নিজস্ব প্রতিবেদক: চট্টগ্রামের কর্ণফুলীতে অর্ধশত তেল চোর চক্র সক্রিয় রয়েছে। এ চক্রের সদস্যরা প্রতি মাসে লোপাট করছে শত শত কোটি টাকার জ্বালানি তেল। চোরাই এসব তেল খালাস হয় প্রায় আটটি পয়েন্টে। আবার চোর চক্র নিজস্ব গোপন ডিপোতে মাটির নিচে ট্যাংকে লুকিয়ে রাখে। পরে সুবিধাজনক সময়ে স্থানীয় পেট্রোল পাম্প, ইঞ্জিনচালিত বোট এবং লাইটার জাহাজে বাংকারিং করা হয়। এদিকে নৌ-থানার পুলিশ, নৌ বাহিনী, কোস্টগার্ড অভিযান পরিচালনা করলেও থামছেনা এ তেল চুরি। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এসব সদস্যরা অভিযান চালায়, জব্দ করে চোরাই তেল। এতে দু একদিন চুরি বন্ধ বা কমলেও আবার পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসে। চলতে থাকে তেল চুরি। এ চক্রের তেল চুরির কারণে একদিকে যেমন জাহাজ মালিক কর্তৃপক্ষ ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে, অন্যদিকে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে। অতিসম্প্রতি আহমেদ মাহি রাসেল ও অলি শহীদের গ্লোবাল এনার্জি-১ নামের তেলের ট্যাঙ্কার থেকে চোরাই তেল ও বিদেশি মদ জব্দ নৌ বাহিনী। পরে পতেঙ্গা থানা পুলিশকে হন্তান্তর করা হয়।
সূত্রমতে, প্রতিদিন কর্ণফুলী নদীতে চোরাই তেলের ব্যবসা হয়। এসব তেলের মূল বিক্রেতা বিদেশি জাহাজ, দেশি কার্গো ভ্যাসেল, সরকারি বিভিন্ন সংস্থার জাহাজ, ব্যক্তিমালিকানাধীন ফিশিং ট্রলার ও নৌকা। তেল চোর চক্রের সদস্যরা জাহাজ থেকে প্রতি লিটার তেল কম দামে কিনে পরে সেই তেল পাইকারদের বেশি টাকায় বিক্রি করেন।
সূত্র আরও জানান, জাহাজ থেকে চোরাই তেল কেনার পর তা কর্ণফুলী নদীর কমপক্ষে ৮ পয়েন্টে খালাস হয়। এর মধ্যে ১৪ নম্বর কালুমাঝির ঘাট, ১৩ নম্বর ঘাট, ১২ নম্বর টেইগ্যার ঘাট, ১১ নম্বর মাতব্বর ঘাট, বাংলাবাজার ঘাট, অভয় মিত্র ঘাট ইত্যাদি। আর এসব তেল চোর চক্রে রয়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনের কতিপয় কর্মকর্তাসহ কমপক্ষে অর্ধশত ব্যক্তি। এ চক্রের নেতৃত্বে রয়েছেন আহমেদ মাহি রাসেল, অলি শহীদ, পতেঙ্গার বার্মা ইউসুফ, জাফর ইকবাল, জিয়া, জসিমসহ একাধিক ব্যক্তি। এ চোরাই তেল ঘিরে কর্ণফুলী ও আশপাশ এলাকায় গড়ে উঠেছে বেশ কিছু অবৈধ ডিপো। জাহাজ থেকে চোরাই এসব তেল চলে আসে চক্রের ডিপোয়। পরে এসব তেল স্থানীয় বিভিন্ন পেট্রোল পাম্প ও জাহাজে বাংকারিং করা হয়।
জানা গেছে, গত ১৭ এপ্রিল রাসেল-শহীদের ট্যাঙ্কার থেকে চোরাই তেল ও বিদেশি মদ জব্দ করা হয়। ৪০ টন পানি মেশানো স্লাজ অয়েলের একটি ট্যাঙ্কার ও ৪০ বোটল বিদেশি বিয়ার জব্দ করেছে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সদস্যরা। তবে এ ঘটনায় কাউকে আটক করা না হলেও জব্দ হওয়া ট্যাঙ্কারের মালিক আহমেদ মাহি রাসেল ও অলি শহিদ নামের দুই ব্যক্তি বলে জানা গেছে। ওই দিন ভোরে পতেঙ্গা এলাকার বহির্নোঙ্গরে পরিত্যক্ত অবস্থায় চোরাচালানের এ তেল জব্দ করা হয়। এ বিষয়ে পতেঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কবিরুল ইসলাম বলেছিলেন, রাত ২টা ৪০ মিনিটে পতেঙ্গার আউটার অ্যাঙ্করেজ-বি এলাকার কাছে ওটি গ্লোবাল এনার্জি-১ নামের তেলের ট্যাংকারটি নৌবাহিনীর টহলরত অবস্থায় পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। তিনি আরও বলেছিলেন, ট্যাংকারটি ৪০ টন পানি মেশানো স্লাজ অয়েল বহন করছিল। পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের জন্য নৌবাহিনী জাহাজটি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে। আমরা আদালতে পাঠিয়েছি। আদালত এটার বিষয়ে পরবর্তীতে পদক্ষেপ নিবেন। এছাড়া জব্দকৃত ট্যাঙ্কার থেকে ৮৬ বোতল বিদেশি বিয়ার পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে নৌবাহিনী। পরে তাও পতেঙ্গা থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
নদী পুলিশ, কোস্ট গার্ড (পূর্বাঞ্চল) এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) সূত্র জানায়, তেল পাচারকারী চক্রের বেশ কয়েকটি চক্র নিজেদের সিন্ডিকেটের মতো সংগঠিত করেছে এবং দীর্ঘদিন ধরে কর্ণফুলী নদী ও বহির্নোঙ্গরে এ ধরনের চোরাচালান সক্রিয় রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দরের বর্হিনোঙর ও কর্ণফুলী নদীতে থাকা জাহাজ থেকে তেল চুরি থামছেই না। রাতের আঁধারে চোরাই তেল পাচারে সক্রিয় একাধিক চক্র। পুলিশ জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে তেল চুরির ঘটনায় আটকরা জানিয়েছেন-তারা কর্ণফুলী নদী অথবা বহির্নোঙরে তেল নিয়ে আসা জাহাজ থেকে নাবিকদের সহযোগিতায় তেল সংগ্রহ করেন। আবার নিজস্ব ব্যবহারের জন্য বরাদ্দ পাওয়া তেলও অনেক সময় লাইটার জাহাজ নাবিকরা কম দামে বিক্রি করে। আমদানি করা ভোজ্যতেলও একইভাবে জাহাজের নাবিকদের সহযোগিতায় সংগ্রহ করেন।
জানা গেছে, নগরীর পতেঙ্গা, ইপিজেড, কর্ণফুলী, সদরঘাট ও বন্দর এলাকাকে ঘিরে তেল চোর সিন্ডিকেটের তৎপরতা চলে। বিদেশে থেকে তেলসহ খাদ্যপণ্য নিয়ে আসা জাহাজ থেকে তেল সংগ্রহ করে এসব এলাকায় মজুদ করা হয়। এর সাথে যুক্ত রয়েরেছন কিছু অসাধু নাবিক। জাহাজে থাকা নাবিক এবং অন্য স্টাফাদের জন্য খাবারসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র জাহাজে পৌঁছে দেওয়ার নামে বহিনোঙরে ভাসমান জাহাজ থেকে ড্রামে ভরে তেল নামানো হয়। পরে ওই তেল ভাউচার করে খোলা বাজারে বিক্রি করে। অনেক সময় জাহাজ থেকে তেল সংগ্রহ করে চক্রের নিজস্ব গোপন ডিপোতে মাটির নিচে ট্যাংকে লুকিয়ে রাখে। পরে সুবিধাজনক সময়ে স্থানীয় পেট্রোল পাম্প, ইঞ্জিনচালিত বোট এবং লাইটার জাহাজে বাংকারিং করা হয়।-বি/পা
