বুধবার, নভেম্বর ৪, ২০২৬
spot_img

মাদকের বিস্তার: খুচরা কারবারি নয়, ভাঙতে হবে অপরাধের শিকড়

মোহাম্মদ হাসান : মাদক এখন বাংলাদেশের জন্য কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি, সামাজিক নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় সুশাসনের জন্য গভীর সংকট। তরুণ জনগোষ্ঠীর একটি অংশ যখন মাদকের বিস্তৃত জালে আটকে পড়ে, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু ব্যক্তি ও পরিবার নয়, রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কর্মক্ষমতা, উৎপাদনশীলতা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতাও। অথচ দীর্ঘদিন ধরে অভিযান, গ্রেপ্তার, মামলা ও শাস্তির মতো প্রচলিত ব্যবস্থা অব্যাহত থাকলেও মাদকের বিস্তার থামছে না। প্রশ্ন হচ্ছে, এত অভিযান ও কঠোর আইন থাকার পরও মাদকের বাজার টিকে আছে কেন? এর উত্তর খুঁজতে হলে খুচরা বিক্রেতা ও ব্যবহারকারীর বাইরে গিয়ে অপরাধের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শিকড় অনুসন্ধান করতে হবে।

ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে চীনে ব্রিটিশদের আফিম বাণিজ্য ও পাচারের বিরুদ্ধে কর্মকর্তা লিন জেশুর প্রতিরোধ ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে। সেই ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, মাদক শুধু ব্যক্তির আসক্তির বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অর্থনৈতিক স্বার্থ, ক্ষমতা এবং সংগঠিত অপরাধের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক। বাংলাদেশের মাদক সমস্যাকেও এই বৃহত্তর বাস্তবতার আলোকে দেখতে হবে।
দেশে ১৯৯০ সালের আইনের পর ২০১৮ সালে নতুন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণীত হয়েছে। পরবর্তী সময়ে আইন সংশোধন ও নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগও আলোচনায় এসেছে। কিন্তু আইনের কঠোরতা আর আইনের কার্যকর প্রয়োগ এক বিষয় নয়। আইন প্রয়োগ যদি রাজনৈতিক পরিচয়, অর্থনৈতিক প্রভাব কিংবা প্রশাসনিক ক্ষমতার ভিত্তিতে ভিন্ন হয়, তাহলে কঠোর আইনও কাগুজে ব্যবস্থায় পরিণত হয়। সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, মাদক নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি প্রশাসনিক জবাবদিহি, দক্ষতা ও সামাজিক সচেতনতা নিশ্চিত করা জরুরি।
বাংলাদেশে মাদক সমস্যার একটি আলোচিত উদাহরণ রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প। দীর্ঘদিন ধরে সেখানে মাদক ব্যবসা, অস্ত্রের ব্যবহার ও সংঘবদ্ধ অপরাধী গোষ্ঠীর তৎপরতার অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান ও মাদক-অস্ত্র উদ্ধারের পরও যদি একই এলাকায় মাদকের বাজার টিকে থাকে, তাহলে বুঝতে হবে সমস্যাটি কয়েকজন খুচরা বিক্রেতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর পেছনে রয়েছে অপরাধী নেটওয়ার্ক, দারিদ্র্য, কর্মসংস্থানের অভাব এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার জটিল সমন্বয়।
তবে ক্যাম্পের সব বাসিন্দাকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা অন্যায়। সেখানে বসবাসকারী অধিকাংশ মানুষই নিম্নআয়ের এবং নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে জীবনযাপন করেন। আবাসনসংকট, শিক্ষার সীমাবদ্ধতা ও কর্মসংস্থানের অভাব তরুণদের একটি অংশকে অপরাধী চক্রের প্রলোভন ও শোষণের ঝুঁকিতে ফেলছে। তাই শুধু অভিযান নয়, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তার উদ্যোগও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের মাদকবাজারের সঙ্গে আন্তর্জাতিক পাচার নেটওয়ার্কের যোগাযোগও গভীর। মিয়ানমারসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ইয়াবা, ক্রিস্টাল মেথ বা আইসসহ বিভিন্ন সিনথেটিক মাদক দেশে প্রবেশের তথ্য বিভিন্ন সময়ে উঠে এসেছে। টেকনাফ সীমান্ত, নাফ নদ ও বঙ্গোপসাগরের জলপথ পাচারের গুরুত্বপূর্ণ রুট হিসেবে আলোচিত। সীমান্তে নজরদারি ও নিয়মিত অভিযান সত্ত্বেও সরবরাহ অব্যাহত থাকার অর্থ, পাচারকারীরা নতুন রুট ও কৌশল ব্যবহার করছে। তাই শুধু মাদক উদ্ধারের পরিসংখ্যান নয়, পাচারের উৎস, অর্থদাতা, পরিবহনকারী ও দেশীয় পৃষ্ঠপোষকদের শনাক্ত করাও জরুরি।
মাদক ব্যবসার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো এর বিপুল মুনাফা। একজন খুচরা বিক্রেতাকে গ্রেপ্তার করলে তার জায়গায় অন্য কেউ চলে আসে। কারণ, এই ব্যবসার মূল নিয়ন্ত্রণ থাকে অর্থদাতা, সরবরাহকারী, পরিবহনকারী, গুদাম নিয়ন্ত্রক ও প্রভাবশালী পৃষ্ঠপোষকদের হাতে। বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসায় সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও সংবাদমাধ্যমে এসেছে। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। অপরাধ প্রমাণিত হলে রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা প্রশাসনিক পদমর্যাদা বিবেচনা না করে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। যে প্রতিষ্ঠান অপরাধ দমনের দায়িত্বে, তার কোনো সদস্য অপরাধী চক্রকে সুরক্ষা দিলে মাদকবিরোধী অভিযান কখনো সফল হতে পারে না।
এ ক্ষেত্রে ‘ফলো দ্য মানি’ বা অর্থের গতিপথ অনুসরণের কৌশল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাদক ব্যবসার অর্থদাতা ও পৃষ্ঠপোষকদের শনাক্ত করতে ব্যাংক হিসাব, সম্পদের উৎস, সন্দেহজনক লেনদেন এবং ব্যবসায়িক বিনিয়োগ অনুসন্ধান করতে হবে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবি, কোস্টগার্ড, কাস্টমস ও বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের মধ্যে কার্যকর তথ্য বিনিময় এবং সমন্বিত তদন্ত নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অপরাধের অর্থনৈতিক ভিত্তি ধ্বংস করা না গেলে মাদক ব্যবসার লাভজনক কাঠামো অক্ষতই থেকে যাবে।
অন্যদিকে মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে শুধু অপরাধী হিসেবে দেখার প্রবণতা থেকেও বেরিয়ে আসতে হবে। মাদকাসক্তি একটি জটিল স্বাস্থ্যগত ও সামাজিক সমস্যা। এর সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্য, পারিবারিক পরিবেশ ও সামাজিক বঞ্চনার সম্পর্ক রয়েছে। মাদকের অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে চুরি, সহিংসতা কিংবা পারিবারিক নির্যাতনের ঘটনা পরিবার ও সমাজকে বিপর্যস্ত করছে। তাই সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র, প্রশিক্ষিত চিকিৎসক, কাউন্সেলিং এবং পুনর্বাসনের সুযোগ বাড়াতে হবে। বেসরকারি পুনর্বাসনকেন্দ্রগুলোর মান ও রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও কার্যকর তদারকি প্রয়োজন।
মাদক প্রতিরোধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কিশোর ও তরুণদের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, কারিগরি শিক্ষা এবং সৃজনশীল চর্চার সুযোগ বাড়াতে হবে। জেনেভা ক্যাম্পের মতো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় তরুণদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের বাস্তব সুযোগ তৈরি করা জরুরি। অপরাধী চক্রের হাত থেকে তরুণদের ফিরিয়ে আনতে হলে তাদের সামনে সম্মানজনক জীবিকার পথ খুলে দিতে হবে।
মাদকবিরোধী অভিযানের সাফল্যও নতুনভাবে পরিমাপ করা প্রয়োজন। কতজন গ্রেপ্তার হলো কিংবা কত পিস মাদক উদ্ধার হলো, শুধু তা দিয়ে সাফল্য নির্ধারণ করা যাবে না। বরং কতটি বড় অপরাধী নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া গেল, কত টাকার অবৈধ সম্পদ জব্দ হলো, কতজন আসক্ত ব্যক্তি চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ জীবনে ফিরলেন এবং কত তরুণকে কর্মসংস্থানে যুক্ত করা গেল—এসব হতে হবে সাফল্যের প্রকৃত সূচক। পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় জোরদার করতে হবে।
বাংলাদেশের যুবসমাজ জাতির সবচেয়ে বড় সম্পদ। সেই সম্পদের একটি অংশ মাদকের কারণে কর্মক্ষমতা ও জীবনের সম্ভাবনা হারালে তার দায় শুধু ব্যক্তির ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না; রাষ্ট্র ও সমাজকেও দায়িত্ব নিতে হবে। মাদক নিয়ন্ত্রণে তাই আমাদের সামনে দুটি পথ—একদিকে শুধু অভিযান, গ্রেপ্তার ও শাস্তির চক্র অব্যাহত রাখা; অন্যদিকে অপরাধের অর্থনীতি ধ্বংস, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ, চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা এবং সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা।
সর্বোপরি, মাদকবিরোধী লড়াই কেবল পুলিশের নয়, এটি রাষ্ট্র ও সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব। খুচরা কারবারিকে গ্রেপ্তার করে সাময়িক স্বস্তি মিলতে পারে, কিন্তু মাদকের বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে হলে ধরতে হবে এর নেপথ্যের অর্থদাতা, পৃষ্ঠপোষক ও সংগঠিত অপরাধী নেটওয়ার্ককে। একই সঙ্গে আসক্ত মানুষকে চিকিৎসা এবং ঝুঁকিতে থাকা তরুণদের সামনে সম্ভাবনার নতুন দরজা খুলে দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, মাদকের দৃশ্যমান শিকড় ছাঁটলেই হবে না, উপড়ে ফেলতে হবে অপরাধের মূল ভিত্তি। একটি সুস্থ, নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার জন্য এর কোনো বিকল্প নেই। লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

সর্বশেষ

পাঠ্যপুস্তক

রতন চন্দ্র পাল, অতিথি লেখক: মানব সভ্যতার শ্রেষ্ঠ প্রকাশ...

ইজারাদারদের দাবি, সাতকানিয়া দেওয়ানহাট বাজার পরিচালনায় সুশাসন নিশ্চিতকরণের

অনলাইন ডেস্ক: সাতকানিয়ার দেওয়ানহাট বাজার পরিচালনায় সুশাসন নিশ্চিতকরণের দাবী...

সাতকানিয়ার কেরানীহাটে আশ্-শেফা স্কুল এন্ড কলেজে নাতে রাসুল (সাঃ) প্রতিযোগিতা সম্পন্ন

এস এম আনোয়ার হোসেন, দক্ষিণ চট্টগ্রাম: পবিত্র রবিউল আউয়াল...

যুক্তরাষ্ট্র আ.লীগের কৃষি বিষয়ক সম্পাদক নিযুক্ত সঞ্জয় কুমার সাহা

পূর্বকাল ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের কৃষি বিষয়ক সম্পাদক...

আ.লীগের কেন্দ্রীয় তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক উপকমিটির সদস্য হলেন বিধান রক্ষিত

নিজস্ব প্রতিবেদক: আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক...
spot_img