। অনেক ক্ষেত্রে যথাযথ প্রতিকার না পাওয়া কিংবা অভিযোগ জানিয়েও কার্যকর ফল না মেলায় মানুষের মধ্যে হতাশা বাড়ে। এই হতাশা কখনো কখনো আক্রমণাত্মক আচরণে রূপ নিতে পারে।
সামাজিক মনোবিজ্ঞানের বিভিন্ন ব্যাখ্যায় দেখা যায়, দীর্ঘস্থায়ী হতাশা মানুষের আগ্রাসী আচরণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। আবার দলবদ্ধ পরিবেশে ব্যক্তির নিজস্ব দায়বদ্ধতার অনুভূতি দুর্বল হয়ে গেলে এমন আচরণে উৎসাহ তৈরি হতে পারে, যা এককভাবে তিনি হয়তো করতেন না। এর সঙ্গে যুক্ত হয় নৈতিক আত্মপক্ষসমর্থন—অন্যায় আচরণকেও ন্যায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম হিসেবে উপস্থাপনের প্রবণতা।
কিন্তু ক্ষোভের বাস্তব কারণ থাকলেই যেকোনো আচরণ বৈধ হয়ে যায় না। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে নিজেই অন্যায়ের আশ্রয় নিলে প্রতিবাদের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রতিকার প্রয়োজন, কিন্তু তার সমাধান যদি ভয়ভীতি ও দলবদ্ধ আধিপত্যের মধ্যে খোঁজা হয়, তাহলে ন্যায়বিচারের পরিবর্তে প্রতিশোধের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে।

কর্মকর্তার মর্যাদা ও জবাবদিহি—দুটিই জরুরি

সরকারি কর্মকর্তাদের মর্যাদা রক্ষার অর্থ তাঁদের জবাবদিহির ঊর্ধ্বে রাখা নয়। জনগণের করের অর্থে পরিচালিত প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও জনবান্ধব আচরণ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। ঘুষ, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, নাগরিকের সঙ্গে দুর্ব্যবহার কিংবা দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ উঠলে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
একই সঙ্গে প্রতিবাদের নামে কর্মকর্তাদের অপমান, হুমকি কিংবা শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার প্রবণতাও প্রতিরোধ করতে হবে। কারণ আজ একজন সরকারি কর্মকর্তা দলবদ্ধ আক্রমণ বা ভয়ভীতির শিকার হলে আগামীকাল একজন শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিক, বিচারক কিংবা সাধারণ নাগরিকও একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারেন। তখন ব্যক্তির নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও মর্যাদা রক্ষার নিশ্চয়তা কোথায় থাকবে?
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে দুর্নীতিমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করা যায় না। বরং প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করে তোলাই টেকসই সমাধান। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর তাৎক্ষণিক চাপের কাছে প্রতিষ্ঠানকে নতি স্বীকারে বাধ্য করা হলে দীর্ঘ মেয়াদে প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই

মব সংস্কৃতির বিস্তার রোধে রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্বের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যদি হুমকি, অপমান কিংবা বলপ্রয়োগকে সাহসিকতা বা জনতার ন্যায়বিচার হিসেবে প্রচার করে, তাহলে সমাজে বিপজ্জনক বার্তা ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হতে পারে যে যুক্তি, প্রমাণ ও আইনি প্রক্রিয়ার চেয়ে দলবদ্ধ শক্তি ও প্রভাব বেশি কার্যকর।
ফরাসি দার্শনিক জঁ-জাক রুসোর সামাজিক চুক্তি-তত্ত্বের আলোকে নাগরিক স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বের সম্পর্কটি গুরুত্বপূর্ণ। নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে অন্যের অধিকার, সম্মান ও নিরাপত্তা কেড়ে নেওয়া যায় না। গণতন্ত্র কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠের শক্তি প্রদর্শনের নাম নয়; এটি ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা, ব্যক্তিস্বাধীনতা, আইনের শাসন এবং পারস্পরিক মর্যাদা রক্ষার ব্যবস্থাও।
তাই রাজনৈতিক নেতৃত্বকে স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে—দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকে সমর্থন করা হবে, কিন্তু হুমকি, অপমান ও সহিংসতাকে কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। জনপ্রিয়তা অর্জন কিংবা তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক সুবিধার জন্য উগ্র আচরণকে বৈধতা দেওয়া হলে তার পরিণতি শেষ পর্যন্ত পুরো সমাজকেই বহন করতে হবে।

প্রতিবাদের অধিকার থাকুক, মবের দৌরাত্ম্য নয়

দুর্নীতি ও প্রশাসনিক অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিবাদের জন্য প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, প্রমাণ, স্বচ্ছ তদন্ত এবং আইনি প্রতিকার। প্রয়োজন হলে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন, গণস্বাক্ষর, সংবাদ সম্মেলন কিংবা গণমাধ্যমে তথ্য প্রকাশের মতো গণতান্ত্রিক পথ অনুসরণ করা যেতে পারে। এসব উদ্যোগের মধ্য দিয়েই জনমত তৈরি হয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহির আওতায় আনা সম্ভব হয়।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব অভিযোগের দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা। প্রশাসনের দায়িত্ব নাগরিক সেবা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখা। রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্বের দায়িত্ব উগ্রতা নিরুৎসাহিত করা। আর নাগরিকের দায়িত্ব নিজের অধিকার চর্চার পাশাপাশি অন্যের অধিকার ও মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা।
গণতন্ত্রে প্রতিবাদ থাকবে, প্রশ্ন থাকবে, সমালোচনা থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রতিবাদের ভাষা যখন গালিগালাজে পরিণত হয়, দাবি যখন হুমকিতে রূপ নেয় এবং জবাবদিহির নামে দলবদ্ধ চাপ প্রয়োগ প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন গণতান্ত্রিক মূল্যবোধই হুমকির মুখে পড়ে। আইনের শাসনের বিকল্প কখনো জনতার তাৎক্ষণিক আবেগ হতে পারে না।
মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্র পরিচালিত হবে আইনের শাসনে, কারও ব্যক্তিগত দাপটে নয়; অন্যায়ের বিচার হবে আইনসম্মত প্রক্রিয়ায়, মবের দরবারে নয়। প্রতিবাদের অধিকার রক্ষা করতে হলে যেমন অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে, তেমনি প্রতিবাদের নামে অন্যায় করার প্রবণতাকেও প্রত্যাখ্যান করতে হবে। কারণ গণতন্ত্রের শক্তি দলবদ্ধ দাপটে নয়, যুক্তি, ন্যায়বিচার, নাগরিক দায়িত্ববোধ ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধায়।

লেখক:সাংবাদিক ও কলামিস্ট

সর্বশেষ

পাঠ্যপুস্তক

রতন চন্দ্র পাল, অতিথি লেখক: মানব সভ্যতার শ্রেষ্ঠ প্রকাশ...

ইজারাদারদের দাবি, সাতকানিয়া দেওয়ানহাট বাজার পরিচালনায় সুশাসন নিশ্চিতকরণের

অনলাইন ডেস্ক: সাতকানিয়ার দেওয়ানহাট বাজার পরিচালনায় সুশাসন নিশ্চিতকরণের দাবী...

সাতকানিয়ার কেরানীহাটে আশ্-শেফা স্কুল এন্ড কলেজে নাতে রাসুল (সাঃ) প্রতিযোগিতা সম্পন্ন

এস এম আনোয়ার হোসেন, দক্ষিণ চট্টগ্রাম: পবিত্র রবিউল আউয়াল...

যুক্তরাষ্ট্র আ.লীগের কৃষি বিষয়ক সম্পাদক নিযুক্ত সঞ্জয় কুমার সাহা

পূর্বকাল ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের কৃষি বিষয়ক সম্পাদক...

আ.লীগের কেন্দ্রীয় তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক উপকমিটির সদস্য হলেন বিধান রক্ষিত

নিজস্ব প্রতিবেদক: আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক...
spot_img